বাংলাদেশের ক্ষুদ্র আয়তনের তুলনায় মানুষের সংখ্যা বহুগুণে বেশি। জনসংখ্যা বাড়ছে কিন্তু কর্মসংস্থান কি বাড়ছে? জনসংখ্যা কি মানবসম্পদে রূপান্তর হচ্ছে? বর্তমানে সন্তান প্রজনন পদ্ধতি যে হারে বাড়ছে সে হারে কর্মসংস্থান বাড়ছে না। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য প্রতি বছর ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করার কথা থাকলেও তা না করে অযাচিত সীমাহীন কোটার বদৌলতে সংকীর্ণ কর্মসংস্থানকে আরো সংকীর্ণ করা হচ্ছে। এ যেন বোঝার ওপর শাকের আঁঁটি। ক্রমবর্ধমান জনগণ একদিকে দেখছে বেকারত্বের অভিশপ্ত মুখ অন্যদিকে কোটার বেড়াজাল। সব মিলে চাকরিজগতে যেন এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ।
যাঁরা যুদ্ধ করেছেন, শহীদ হয়েছে তাঁদের ঋণ কোনোদিন শোধ করা যাবে না। তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ রাষ্ট্র তাঁদের জন্য কোটার ব্যবস্থা করেছে। আমি এই কোটাকে কোটা বলবো না বরং সম্মাননা বলবো। কেননা কোটা হলো দাবির বিষয়। এতে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে অসম্মান করা হবে। আর সম্মাননা বিষয়টি মুক্তিযোদ্ধার সম্মানের প্রতীক, যেখানে স্বার্থ গৌণ। ৭১ সালের কাদেরিয়া বাহিনীর মুক্তিসেনা আ. করিম কোনো কোটা পাননি। কেন পাননি প্রশ্ন করলে উত্তরে বললেন, “কোটা সম্মাননার বিষয়, দাবির নয়। আর এই সম্মাননা দাবি করলে নিজেকে ভুয়া মনে হয়।”
আমি মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা নামক সম্মাননার বিরুদ্ধে বলছি না। বরং যারা ছলে বলে কৌশলে মুক্তিযোদ্ধার সিল পিঠে লাগিয়ে সম্মাননাকে কোটার দাবিতে পরিণত করেছে, যার ফলে কোটার সূচক শেয়ার সূচকের মতো ৫৫ শতাংশে পৌঁছেছে। এই পাহাড়সম কোটার চার ভাগের এক ভাগ প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা পাচ্ছে কিনা সন্দেহ। কারণ যাঁরা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা তাঁরা তৃণমূল পর্যায়ের হতদরিদ্র নিরীহ, নিরক্ষর গ্রামের বাসিন্দা। আমার বাবা-দাদা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের খাদ্য-শস্য, অর্থ ও রসদ দিয়ে সর্বাত্মক সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন। গ্রামে থাকেন বলেই তাঁরা চল্লিশ বছর পরেও কোটা নামক সুবিধার অর্থ বুঝতে সক্ষম হননি। আমি তাঁদেরই সন্তান, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। কোটা বুঝি না, বোঝার চেষ্টাও করি না। আমি বিশ্বাস করি মেধাকে, যোগ্যতাকে।
আর যাঁরা কোটা নামক সুবিধা পেয়েছে তারা শহুরে নাগরিক। এখন প্রশ্ন হলো কোটার বাকি তিন ভাগ কারা ভোগ করছে? এই তিন ভাগের ভোগী হলো কোটার দাবিদার। যারা বুদ্ধি-মেধা,শ্রম-অর্থ খাটিয়ে রাজনীতির ছত্রছায়ায় কোটার মালিক হয়েছে।
গ্রামে এক ধরনের সংকীর্ণ চিন্তা সম্পন্ন মাতব্বর শ্রেণির বসবাস রয়েছে। যারা নিজেদের লোকবল ভারী করা ও দলে লোক ভেড়ানোর জন্য বিশেষ সময়ে ও মৌসুমে বিশেষ সুবিধা স্বরূপ কাপড়-কম্বল বা অনুদান দিয়ে থাকে, তাতে উদ্দেশ্য কার্যকরভাবে হাসিল হয়। তেমনিভাবে আমাদের সরকারেরাও একই সংকীর্ণ চিন্তার বশবর্তী হয়ে অনুদানের মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়াতে আর্টিফিসিয়াল মুক্তিযোদ্ধা বেড়ে যাওয়াতে কোটা নামক সুবিধার সূচক এত ঊর্ধ্বগামী যে মেধাবীদের সূচক নিম্নগামী।
ইদানীং মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা কোটার বেড়াজাল থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করছে। যদি এ আন্দোলন শত ভাগ সফল হয় তাহলে দেশ অনুন্নয়নের জড়তা থেকে মুক্ত হয়ে দ্রুত উন্নয়নের দিকে ছুটে চলবে।
অবশ্য কোটা বাতিল করলে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা সরকারের এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাবে। কারণ একজন মুক্তিযোদ্ধার যে সম্মান তা বিশাল কোটার সুবিধার বিনিময়ে বিকিয়ে দিতে নারাজ। বরং তাঁরা চান স্বাধীনতাযুদ্ধে তাঁদের অবদান সকলে সমহারে ভোগ করবে। আর এটাই হলো মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও বাংলাদেশ। আর কোটার দাবিদাররা কোটার সুবিধার জন্য মরিয়া হয়ে উঠবে কারণ তাতে দেশের স্বার্থ না থাকলেও নিজেদের রয়েছে ষোল আনা স্বার্থ। যা মুক্তিযোদ্ধাদের চরিত্রের পরিপন্থী।
তাই সরকারকে জোরালোভাবে বলবো মুষ্টিমেয় মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননা দেওয়ার নাম করে কোটা নামক অনুন্নয়নের জালে আটকে রেখে দেশকে পেছনে ঠেলে দেবেন না। কেননা রাজনীতি গোটা দেশের মানুষের জন্য। তাই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবিকে অবজ্ঞা না করে তাদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে সরকারিভাবে সকল সহায়তা দেওয়া হোক। এটাই নতুন প্রজন্মের দাবি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
