ভারতের রাষ্ট্রীয় ঋণে ক্রয়কৃত তেলবাহী ১৬৫টি ট্যাংকার ব্যবহারের আগেই অকেজো হইয়া পড়িয়াছে। এইসব ওয়াগনে জ্বালানি তেল পরিবহনে লিখিতভাবে অসম্মতি জানাইয়াছে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানি। ফলে ওয়াগনগুলি ফেলিয়া রাখা হইয়াছে পার্বতীপুর, সৈয়দপুর ও ঈশ্বরদীসহ বিভিন্ন স্টেশনে। গত বুধবার সংবাদপত্রে প্রকাশিত এই খবরটি নিঃসন্দেহে উদ্বিগ্ন হইবার মতো। কারণ ১২২ কোটি টাকা ব্যয়ে ভারত হইতে আমদানিকৃত এইসব ওয়াগন ও ৬টি ব্রেকভ্যান মাত্র তিন মাস আগে—গত মার্চ মাসে বাংলাদেশ রেলওয়ের বহরে যুক্ত করা হইয়াছিল। অভিযোগ উঠিয়াছে যে, ওয়াগনগুলিতে নানা ত্রুটি রহিয়াছে। তেল ধারণক্ষমতা পরিমাপে সমস্যা ছাড়াও নকশাগত ত্রুটির কারণে তেল মজুদ এবং খালাসেও নানা বিপত্তি পরিলক্ষিত হইয়াছে। ত্রুটি সারানোর জন্য ওয়াগনগুলি ওয়ার্কসপেও পাঠানো হইয়াছিল। কিন্তু তাহাতেও কাজ হয় নাই। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠিতে পারে যে, আমদানির আগেই ওয়াগনগুলি যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করা হইল না কেন? আর যদি করা হইয়া থাকে তাহা হইলে এই বিপত্তি ঘটিল কিভাবে?
উত্তর যাহা মিলিয়াছে তাহা রহস্যকে আরও ঘনীভূত করে মাত্র। কারণ তাহাতে উত্তর নয়, বরং পরস্পরবিরোধী অভিযোগই প্রবল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানাইয়াছেন যে, রেলওয়ের তেলবাহী পর্যাপ্ত ওয়াগন থাকা সত্ত্বেও শুধু অর্থ অপচয়ের জন্যই এই ওয়াগনগুলি কেনা হইয়াছে। ফলে তাড়াহুড়া করিতে গিয়া নকশার বিষয়ে যেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় নাই, তেমনি রেলওয়ের পক্ষ হইতে বিষয়টি যাহারা দেখাশোনা করিয়া থাকেন ওয়াগন ক্রয় কিংবা নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে মতামত নেওয়া হয় নাই সেই ট্রাফিক বিভাগেরও। তবে রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক বলিয়াছেন একেবারেই ভিন্ন কথা। তাহার মতে, ওয়াগনগুলি আন্তর্জাতিক মান ও নকশা অনুযায়ী তৈরি। ইহাতে তেল চুরি বন্ধ করা সহজ হইবে বিধায় স্বার্থান্বেষী একটি মহল ইহার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাইতেছে। তবে যতো কথাই বলা হউক না কেন, ওয়াগনগুলি যে ত্রুটিপূর্ণ তাহা কেহই অস্বীকার করেন নাই বা করিতে পারেন নাই। রেলওয়ের মহাপরিচালকের বক্তব্যেও তাহা স্পষ্ট। তিনি বলিয়াছেন যে, নূতন যে-কোনোকিছুর মধ্যে যেমন সমস্যা থাকিতে পারে, তেমনি তাহার সমাধানও রহিয়াছে। ইতোমধ্যে ত্রুটি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হইয়াছে এবং অচিরেই এইসব ওয়াগন ব্যবহার করা যাইবে বলিয়াও তিনি আশ্বস্ত করিয়াছেন।
ওয়াগন শুধু নহে, ভারত হইতে আমদানিকৃত গাড়ি, ইঞ্জিন বা যন্ত্রপাতির ব্যাপারেও প্রায়শ এই ধরনের অভিযোগ শোনা যায়। তবে বিষয়টি শুধু যে কোনো একটি দেশের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ এমনও নহে। প্রায় সাড়ে ৬ শত কোটি টাকা ব্যয় করিয়া সমপ্রতি চীন হইতে আমদানিকৃত ডেমু ট্রেনের ব্যাপারেও অনুরূপ অভিযোগ উঠিয়াছে। প্রশ্ন হইল, ভারতের তৈরি ওয়াগন, ইঞ্জিন, গাড়ি প্রভৃতি সেই দেশে যুগ যুগ ধরিয়া চলিতে পারিলে আমাদের দেশে পারিবে না কেন? কেন আমদানির পরপরই প্রায়শ সেইগুলি বিকল হইয়া পড়ে? জানা যায়, আমদানির আগেই রেলওয়ের মেকানিক্যাল বিভাগের কর্মকর্তারা যথারীতি ওয়াগনগুলির নকশা অনুমোদন করিয়াছেন। নকশা অনুযায়ী কাজ হইতেছে কিনা তাহা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যাচাই-বাছাই তথা তদারকির জন্য একাধিকবার ভারত সফরও করিয়াছেন প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ইহাই নিয়ম। ধরিয়া লওয়া যায় যে, ডেমু ট্রেনসহ আনুষঙ্গিক অন্যান্য ক্ষেত্রেও এই নিয়ম অনুসৃত হইয়াছে। প্রশ্ন হইল, ইহার পরও ত্রুটিপূর্ণ ওয়াগন কিংবা ডেমু ট্রেন আমদানি হইল কিভাবে? ঘাপলাটা কোথায়? বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এইসব প্রশ্নের সদুত্তর পাওয়া না গেলেও কানাঘুষায় যাহা শোনা যায় তাহাও একেবারে উড়াইয়া দেওয়ার মতো নহে।
বাস্তবে যাহাই ঘটুক না কেন, আখেরে ইহার সমুদয় দায়দায়িত্ব যে নীতিনির্ধারক মহলের ঘাড়েই বর্তায়—তাহাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই। অতএব, নিজেদের স্বচ্ছতার স্বার্থেই তাহাদের উচিত প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করিয়া জনসমক্ষে তাহা প্রকাশ করা এবং অবশ্যই দায়ী ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
