সিনেমার বিজ্ঞাপনে মাঝে-মাঝে বলতে শোনা যায় ‘স্ব-পরিবারে উপভোগ্য’। এ কথার অর্থ হলো ঐ ছবিটি অশ্লীলতামুক্ত। সংসদ অধিবেশন এখন টেলিভিশনে সরাসরি সমপ্রচার করা হয়। সেই অধিবেশনগুলো স্ব-পরিবারে উপভোগ করা যায় কিনা তা পূর্ব থেকে বলা মুশকিল। আইন প্রণেতাগণ, জাতির কাণ্ডারিগণ কেউ কেউ কখনও কখনও এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন কথা বলেন এবং অশ্লীল শব্দ উচ্চারণ করেন যা পরিবারের সবার মধ্যেতো দূরের কথা কোন রুচিশীল ব্যক্তিমাত্রে একাকী শুনতেও কষ্ট হয়। কোন কোন নারী সাংসদের মুখ থেকেও যে ধরনের কথা বের হয় তা এই পর্যায়ের কোন ব্যক্তির কাছ থেকে কেউ আশা করে না। তবে এ ধরনের বক্তব্য আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পচনশীল অবস্থাকেই প্রতিফলিত করে।
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা যে ভাষা ব্যবহার করি তার মধ্য দিয়েই আমাদের মানসিকতা, বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক অবস্থান সুস্পষ্ট হয়। একটি গণতান্ত্রিক দেশ বা পিপল্স রিপাবলিকের নাগরিক হিসেবে বাক-স্বাধীনতাও আমাদের কম-বেশি রয়েছে। কিন্তু এই স্বাধীনতা নিয়ে আমরা অনেক ক্ষেত্রেই যেভাবে ভাষা ব্যবহার করি তাতে করে অনেক অপসংস্কৃতি এমনকি ভয়াবহ অশুভ ঘটনাও ঘটে যায়। ভাষার অপপ্রয়োগ বা অশুভ প্রয়োগের ফলে অনেক ক্ষেত্রে তা বেআইনি এমনকি রাষ্ট্রদ্রোহী কাজেরও উস্কানিমূলক হয়ে পড়ে। বিশেষ করে রাজনীতির ক্ষেত্রে ব্যবহূত অনেক ভাষা রয়েছে যার অর্থ অনেক ভয়ংকর। যেমন অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ মিছিলেও “জ্বালো জ্বালো আগুন জ্বালো”— এমন ভাষা ব্যবহার করতে শুনি। এর অর্থ কী? কোথায় কে আগুন জ্বালাবে? কী পুড়িয়ে ফেলা হবে? উত্তরও অনেক সময় ঐ সকল মিছিলে পাওয়া যায় : “...গদিতে আগুন জ্বালো একসাথে।” এখন প্রশ্ন হলো আগুনে পুড়িয়ে ফেলা কী কোন গণতান্ত্রিক অধিকার? এটি কী কোন সভ্য বা মানবিক আচরণ? কোন বিশেষ ব্যক্তিকে সরকার প্রধান হিসেবে দেখতে না চাইলে বা কোন বিশেষ দলকে সরকার পরিচালনায় না দেখতে চাইলে তাকে বা তার দলকে পরাজিত করে অন্যরা সরকার পরিচালনায় আসতে পারেন। কিন্তু সেই পরিবর্তনতো কারো গদি পুড়িয়ে দিয়ে করা উচিত নয়। সভ্য সমাজে বিশেষ করে গণতান্ত্রিক সমাজে এর জন্য রয়েছে সুস্থ বিবদ্ধ বা সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। তাই এই সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে অমান্য করে যখন কারো গদি পুড়িয়ে দেবার হুমকি দেয়া হয় এতে করে কী সংবিধানকেই অশ্রদ্ধা করা হয় না। তাছাড়া কোন বিশেষ ব্যক্তি বা দলকে অপছন্দ হবার কারণে রাষ্ট্রীয় সিংহাসন পুড়িয়ে ফেলার হুমকি দেয়াও কি ন্যায়সঙ্গত? রাজনীতিতে ব্যবহূত আরও কিছু ভাষা আছে যা আইনের সাথে বিরোধ সৃষ্টি করে। যেমন ‘কারো মুক্তি চাই, দিতে হবে’, ‘কারো ফাঁসি চাই, দিতে হবে’। এখন কথা হচ্ছে কাউকে জেল থেকে মুক্তি দেয়া, কাউকে ফাঁসি দেয়া একটি আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে অগ্রসর হয়। কারো দাবি বা কোন মিছিলকারী দলের চাপের মুখে বিচারক কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। তার চেয়ে বড় কথা বিচারককে এমনটি করতে চাপ দেয়াও কি আইন ও বিচার ব্যবস্থার অবমাননা নয়?
এসব কথাকে যতই রূপক বা ভাবব্যঞ্জক বলে কেউ দায় সারার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু কোনটা রূপক এবং কোনটা আসল কথা তা কিন্তু সাধারণ জনগণ বা সর্বস্তরের মানুষ সমানভাবে বোঝার কথা নয়। কিন্তু মিছিল হয় সাধারণত রাজপথে যেখানে সর্বস্তরের মানুষেরই চলাচল। তাই তথাকথিত গণতান্ত্রিক অধিকারের দোহাই দিয়ে ঐ সকল আপত্তিকর উক্তি সর্বসাধারণের মাঝে বার বার উচ্চারিত হলে রাষ্ট্র, সংবিধান, বিচার ব্যবস্থা ইত্যাদি সম্পর্কে মানুষের শ্রদ্ধা এবং আস্থার অবনতি ঘটতে পারে। গণতান্ত্রিক সমাজে এ ধরনের অবস্থা অত্যন্ত অকল্যাণকর।
গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় সরকারি সিদ্ধান্ত পরিকল্পনা ও কার্যপ্রণালী সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা করার অধিকার জনগণ রাখে। এই সমালোচনা রাষ্ট্রের জন্য এমনকি সরকারের জন্যও শুভ ফল বয়ে আনতে পারে। কিন্তু কেবল সমালোচনার জন্যই সমালোচনা, বিরোধিতার জন্যই বিরোধিতা কাম্য হতে পারে না। কিন্তু অত্যন্ত দুঃজনকভাবে সত্য যে আমাদের দেশে এই সংস্কৃতিই বেগবান হচ্ছে। সরকারও বিরোধী দলের কোন সমালোচনা কোন প্রস্তাব আমলে নিতে চায় না। তবে যার যে রকম প্রস্তাব পরামর্শই হোক আর মন্তব্য হোক তার ভাষাটি হওয়া উচিত সুন্দর, শালীন, সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট অর্থবোধক। জাতিকে যারা নেতৃত্ব দিতে ইচ্ছুক তারা সরকারে থাকুন আর না থাকুন অশালীন বক্তব্য বা বিধিবর্হিভূত আচরণ তাদের নিকট কাম্য নয়। এমন কোন বক্তব্য-বিবৃতি দেয়া উচিত নয় যা বস্তুনিষ্ঠ নয়। যদি ভুলবশত বা ভুল তথ্যের ভিত্তিতে কোন বক্তব্য প্রদান করা হয় তার জন্য পরবর্তীতে ভুল স্বীকার করার মানসিকতাও রাজনীতিকদের থাকা উচিত। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অবাধ বাক-স্বাধীনতা থাকে। কিন্তু এই স্বাধীনতার অপব্যবহার করা হলে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য অনুপযোগী হয়ে ওঠে।
লেখক :দর্শনের শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চেয়ারম্যান, অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রাকটিক্যাল এথিক্স
[email protected]
