প্রত্যেক জাতির জীবনে কিছু দুর্লভ সময় ও ইতিহাস আছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধও তাই। ইউরোপের দেশগুলোর দিকে তাকালে কি দেখি আমরা। বিলেত নামের ছোট্ট দেশটি, একদা যার সূর্য অস্তমিত হতো না বলে প্রবাদ আছে, তার অজস্র বিজয় বা দখলের ভেতরও একটি-দুটি উজ্জ্বলতম অধ্যায়, যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও চার্চিলই এখনো অগ্রযাত্রার শক্তি, প্রতীক। যে বিপ্লব পৃথিবীর ইতিহাস পাল্টে দিয়েছিল, যে বিপ্লব না হলে অন্ত্যজ শ্রেণী নামে পরিচিত প্রান্তিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী সাহিত্য-শিল্পে জায়গা পেতো না, সে ফরাসী বিপ্লবই এখন অবদি ফ্রান্সের পরিচয়। রাশিয়ার কথাও ধরা যাক, সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে টুকুরো হবার পর রাশিয়া একক রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আগের শক্ত অবস্থান বা বিশ্বব্যাপী প্রভাবও এখন ক্ষীণ। তারপরও রাশিয়ার গৌরব ও উত্স তার অক্টোবর বিপ্লব। লেনিনের আমলে ঝলসে ওঠা এই দেশটি সে অতীতের পায়ে ভর করে এখনো তার স্বাতন্ত্র্য নিয়ে বিরাজমান। এশিয়ার দেশগুলোর বা আফ্রিকার দেশে দেশেও একই ইতিহাস, একই উজ্জ্বলতা। গান্ধী, ম্যান্ডেলা, সুকর্ন, এমন সব নামের ঔজ্জ্বল্যে জ্বলজ্বল করছে রাষ্ট্র-পরিচয়। আমাদের মত দুর্ভাগা জাতি পৃথিবীতে খুব কমই আছে। বৃটিশ ও পাকিস্তানের অধীনে পরাধীন ছিলাম। উপনিবেশ ছিলাম। সে পরাধীনতার ভেতরও আমাদের জীবনে আলো ছিল। তখনকার বিপ্লবী তিতুমীর সুভাষ বোস, সূর্য সেন বা আসাদ, মতিয়ূরেই তার প্রমাণ মেলে। বাংলার বিপ্লবী শ্রী অরবিন্দ দার্শনিকতার উচ্চতম স্তরে উন্নীত হয়েছেন। আমাদের জননেতা ভাসানী ছিলেন প্লেইন লিভিংয়ের আদর্শ নজির। সে আমলের ব্যারিস্টার-অধ্যাপক আর রাজনীতিবিদরা ছিলেন একে অপরের সহযোগী, বন্ধুপ্রতিম। আমাদের দুর্লভ সময়ের শ্রেষ্ঠতা এসেছিল একাত্তরে, যা আর কোনদিন কোন কালে হবার নয়। মুক্তিযুদ্ধের গৌরব আর উজ্জ্বলতায় ঝলসে ওঠার পরিবর্তে আমরা এখন কলহদীর্ণ, সংঘাতময় এমন এক পরিস্থিতির শিকার যেখানে আসল বা মূল চেতনাও বিলুপ্ত হবার পথে। আমরা উন্নত, সভ্য, আধুনিক দেশগুলোর মত গণতন্ত্র বা গণতান্ত্রিক ধারায় চলার কথা বলি, চেষ্টাও করি বটে, আখেরে এখনো সামন্তবাদ, পরিবারতন্ত্র আর রাজতন্ত্রই মেনে চলেছি। একদিকে ক্ষমতার দাপট, অন্যদিকে ধর্মান্ধতা আর পশ্চাত্পদতা, এ দুয়ের খপ্পরে পড়ে মুক্তিযুদ্ধ না হয়ে উঠতে পেরেছে অগ্রযাত্রার শক্তি, না পারছে সমাধানের পথ বাতলে দিতে। অথচ যে সব দেশ ও সমাজের কথা উল্লেখ করেছি তাদের জীবন ও ভবিষত্ নির্ভর করে অতীতের শ্রেষ্ঠতম অর্জনের ওপর। কারণ তারা দেশ ও জাতির অনিবার্য কিছু বিষয়ে দ্বন্দ্বহীন, সংঘাত করে না। কথায় কথায় মারমুখি হয়ে ওঠে না, অস্বীকার করা বা হামবড়া ভাবে অন্যকে অবজ্ঞা করাও নেই। তাদের ভেতর দ্বন্দ্ব বা সংঘাত থাকলেও তা একেবারেই উত্তেজনাহীন। আবেগ উত্তাপ বা তর্ক সবই নিয়ন্ত্রণের আওতায়।
কি যে হল বাঙালির। যখন তার এগুবার সময়, কঠোর শ্রমে পৃথিবীতে জায়গা করে নেয়ার সময় তখন চলছে সংঘাত। এ কথা বলি না যে, ইতিহাসর কলঙ্ক মোচন বা অপরাধ মোচনের দায় নেই। আছে, এবং তা বহু আগেই সমাধান করা যেতো, উচিতও ছিল। করা হয়নি বলেই আজ একশ গুণ বর্ধিত হয়ে সমস্যার আঁচ উস্কে দিচ্ছে। এখন আমাদের তারুণ্যও দ্বিধাবিভক্ত। আমরা নিশ্চয়ই কলহপ্রবণ একটি দেশ ও সমাজ কামনা করি না, যারা বছরের পর বছর সংঘাত আর মারামারিতে জীবন কাটিয়ে দেবে। বিশ্বায়ন ও আধুনিকায়নের এইকালে ইতিহাসের দায় চুকানোর পাশাপাশি আমাদের অর্থনীতি ও সমাজকে বেগবান করাই মূল উদ্দেশ্য। রাজনীতি যদি তা করতে না পারে তবে নেতৃত্ব পরিবর্তনের পাশপাশি খোল-নলচে পাল্টে দেয়া ইতিহাসেই দেখতে পাই। বাংলাদেশের মেধাবী জনগণ, পরিশ্রমী মানুষ শ্রমিক ছাত্র জনতা যে জীবন ও সুব্যবস্থা পাবার কথা, যা তাদের প্রাপ্য তা থেকে বঞ্চিত করে অতীত ও বর্তমানের কদর্য ইস্যুগুলো নিয়ে মাতম করায় বিপদ ডেকে আনা ব্যতীত অন্য কোন লাভ নেই। বিগত বছরগুলোয় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রগতি ও উন্নয়ন নিয়ে প্রবাসী তারুণ্যও আজ উদ্বেলিত। তাদের ভাবনা-চিন্তাগুলো এখন লেখ্য আকারে বিদেশের নানা পত্র-পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে, অস্ট্রেলিয়ার মূল ধারার কাগজেও তার প্রকাশ দেখছি। আশ্চর্যের বিষয় এই, এ জাতীয় পজেটিভ বিষয় মূল ধারায় আলোড়ন তোলে না, সাড়া জাগায় না, এগুলো নীরবে অবহেলায় মুখ লুকিয়ে থাকে।
যুদ্ধাপরাধীর বিচার, দুর্নীতি বা রাজনৈতিক কোন ইস্যুতে বিদেশের চিঠিপত্র কলামে কিছু ছাপা হলেও দেশে ঢি ঢি পড়ে যায়। নেতা, অভিনেতা, মিডিয়ার মিডিয়া সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই প্রবণতা বিপজ্জনক। আমরা ইতিহাসের দায়মুক্তি, কলংক মোচনের বিরুদ্ধে নই, কিন্তু শান্তি ও সহিষ্ণুতা যেন বিপন্ন না হয়। একইভাবে অপরাধীরাও যেন দেশ আর দেশের অস্তিত্ব নিয়ে খেলতে না পারে। না পারে ষড়যন্ত্রে জাতির সর্বনাশ সাধন করতে। এ কাজগুলোর জন্য এক ধরনের আবেগ ও শুভ উম্মাদনার প্রয়োজন হয়, যা পাশ্চাত্য ও সভ্য দেশে দেখতে পাই। অস্থিরতা, ভ্রান্তি, উত্তেজনাহীন এক নির্মল অগ্রগতির উম্মাদনা। সত্যি বলতে কি সভ্য ও গণতান্ত্রিক বিশ্বে বসবাস না করলে তা বুঝতেই পারতাম না। মনে হতো দাঙ্গা-ফ্যাসাদ আর ইতিহাসের নামে খুনোখুনি বা উগ্রতাই জীবন। এ প্রবণতা রুখে পৃথিবীর দিকে তাকানোর মত বুদ্ধিবৃত্তি, নেতৃত্ব আর দেশপ্রেমের অপেক্ষায় বাংলাদেশ অধীরভাবে অপেক্ষমাণ। আমরা প্রতিদিন দুঃসংবাদ আর হতাশা দিয়ে শুরু করব না এই মেধাবী জাতিকে আশা ও প্রত্যাশায় ভরিয়ে তুলব, এটাই এখন ভাবনা ও করার বিষয়। এত ছোট দেশে এত বড় জনসংখ্যা আর সমস্যা যখন সম্ভাবনার প্রতীকে পরিণত হতে যাচ্ছে তখন পৃথিবীর আহ্বান শোনাই মঙ্গলের। জাগো বাঙালি।
সিডনি থেকে
