নিমাই চন্দ্র চক্রবর্তী
প্রধান শিক্ষক (অবঃ)
রাজশাহী ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড উচ্চ বিদ্যালয়।
‘ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে’ — কিম্বা ‘ আজকের শিশুই আগামীর ভবিষ্যত্’ — এ বাক্যগুলো নিছক কাব্য নয়, এর মধ্যে নিহিত আছে গূঢ় অর্থ। একটি প্রাসাদ নির্মাণের জন্য যেমন ফাউন্ডেশনের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হয়, তেমনি একটি সমগ্র জাতির যারা ভবিষ্যত্ নিয়ন্তা তাদের ফাউন্ডেশনের উপরও গুরুত্ব দেয়া অতি আবশ্যক। এতে কারো দ্বিমত থাকার কথা নয়। প্রত্যেক শিশুই কিছু না কিছু মেধা-প্রতিভা-দক্ষতা নিয়েই ভূমিষ্ট হয়। কিন্তু এই মেধা-প্রতিভা-দক্ষতা বিকশিত হবে যথার্থ পরিচর্যায়। এই পরিচর্যা শুরু হবে একেবারে শিশুবয়স থেকেই। এজন্য প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব অনস্বীকার্য।পৃথিবীর অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনায় আমাদের দেশের দারিদ্র্য, অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অভিভাবকের দূরদর্শিতার অভাব, অসচেতনতা, গতানুগতিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাসনদের মূল্যায়ন চেতনা, জনসংখ্যা বৃদ্ধিসহ বহুবিধ সমস্যায় জর্জরিত হবার জন্য আমাদের শিশুরা মেধা থাকা সত্ত্বেও উন্নত দেশের শিশুদের মতো শিখনে-চেতনে-মননে পরিপক্কতা অর্জন করতে পাচ্ছে না। প্রান্তিক পর্যায়ের নিম্নবিত্ত এমনকি মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরাও জাতিসংঘের শিশু আইন সনদের ধারাগুলো সম্পর্কে একেবারে অজ্ঞ। তাছাড়া জাতিসংঘের শিশু আইন সনদের ধারাগুলো কার্যকর করার ক্ষেত্রে আমাদের দেশে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে।
হেব ও হারলো উভয়েই বলেছেন, নার্সারি বা শিশু বিদ্যালয়ে শিশুর শিক্ষা পরবর্তীকালে বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষার প্রস্তুতি স্তরকে সুদৃঢ় করে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে পূর্ব জ্ঞানসম্পন্ন এসব শিশু সহজেই সব ধরণের পরিবেশের সাথে মানিয়ে চলতে পারে। নার্সারি, কিন্ডার গার্টেন স্কুলে শিশুকে যে আচরণিক-মানসিক সুস্থিরতা গঠনে প্রস্তুত করা হয়, তার ফলে তাদের স্কুল ভীতি থাকে না, কিম্বা স্কুলের নিয়ম-নীতিকে প্রতিবন্ধকতা মনে হয় না। এতে করে বিদ্যালয়ের ‘ঝরে-পড়া’ সমস্যাও অনেকাংশে হ্রাস পায়। অস্ট্রেলিয়া,যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাকে একশত ভাগ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। ফলে তাদের শিশুরা পরবর্তী উচ্চ স্তরে অনায়াসে জ্ঞান অর্জনে ব্রতী হয়ে ওঠে। আমাদের দেশে যে সব প্রাক-প্রাথমিক প্রতিষ্ঠান আছে সে সবের অধিকাংশই ‘কমার্শিয়াল’ প্রতিষ্ঠানমাত্র। ধনী লোকের সন্তানেরা উচ্চ অংকের অর্থে এসব প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে। নিম্নবিত্ত তো দূরের কথা , নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত পরিবারও অর্থের মাত্রা দেখে সন্তানের শিক্ষার কথা মাথায় নিয়ে আসে না। এসব প্রতিষ্ঠানে নেই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক। শিশু মনোবিজ্ঞান না জানলে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হবার যোগ্যতা থাকে না। সম্প্রতি কর্মব্যস্ত মা-বাবা তাদের সন্তানকে রেখে যান ‘ডে-কেয়ার’ সেন্টারে। এখানেও কিন্তু শিশুদের আনন্দঘন পরিবেশে রাখার কথা। মাতৃস্নেহে লালিত পালিত হবার কথা। বাচ্চার খাবারের জন্য মা-বাবার নিকট থেকে যে অর্থ নেয়া হয়, তা থেকেও শিশুদের বঞ্চিত করা হয়। প্রকৃতপক্ষে শিশু মনোবিজ্ঞান বলে, শিশুর নিজের একটা স্বপ্নের জগত্ থাকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর গানে বলেছেন,‘ আমরা সবাই রাজা আমাদেরই রাজার রাজত্বে।’ — এ আসলে শিশুর জন্য প্রযোজ্য।তাই শিশুর ভালো লাগা মন্দ লাগা বিষয়টিকে উপেক্ষা করার কোন সুযোগ নেই। খেলনা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতেই অনেক কৌশল শিখে যাবে। যখন শিশু নতুন বশের সাথে মানিয়ে চলতে পারে। নার্সারি, কিন্ডার গার্টেন স্কুলে শিশুকে যে আচরণিক-মানসিক সুস্থিরতা গঠনে প্রস্তুত করা হয়, তার ফলে তাদের স্কুল ভীতি থাকে না, কিম্বা স্কুলের নিয়ম-নীতিকে প্রতিবন্ধকতা মনে হয় না। এতে করে বিদ্যালয়ের ‘ঝরে-পড়া’ সমস্যাও অনেকাংশে হ্রাস পায়। অস্ট্রেলিয়া,যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাকে একশত ভাগ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। ফলে তাদের শিশুরা পরবর্তী উচ্চ স্তরে অনায়াসে জ্ঞান অর্জনে ব্রতী হয়ে ওঠে। আমাদের দেশে যে সব প্রাক-প্রাথমিক প্রতিষ্ঠান আছে সে সবের অধিকাংশই ‘কমার্শিয়াল’ প্রতিষ্ঠানমাত্র। প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অর্জিত শিখন ফল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, তাই এ বিষয়টিকে অধিক গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয় শিড়্গানীতির আওতাভূক্ত করা প্রয়োজন। এছাড়া শিশু অধিকার সনদ ও জাতীয় শিশুনীতির আলোকে শিশু শিক্ষা বিশেষত প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণ,শিশু-বান্ধব বাজেট প্রণয়ন আবশ্যক।
