সংঘাতময় রাজনীতি কি অপেক্ষমাণ?

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০১৩, ২১:২৯
প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জেনারেল এরশাদের কথায় এবং কাজে অনেক সময়ই মিল থাকে না। আবার সকালে এক কথা বিকালে অন্য কথা এমন সুন্দর উদাহরণও তিনি। কিন্তু সেই এরশাদের কাছ থেকেই রাজনীতি বিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য এসেছে ইদানিং। তিনি তার আহ্বানে ইফতার পার্টিতে আসা রাজনীতিবিদদের উদ্দেশে বলেছেন, আমরা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী, শত্রু নই। রাজনীতির জগতে এই বক্তব্যটি কতটুকু গুরুত্ব বহন করে তা হয়তো বাংলাদেশের রাজনীতি বিশ্লেষণ করেই বুঝা যাবে। যে কোন গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে পার্টির অভ্যন্তরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে, পার্টির বাইরে তো আছেই। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যখন শত্রুতা নামক বিষক্রিয়া ঘটে, তখনই হয়ে উঠে রাজনীতি শঙ্কাময়, সর্বনাশা। বাংলাদেশের রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ শক্তি গত দুই দশক ধরেই আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির হাতে। জাতীয় পার্টি, বামদল এবং জামায়াতে ইসলামীসহ আরও কিছু রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব বাংলাদেশে থাকলেও মূল শক্তি হিসাবে বড় দু’টি দলই নিয়ন্ত্রণ করছে বাংলাদেশের রাজনীতি। সাংগঠনিকভাবে না হলেও এই বড় দুই দলের বাস্তব অবস্থায় দুই শীর্ষ নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনা স্ব স্ব দলে শুধু একক ক্ষমতাধরই নন তাদের ক্ষমতাটি স্থায়ীও বটে। তাই এই দুই নেত্রীর সিদ্ধান্ত এবং পরস্পরের প্রতি মনোভাব তাদের দলের জন্য অপ্রতিদ্বন্দ্বী একটি অবস্থানে। এই দুই নেত্রীর পরস্পরের প্রতি অবস্থানের বিষয়টি তাদের নিজ নিজ দলের রাজনৈতিক অবস্থানের ভিত্তি হিসাবে কাজ করছে। তাই এরশাদ সাহেবের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী কিন্তু শত্রু নই’ এমন বক্তব্যটি আমাদের রাজনীতিতে প্রয়োজনীয় হলেও প্রকৃতপক্ষে আমাদের রাজনীতিতে পারস্পরিক শত্রুতাই বাস্তবতা। প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধান বিরোধী নেত্রী পরস্পরের প্রতি শত্রুতা মনোভাবের বহিঃপ্রকাশই দেখিয়েছেন গত বছরগুলোতে। তাই যেমন তাদের নেতা-কর্মীরা জানে তেমনি এদেশের জনগণও জানে যে, আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যে শত্রুতার সম্পর্কটাই বজায় আছে। তাই আমাদের রাজনৈতিক মাঠে পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস নেই, একের প্রতি অপরের ভরসা নেই। মাত্র কয়েকটি মাস বাকি আছে, তারপরই হবে জাতীয় নির্বাচন। জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন সরকার। এই মুহূর্তে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়টি হলো, কোন্ পদ্ধতিতে সামনের নির্বাচনটি হবে। খুব কাঁচা হাতের কাজ দিয়ে বর্তমান সরকার আগামী নির্বাচন সংক্রান্ত অনিশ্চয়তার সূত্রপাত ঘটিয়েছিল। স্থির হয়ে থাকা একটি সর্বসম্মত পদ্ধতিকে তারা কাঁচি দিয়ে নির্দয়ের মত কেটে ফেলে দিয়ে নির্বাচন ইস্যুটির উপর বিতর্কের সূত্রপাত করেছে। বিএনপিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে রাজনীতি তথা সহিংসতা করার সুযোগ করে দিয়েছে বর্তমান সরকার। এর ফলে রাজনীতি হয়ে উঠেছে সংঘাতময়। সরকার এমন কাজটি করেছিল একেবারেই ঠাণ্ডা মাথায় এবং বিনা উস্কানিতেই। কথায় আছে না, এবার ঠেলা সামলাও। তাই সরকার সাংঘাতিক ঠেলার মধ্যেই এখন আছে। মেয়াদ শেষেও সরকার নিশ্চিত হতে পারছে না তারা সামনের জাতীয় নির্বাচনটি জনগণকে উপহার দিতে পারবে কিনা। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি এই দুই দলই যদি অংশগ্রহণ না করে তবে সেই নির্বাচনের ফলাফল গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে প্রশ্ন থাকবে। এটা যেমন এদেশের জনগণ জানে, এটা যেমন দাতা দেশসহ আন্তর্জাতিক সমাজও জানে; ঠিক তেমনি এটা সরকারেরও জানার বিষয় ছিল। তারপরও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধান থেকে বাদ দেয়ার সময়ে তারা ভবিষ্যত্ রাজনীতির শঙ্কাযুক্ত পরিস্থিতিটি সঠিকভাবে বিবেচনায় নিতে ব্যর্থ হয়েছিল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটা প্রায় নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, বিএনপিকে বাদ রেখে বর্তমান সরকার অন্যান্য ছোট ছোট দল নিয়ে নির্বাচন করার চেষ্টা করলে তাদের রাজনৈতিক বিপর্যয় কেবল আরও বৃদ্ধিই পাবে, অন্য কোন রাজনৈতিক লাভ তাদের হবে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা থাকা বা না থাকার বিষয়টি আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির পারস্পরিক সম্পর্কের উপর নির্ভরশীল। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলকে এদেশের জনগণ হয়তো স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করত, যদি এই বাতিলকে বিএনপি স্বাগত জানাত। তাই বিএনপিকে আস্থায় না এনে এবং বিএনপির সঙ্গে আগামী নির্বাচন নিয়ে একটি রাজনৈতিক সমঝোতায় না এসে সরকার তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে মূলতঃ রাজনীতিকে নির্বাচনের অজুহাতে একটি সংঘাতময় অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ইতোমধ্যে বিরোধী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তার এক রাজনৈতিক সভায় ‘সময়মতো সেনাবাহিনী দায়িত্ব পালন করবে’ এমন উস্কানিমূলক বক্তৃতা প্রদান করেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বারবার প্রকাশ করেছেন যে, এবার তত্ত্বাবধায়ক সরকার এলে আবার দুই নেত্রীর কারাগারে যাওয়ার রাস্তা খুলে যাবে। তিনি আরও বলেছেন, গত সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল দুই বছর, এবার এলে তারা আর যেতেই চাইবে না। এমন শঙ্কাযুক্ত রাজনৈতিক বক্তব্য এবং ভবিষ্যদ্বাণী দুই প্রধান নেত্রীর কাছ থেকে এলেও সামনের রাজনৈতিক সংঘর্ষ পরিহার করার কোন পরিকল্পনা তাদের কাছ থেকে আসছে না। দৃশ্যতঃ মনে হচ্ছে, বর্তমান সরকার তাদের পরিচালনায়ই আগামী নির্বাচন করবে। আর তা করতে গিয়ে অথবা বিকল্প কোন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে কোন সমঝোতার জন্য প্রধান বিরোধী দলের সঙ্গে তারা কোন আলোচনায় যাবে না। অন্যদিকে বিএনপিও সরকারের সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকার কিংবা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে কোন আলোচনায় যেতে চায় না। যার যার অবস্থানে গোঁ ধরে বসে আছে দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল। অন্যদিকে দেশে উত্কণ্ঠার সাথে অপেক্ষা করছে ভয়াবহ এক অন্ধকার রাজনৈতিক পরিস্থিতির, সর্বনাশা এক রাজনৈতিক সহিংসতার। দেশ এবং দেশের মানুষকে অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নিক্ষেপ করছে যে দু’টি রাজনৈতিক দল, তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং কথাবার্তা থেকে সুস্পষ্টভাবে বুঝা যায়, তারা দেশ ও জনগণের স্বার্থে নয় বরং ক্ষমতার স্বার্থে তাদের রাজনীতি পরিচালনা করছে। এমন পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতের যে কোন অনিশ্চিত অথবা অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির জন্য একেবারেই দায়ী হতে হবে সরকারি দল এবং বিরোধী দলকে। কেননা তারাই সৃষ্টি করছে সর্বনাশা এক রাজনৈতিক পরিস্থিতির। তবে হয়তো বা এখনও শেষ রক্ষা হতে পারে যদি এই দুই পরাক্রমশালী রাজনৈতিক দলের সুমতি ঘটে এবং আগামী নির্বাচন নিয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছে। লেখক :সাবেক সেনা কর্মকর্তা

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন