শ্রদ্ধাঞ্জলি

প্রথম বাঙালি মুসলমান চিত্রকর কাজী আবুল কাসেম

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০১৩, ২১:৫৮
গতকাল ছিল প্রথম বাঙালি মুসলমান চিত্রকর কাজী আবুল কাসেমের মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি এইদিনে বিরানব্বই বছর বয়সে ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। ১৯১৩ সালের ৭ মে যশোর জেলার উমেদপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবার নাম কাজী মকবুল আলী। মায়ের নাম মেহেরুননিসা খাতুন। কাজী আবুল কাসেমের জীবনে ইতিহাস সৃষ্টিকারী এমন অনন্য ঘটনা আছে যে, শিল্পকলার হাতে-কলমে শিক্ষা না পেয়েও তিনি হয়ে উঠেন আপন প্রচেষ্টায় একজন সফল চিত্রকর। তার অনুসৃত পথেই ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সামাজিক পশ্চাত্পদতাকে পেছনে ফেলে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, সফিউদ্দিন আহমেদ চিত্রকর হওয়ার পথে যাত্রা শুরু করেছিলেন। সে যুগটি ছিল প্রথম বাঙালি মুসলমানদের যুগ। এটা ১৯৪৭ পূর্বেকার কথা। গত শতাব্দীর তৃতীয় দশকে বাঙালি মুসলমানরা শিক্ষা ও শিল্প-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যাত্রা শুরু করেছিলেন মাত্র। নতুন চেতনায় চোখ মেলে দেখার সময় ছিল তখন সেটা। শিল্পী কাজী আবুল কাসেমের আত্মকথা ‘পূবের জানালা’ প্রকাশিত হয়েছে ২০১০ সালে। এতে আছে পথিকৃত পর্যায়ের এই চিত্রকরের জীবনকথা। ঘটনাবহুল, সুদীর্ঘ ও স্মরণীয় জীবনের টুকরো স্মৃতি। বিক্ষিপ্ত এবং কিছুটা বিচ্ছিন্নভাবে লেখা এই আত্মকথা। শিল্পী তার জীবন সায়াহ্নে এসে লিখতে শুরু করেছিলেন। ব্যাপক ও বর্ণাঢ্য এবং স্মৃতিবহুল এই সুদীর্ঘ জীবনে শিল্পী দেখেছেন বৃটিশ-ভারত, ৪৭ এর দেশভাগ ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম, ১৯৫২এর ভাষা আন্দোলন, ষাটের দশকের বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন ও ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ। ‘পূবের জানালা’ বইটি পড়ে কাজী আবুল কাসেমের চিত্রকর হয়ে উঠার পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও পাঠক পেয়ে যান, সেটা হলো শিল্পী কাজী আবুল কাসেম প্রথম বাঙালি মুসলমান চিত্রকরই নন উপমহাদেশের সব সম্প্রদায়ের মধ্যে তিনি একজন পথিকৃত ব্যঙ্গচিত্রীও। দোপেয়াজার স্বাক্ষরে প্রথমত আজাদ, সওগাতসহ বিভিন্ন পত্রিকায় তার প্রকাশিত কার্টুন চিত্রে তার বৃদ্ধিদীপ্ত রসবোধ ও তীক্ষ্ম সমাজ সচেতনতা ফুটে উঠেছিল। ৫২-র ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষিতে এই শিল্পী প্রথম প্রতিবাদী কার্টুন এঁকেছিলেন। ‘হরফ খেদাও’ শিরোনামে সৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত এই কার্টুন সেই সময়ে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ততদিনে অবশ্য শিল্পী কাজী আবুল কাসেম কলকাতা থেকে সপরিবারে ঢাকায় স্থায়ীভাবে চলে এসেছিলেন। পাঠকদের একটু জানিয়ে রাখি, কলকাতায় শিল্পীর কষ্টকর জীবন সংগ্রাম ও আত্মপ্রতিষ্ঠা লাভের দিনগুলোর কথা। পর পর দুইবার কলকাতা আর্ট কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েও সেখানে পড়তে পারেননি কাজী আবুল কাসেম। প্রথমবার বয়স স্বল্পতার কারণে আর দ্বিতীয়বার অর্থের অভাবে। সে সময় আঠারো বছরের নিচে কোন ছাত্রকে কলকাতা আর্ট কলেজে ভর্তি করা হতো না। এক শুভাকাঙ্ক্ষীর সহায়তায় ঐ সময় এন মিত্র এন্ড কোম্পানি নামের একটি কমার্শিয়াল আর্ট স্টুডিওতে চাকরি পান কাজী আবুল কাসেম। কঠোর পরিশ্রম ও আপন যোগ্যতার প্রকাশ রেখে এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান চিত্রকর্মী হয়ে উঠেন কাজী আবুল কাসেম কয়েক বছরের মধ্যেই। ১৯৩০-৪০ এই সময়ে কলকাতার বিভিন্ন সেরা পত্রিকা ও সাময়িকীতে শিল্পী কাজী আবুল কাসেমের আঁকা অনেক সুকুমার চিত্র ছাপা হতে থাকে। সুকুমার চিত্র ছাড়াও শিল্পী ব্যবহারিক ও ব্যঙ্গ চিত্রও আঁকতেন। সেই সময় কলকাতার ভারতবর্ষ, বসুমতি, বঙ্গলক্ষ্মী, মোহাম্মাদী, হানাফী ও সওগাত পত্রিকায় প্রথম একজন মুসলিম চিত্রকরের আবির্ভাব সকলে বিস্ময়ের সাথে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। ঐ সময়ে প্রায় অকল্পনীয় ঘটনা ছিল সেটি। সে সময় অসিত হালদার, ফনীন্দ্র ভূষণ গুপ্ত, দেবীপ্রসাদ রায় চৌধুরী, সতীশ সিংহ প্রমুখ খ্যাতিমান হিন্দু চিত্রকরদের মাঝে কাজী আবুল কাসেম বাঙালি মুসলমানদের চিত্রকলার জগতে প্রথম স্থানটি করে নিয়েছিলেন। এই ক্ষেত্রে মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন ও তাঁর সওগাত পত্রিকার বিশেষ ভূমিকা ছিল। চিত্রকর ছাড়াও কাজী আবুল কাসেম ছোট সোনামণিদের বই-পুস্তকের সজ্জাকর হিসেবেও খ্যাতিমান হয়ে উঠেন। সেকালের রম্য ও পাঠ্যপুস্তকের প্রচ্ছদ এবং অভ্যন্তরীণ চিত্রের ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়। কবি গোলাম মোস্তফার-আলোকমালা বইটির প্রচ্ছদ আজও তাঁর অসাধারণ কর্মনৈপুণ্যের পরিচয় বহন করে। বহু গ্রন্থসজ্জার কাজ তিনি করেছেন। পত্রিকার বিশেষ সংখ্যার প্রচ্ছদ বা শীর্ষচিত্র (হেডপিস)ও করেছেন এমনকি কমিকস্টিপও এঁকেছেন তিনি। ছোটদের বইয়ের অলংকরণে ছিল তাঁর অত্যন্ত সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গি-কাজলা পুলিশ, পুথির মালা, সবুজ ছড়া, ব্যঙ্গ ওস্তাদের জলসায়- প্রভৃতি বই-এ তাঁর কর্মকুশলতার উজ্জ্বল পরিচয় পাওয়া যায়।যারা চিত্রশিল্পী আছেন বা ভবিষ্যতে এ পথে আসবেন তারা যদি স্বনির্মিত এই পথিকৃত্ চিত্রকরের জীবনের সংগ্রামমুখর ও কষ্টকর জীবন কাহিনী পড়ে একটুও অনুপ্রাণিত হন তাহলেই বাঙালি সমগ্র জাদুঘর-এর ‘পূবের জানালা’ বইটি প্রকাশের উদ্দেশ্য সফল হবে। প্রয়াত এই নবতিপর চিত্রকরের নবম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। লেখক :নির্বাহী পরিচালক, বাঙালি সমগ্র জাদুঘর