এডওয়ার্ড স্নোডেনের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার প্রসঙ্গে

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০১৩, ২১:৫৭
রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নষ্ট করিবার অভিযোগ উঠাইয়া এডওয়ার্ড স্নোডেনকে নির্মূল করিবার প্রাণান্ত চেষ্টা করিতেছে মার্কিন প্রশাসন। গত কয়েক সপ্তাহ ধরিয়া নিরাপদ স্থানে যাইবার লক্ষ্যে রাশিয়ার একটি বিমানবন্দরে পড়িয়া থাকা মার্কিন এই তরুণের বিরুদ্ধে কেবল প্রশাসনই মাঠে নামে নাই; মূ্লধারার মার্কিন মিডিয়াতেও সমানতালে তাহার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার চলিতেছে। স্নোডেনকে হাতের মুঠায় পাইবার জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করিতেছে যুক্তরাষ্ট্র। স্নোডেন যাহা করিয়াছেন তাহা আজ আর জানিতে কাহারও বাকী নাই। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি (এনএসএ) ও সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (সিআইএ) সাবেক এই কর্মী, রাষ্ট্র কর্তৃক জনগণের উপরে গণহারে নজরদারী করিতে থাকা কর্মসূচির কথা প্রকাশ করিয়া দিয়াছেন। তিনি আরও জানাইয়া দিয়াছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃপক্ষের এই নজরদারী কেবলমাত্র মার্কিন জনগণের উপরেই সীমাবদ্ধ নহে; এই নজরদারী বিস্তৃত হইয়া আছে সারা দুনিয়াব্যাপী। স্নোডেন যাহা করিয়াছেন তাহাকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এই যাবত্কালের সর্ববৃহত্ তথ্য ফাঁসের ঘটনা হিসাবে বর্ণনা করা হইতেছে। স্নোডেনকে ঘিরিয়া যুক্তরাষ্ট্রতো বটেই, গোটা বিশ্বই দুইভাগে বিভক্ত হইয়া পড়িয়াছে। একদলের দাবি তথ্য ফাঁস করিবার মাধ্যমে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হইয়াছে; শাস্তিযোগ্য অপরাধ সংঘটিত হইয়াছে। এইদিকে, স্নোডেন সমর্থকরা এই ঘটনাকে অত্যন্ত ইতিবাচক বলিয়া মান্য করিয়াছেন। তাহারা মনে করিতেছেন যে, নাগরিকদের উপর নজরদারীর খবর ফাঁস করিয়া দিয়া মার্কিন সংবিধানে বর্ণিত ব্যক্তির গোপনীয়তা সুরক্ষায় পুরস্কৃত হইবার মত অবদান রাখিয়াছেন স্নোডেন। লক্ষ্য করিবার মতন বিষয় এই যে, স্নোডেন যাহা করেন নাই রাষ্ট্র, রাষ্ট্রানুগত লেখক-কলামিস্ট-প্রতিবেদক এবং মার্কিন মিডিয়ায় প্রভাবশালী অংশটি স্নোডেনের উপরে তাহাই চাপাইয়া দিতে উদ্যত হইয়াছে। স্নোডেন ব্যক্তিগত গোপনীয় হরণকারী একটি কর্মসূচির খবর ফাঁস করিয়া দিয়াছেন। কিন্তু ইহার সহিত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ কিংবা কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে কোন তথ্য দেন নাই স্নোডেন। এমতাবস্থায় রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা বা নিরাপত্তা বিঘ্নিত হইবার ব্যাপারটি অবান্তর। অথচ স্নোডেনকে এই অভিযোগগুলিতে অভিযুক্ত করা হইতেছে। তাহাকে ‘‘খ্যাতিলাভে আগ্রাসী’’, ‘‘উত্তেজনা সৃষ্টিতে পারঙ্গম’’, ‘‘সন্ত্রাসবাদ বিরোধী লড়াইয়ে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী’’, ‘‘সততা ও নিষ্ঠাপরায়ণতা ভঙ্গকারী’’, ‘’আত্মপ্রেমে মগ্ন’’, ‘‘জাতীয় নিরাপত্তার সাথে আপোষকারী’’ এক ব্যক্তি হিসাবে চিহ্নিত করিয়া ‘‘কারাগারে পাঠানো দরকার’’ বলিয়া মত প্রকাশ করা হইতেছে। তবে কথা হইতেছে এই যে, যুগ পাল্টাইয়া যাইতেছে। প্রশাসনিক ক্ষমতা, মিডিয়াতে প্রভাব ও বৈশ্বিক শক্তিমত্তার প্রয়োগ ঘটাইয়া স্নোডেনকে শায়েস্তা করিয়া ফেলা যাইবে কিনা তাহা সময় বলিয়া দিবে। কিন্তু উইকিলিকসের জুলিয়া অ্যাসাঞ্জের মত এডওয়ার্ড স্নোডেনও একটি ঘুন্টি বাজাইয়া দিয়াছেন। রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার সম্পর্কের পরিসর লইয়া নতুন করিয়া আলোচনা সামনে আনিয়া দিয়াছেন স্নোডেন। উল্লেখ্য, মার্কিন সংবিধানে রাষ্ট্র কর্তৃক নাগরিকদের উপরে গণহারে, ব্যাপকমাত্রায় নজরদারী নিষিদ্ধ করা হইয়াছে। এই প্রসঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে নাত্সীদের বিচারের জন্য স্থাপিত নুরেমবার্গ আদালতের একটি বক্তব্য স্মরণে রাখা যাইতে পারে। নুরেমবার্গ আদালতের মতে, শান্তি এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটন প্রতিরোধের প্রয়োজন পড়িলে দেশীয় আইন লঙ্ঘন করাটা প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য। পাইকারি হারে নজরদারীর প্রক্রিয়াকে অনেকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসাবেই চিহ্নিত করেন। আর এইভাবে ভাবিলে এডওয়ার্ড স্নোডেন যাহা করিয়াছেন তাহাকে রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের পালনীয় কর্তব্যের মধ্যে পড়ে বলিয়া ধরিয়া লওয়া যাইতে পারে।