আমরা এককালে মিঠা পানির মাছও খাইতাম—এমন উক্তি করিবার দিন বোধহয় খুব অদূরে নহে। হাওর অঞ্চলে মিঠা পানির মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস করিয়া ও ছোট মাছ নির্বিচারে নিধন করিয়া আমরা নিজেদের পায়ে কুঠার মারিবার বন্দোবস্ত করিতেছি বেশ কিছুকাল ধরিয়া। ইলিশ মাছের প্রজাতি রক্ষায় একদা চমত্কার জনগুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞাপন দেখা যাইত, যেইখানে এক তাত্ক্ষণিক মুনাফালোভী সুরে সুরে বলিত, ‘মত্স্য মারিব খাইব সুখে, কী আনন্দ লাগছে বুকে।’ আমাদের হাওর অঞ্চলের এই জাতীয় মুনাফালোভী এক্ষণে বিপন্ন করিয়া তুলিতেছে বিস্তীর্ণ হাওরের মত্স্য সম্পদ। এক সময় সুনামগঞ্জের হাওর এলাকা ছিল মাছের অভয়াশ্রম। আজ সেইখানে প্রায় ২৫ প্রজাতির দেশি মাছ বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছে। বিলুপ্তির পথে প্রহর গুনিতেছে গজার, রাগা চেং, কাজুলি, পাবদা, রানি মাছ, ভোলা, ঘোড়ামুইখ্যা, সরপুটি, কানি পাবদা, নামা চান্দা, চিতলসহ অনেক প্রজাতির মাছ। ইহার এক নম্বর কারণ, অতিলোভ এবং পর্যায়ক্রমিক কারণ হইল জলমহল ব্যবস্থাপনার সুষ্ঠু নীতিমালার অভাব, অভয়াশ্রম ধ্বংস, জলাশয়ে অতিমাত্রায় মাছ আহরণ, কীটনাশকের ব্যবহার, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ, পানি দূষণ, খাল-বিল শুকিয়ে মাছ আহরণ, জলমহল ভরাট, মত্স্য আইন অমান্য ইত্যাদি।
বৈশাখ হইতে শ্রাবণ মাস হইল মাছের প্রজনন মৌসুম। মত্স্য রক্ষা ও সংরক্ষণ বিধিমালা অনুযায়ী, এই সময় ২৩ সেন্টিমিটারের (নয় ইঞ্চি)-এর চাইতে ছোট মাপের শোল, গজার, টাকি, কার্ফু, রুই, কাতলা, মৃগেল, কালোবাউশ ও ঘনিয়া মাছ ধরা বেআইনি। পত্রিকান্তরে প্রকাশ হইয়াছে, দেশের সর্ববৃহত্ হাকালুকি হাওরে মাছের প্রজনন মৌসুমে নির্বিচারে পোনা নিধন চলিয়া থাকে। উজান হইতে নামিয়া আসা পাহাড়ি ঢলে হাকালুকি হাওরে পানি বাড়িয়া গেলে তাত্ক্ষণিক মুনাফালোভীরা নিষিদ্ধ বেড়, কারেন্ট ও কাপড়ী জাল দিয়া পোনা নিধনযজ্ঞে মাতিয়া ওঠে। মুনাফালোভীদের এই বাণিজ্যের সহিত যুক্ত রহিয়াছে ক্ষমতাসীন প্রভাবশালী নেতাকর্মী ও প্রশাসনের কতিপয় দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। হাকালুকি হাওরের ২৩৮টি বিলের চিত্র এককথায় ভয়াবহ।
হাওরসহ যেকোনো মুক্ত জলাশয়ে মাছের উত্পাদন বৃদ্ধির জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ দিক হইল উত্পাদনমুখী ব্যবস্থাপনা। অথচ ইহার বিপরীতে আমরা দেখিতেছি, মত্স্য প্রজাতিকে রক্ষার চিন্তা না করিয়াই জলমহলগুলোকে সরকারি রাজস্ব আয়ের উর্বর খাতে পরিণত করা হইয়াছে। রাজস্ব বৃদ্ধির খাত বৃদ্ধি করিতে হইবে নিশ্চয়ই, কিন্তু সোনার সকল ডিম পাইতে যদি হাঁসটির পেট কাটিবার বন্দোবস্ত করা হয়, তবে হাঁস মরিবার পর কপাল চাপড়ানো ছাড়া আর কিছু করিবার থাকিবে না। সুতরাং প্রশাসনকে সাবধান হইতে হইবে পোনা মাছের ছোট ফাঁসযুক্ত বেড়জাল, কুনি জাল, বিভিন্ন প্রকার ড্রেজনেট, ঠেলা জাল, ফিস ট্রাপ, কারেন্ট জাল হইতে; যাহাতে প্রজনন মৌসুমে সব ধরনের মাছের ডিম ছাড়িবার পরিবেশ বিঘ্ন না হয়। যেহেতু মুক্ত জলাশয় হইল সকল প্রকার মিঠা পানির মাছের মূল বাসস্থান ও প্রাকৃতিকভাবে বংশবৃদ্ধির মূল প্রজনন ক্ষেত্র, তাই মিঠা পানির মাছকে রক্ষা করিতে হইলে তাহাদের প্রজনন ক্ষেত্র সুরক্ষিত করিবার বিকল্প নাই। এই ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করিতে হইবে, প্রয়োজনে নূতন আইন প্রণয়নের বিষয়টিও ভাবিতে হইবে। ইহার পাশাপাশি আমাদের সামাজিক সচেতনতাও সর্বাধিক জরুরি। কেননা শুধু আইনে সব সুরক্ষিত হয় না, যদি আমরা নিজেরাই সচেতন না হই।
