ক্ষমতা কাহারও চিরস্থায়ী নয়

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০১৩, ২১:৫৬
এই নশ্বর পৃথিবীতে কোনো কিছুই অবিনশ্বর নয়। এমন কিছুই মানুষ পায় না বা অর্জন করিতে পারে না যাহা চিরকালীন। মহান আল্লাহ তায়ালার কুরসি বা আসন ছাড়া কোনো কিছুই স্থায়ী কিংবা সর্বব্যাপী নয়। রাজা-বাদশার আমলে মসনদবদারের ক্ষমতার কোনো মেয়াদকাল নির্দিষ্ট ছিল না। সেই কালে একজন রাজা আজীবন ক্ষমতায় থাকিতে পারিতেন, আইনগত কোনো বাধা ছিল না। তথাপিও সবদেশে সব রাজা আজীবন সিংহাসনে সমাসীন থাকিতে পারেন নাই। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তো আজীবন ক্ষমতায় থাকিবার কোনোই সুযোগ নাই। ইহা সর্বজনবিদিত যে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটার সাধারণের ম্যান্ডেট লইয়া একটি সুনির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য একটি সরকার ক্ষমতাসীন হইয়া থাকে। মেয়াদান্তে দেশের শাসনতন্ত্র নির্দেশিত পন্থায় ক্ষমতা হস্তান্তর করা হইয়া থাকে। ইহার ব্যত্যয় ঘটিবার কোনো অবকাশ গণতন্ত্রে নাই। শাসন প্রক্রিয়ায় ঘোরতর কোনো অনিয়ম, অসংগতি কিংবা ব্যতিক্রম না ঘটিলে একটি নির্বাচিত সরকারের পক্ষে পূর্ণ মেয়াদ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকাই স্বাভাবিক। ইউরোপ-আমেরিকার উন্নত গণতন্ত্রের দেশসমূহে এই নিয়া কোনো ঝুট-ঝামেলা নাই। নির্বাচনের মাধ্যমে সেইসব দেশে সরকার বদলায়। জনগণ চাহিলে একই দল বা ব্যক্তি পরের মেয়াদেও ক্ষমতাসীন হইতে পারেন। এই ক্ষেত্রে জোর-জবরদস্তির কিছু নাই। এইগুলি গণতন্ত্রের বাহ্যিক সৌন্দর্য। কিন্তু আফ্রো-এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকার স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশসমূহে গণতন্ত্রের বাহ্যিক সৌন্দর্যটুকুও সুরক্ষিত নয় বহু ক্ষেত্রে। আমাদের প্রতিবেশী ভারত এই ক্ষেত্রে একটি দৃষ্টিগ্রাহ্য ব্যতিক্রম নিঃসন্দেহে। বাংলাদেশ কিংবা দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশসমূহে যেইধরনের সমস্যাদি রহিয়াছে, কমবেশি তার সবই ভারতে আছে। অন্যতম বিকাশমান অর্থনৈতিক শক্তি হিসাবে বিশ্বপরিমণ্ডলে ভারত তাহার অবস্থান সংহত করিতে সক্ষম হইলেও এখনও দারিদ্র্যলাঞ্ছিত দেশটির বিপুল জনগোষ্ঠী। এই বত্সর প্রকাশিত জাতিসংঘের সমীক্ষায় দেখা যায়, দরিদ্র জনসংখ্যার বিবেচনায় ভারতের স্থান তৃতীয়। দেশটির কমপক্ষে ৮টি রাজ্যের ৪০ কোটি মানুষের জীবন চরম দারিদ্র্যসীমারও নিচে। দুর্নীতি,সামপ্রদায়িকতা,হঠকারিতা, সন্ত্রাস-সংঘাত, জঙ্গিবাদ সকলই আছে ভারত প্রজাতন্ত্রে। এতদসত্ত্বেও স্বাধীনতা লাভের ৬৬ বত্সরের মধ্যে একটি দিনের জন্যও ব্যাহত-বিঘ্নিত হয় নাই ইহার গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা। মেয়াদান্তে নির্বাচন হইবে কি হইবে না এই নিয়া কখনই অনিশ্চয়তা দেখা দেয় নাই। নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং ফলাফল লইয়া প্রবলভাবে অবিশ্বাস দানা পাকাইয়া উঠিতেও দেখা যায় নাই কখনও। পক্ষান্তরে এমন অনেক স্বল্পোন্নত দেশ আছে, যেখানে ক্ষমতায় একবার যাইতে পারিলে উহাকে কি করিয়া চিরস্থায়ী করা যায় সেই কৌশল করিতে ব্যস্ত হইয়া পড়েন সংশ্লিষ্টমহল। ফলে নির্বাচন লইয়া দেখা দেয় অনিশ্চয়তা। ঘনিভূত হয় আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট। কিন্তু পরিহাস! ছল-চাতুরি, কলা-কৌশল যতই করা হউক না কেন, যতই বৃদ্ধি করা হউক না কেন জোর-জুলুমের মাত্রা, তাহাতে শেষরক্ষা হয় না। চিরকাল কেহই ক্ষমতায় থাকিতে পারেন না। বৈরি সময় আসিয়া তাহাদের ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দেয় ক্ষমতার বাহিরে। ইহাই ইতিহাসের শিক্ষা। ইহা অলংঘনীয় নিয়তিও বটে। তবুও একশ্রেণীর মানুষ এমনই অন্ধ হইয়া যান যে, চিরকাল ক্ষমতা আকড়াইয়া থাকিতে চাহেন। তাহারা ভুলিয়া যান যে, সমস্ত কিছুর ওপর ক্ষমতাবান একমাত্র আল্লাহ তায়ালা। তিনি যাহাকে ইচ্ছা তাহাকে ক্ষমতা দান করেন, যাহাকে ইচ্ছা তাহার নিকট হইতে রাজ্য বা ক্ষমতা কাড়িয়া নেন। এই অমোঘ বাস্তবতা জানা থাকা সত্ত্বেও গরীব দুনিয়ার রাজনৈতিক দল ও দলের নেতৃসমাজের অনেকেই অস্থায়ী মসনদ আঁকড়াইয়া ধরিতে কেন এত ব্যাকূল- পেরেশান? তাহারা না মানিতে চাহেন গণতান্ত্রিক রীতি-নীতি, না শোনেন ধর্মের বাণী। তৃতীয় বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের এ এক রুগ্ন ও পরিত্যাজ্য বাস্তবতা।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন