সাফল্য যেভাবে ধরা দেয়

আপডেট : ২০ জুলাই ২০১৩, ২১:৩৬
উদ্যোক্তা মাহফুজ আহমেদের প্রযুক্তি-সেবার কোম্পানিটি হয়তো খুব আনন্দদায়ক নয়, কিন্তু তার ফলাফল ঠিক বিপরীত। বাংলাদেশি বংশোদ্ভুুত মাহফুজের বাবার মৃত্যু হয়েছিল মাত্র ৬ বছর বয়সে। প্রযুক্তিগত বিষয়ের ওপর তাকে পড়ালেখা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন তার দাদাজান। বলেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে যেতে। তখন তার বয়স মাত্র ১৮ বছর। ঘটনাটি ১৯৮৯ সালের, মাহফুজ যখন হাই স্কুলের ছাত্র। বাংলাদেশের উচ্চ মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে হওয়ায় মাহফুজের জন্য আমেরিকা পাড়ি দেয়া খুব কঠিন হয়নি। কৌশলগত এই এক নম্বর সিদ্ধান্তের কারণে মাহফুজ এখন যুক্তরাষ্ট্রের মাল্টিমিলিয়নার। তার সাফল্যগাথার সারসংক্ষেপ আমাদের শেখায় কীভাবে শূন্য থেকে শুরু করেও একজন প্রযুক্তি-নির্ভর উদ্যোক্তা কোটি কোটি ডলারের সম্পদ গড়ে তুলতে পারেন। স্নাতক সম্পন্ন করতে মাহফুজ আমেরিকা পাড়ি জমান নব্বই দশকের শুরুতে। জর্জ ম্যাশন ইউনিভার্সিটিতে ইঞ্জিনিয়ারিং ও কম্পিউটার সায়েন্সে পড়ালেখার সময় টাকা বাঁচাতে তিনি এক কাকার বাড়িতে আশ্রয় নেন। মায়ের জমানো টাকা এবং বড়লোক কাকার কাছ থেকে অর্থ ধার করে মাহফুজ তার বিপুল অঙ্কের টিউশন ফি মেটাতে পারে। গ্রাজুয়েশন শেষ করেন ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে। তারপর অনেক সাধারণ-অসাধারণ কাহিনী। এবং এখন তিনি এমন একটি কোম্পানির মালিক, যার সর্বশেষ বাত্সরিক আয় প্রায় ৩৫ কোটি ডলার। মাত্র ৪১ বছর বয়সে তিনি এই অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলেন কর্মের প্রতি এক গভীর একনিষ্ঠতায়, ভালোবাসায়। ‘ডিজিটাল ইন্টিলিজেন্স সিস্টেম’, সংক্ষেপে ডাইসিস। এই ডাইসিস কোম্পানির মালিকানার ৮০ শতাংশ অংশিদারিত্ব রয়েছে মাহফুজের। এর প্রধান প্রতিষ্ঠাতাও তিনি। কোম্পানিটির লভ্যাংশের পরিমাণ প্রায় পৌনে দুই কোটি ডলার। চার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান ছাড়াও তাদের অফিসের সংখ্যা ২৮টি, এর ভেতরে ১০টি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে। ২০০১ সালে ডাইসিস-এর আয় ছিল মাত্র ১৬ লাখ ডলার। মাত্র পাঁচ বছরে সেই আয় গিয়ে দাঁড়ায় ৫ কোটি ৬২ লাখ ডলারে। আর ২০১২ সালে আয় ছিল ৩৪ কোটি ৩২ লাখ ডলার! কিন্তু সাফল্য এত সহজে ধরা দেয়নি তাদের প্রাযুক্তিক জালে। মাহফুজ বলেন, প্রতিযোগিতায় জয়ী হবার শিক্ষা তিনি পেয়েছেন ১৫ কোটির বাংলাদেশ থেকে, যে দেশটির আয়তন যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া স্টেটের সমান মাত্র। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ নিশ্চিতভাবে অপ্রতুল পণ্যদব্য ব্যবহার করতে পারেন। কল ছাড়লেই এখানে জল পাওয়া যায়। কিন্তু বাংলাদেশের যেকোনো একটি দিনে তুমি কমপক্ষে তিন-চার ঘণ্টা বিদ্যুত্ পাবে না। প্রত্যেকের তাই নিজস্ব জেনারেটর রয়েছে। যখন তুমি দেখবে বিপুল মানুষের বিপরীতে অসংগতিপূর্ণ সম্পদ তখন তোমাকে হয় খুব ভালো করতে হবে, নয়তো মরতে হবে। ডারউইনবাদ এ কথাই বলে।’ পড়ালেখা শেষে সময় অপচয় না করে তিনি বৃহত্ তেল কোম্পানি ‘মোবিল’-এ যোগদান করেন। সে সময় তিনি টেকনোলজি বিভাগে কাজ করতেন যখন তার বাত্সরিক আয় ছিল মাত্র ৩৮ হাজার ডলার। তিনি জানতেন তাকে প্রকৃত সম্পদশালী হতে হলে নিজেকেই উদ্যোক্তা হতে হবে, নিজস্ব কোম্পানি চালু করতে হবে। তাই কাজের ফাঁকে তার কিছু সহকর্মীর সঙ্গে মাথা খাটাতেন নতুন নতুন ব্যবসাবুদ্ধি খুঁজে বের করতে। এভাবে ১৯৯৪ সালে তারা চার বন্ধু মিলে খুললেন ডাইসিস—ডিজিটাল ইন্টিলিজেন্স সিস্টেম। প্রথম দুই বছরে কোম্পানিটি খুব ধীরলয়ে এগোতে থাকল, আয় হলো সাকুল্যে মাত্র সাড়ে চার হাজার ডলার। হতাশ হয়ে তার দুই অংশিদার সরে গেলেন। তিনি এবং তার অবশিষ্ট অংশিদার এরপর ডাইসিস নিয়ে শুরু করলেন এক অভাবিত সংগ্রাম। মাহফুজ বলেন, পশ্চিমা ফেয়ারফক্স কাউন্টিতে বসবাসের সময় ১৮ মাস স্ত্রীর ঘুমন্ত অবস্থা ছাড়া আর তাদের দেখা হয়নি। ১৯৯৬ সালে ডিসেম্বরে তাদের কোম্পানির প্রথম বিরাট সাফল্য আসে। সে বছর তারা মোবিল কোম্পানির সঙ্গে দুই লাখ ডলারে চুক্তিবদ্ধ হন। মাহফুজ বলেন, আমি ওই কোম্পানির ম্যানেজারের কাছে গিয়ে অনুগ্রহ চেয়ে বলেছিলাম আমাদের কোম্পানিকে একটিবার সুযোগ দিতে। আমরা সুযোগ পেয়েছিলাম, তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। অল্প কিছুদিনের ভেতরে বিডিএম, ফ্রেডাই ম্যাক, টিআরডাব্লিউ জাতীয় বড় বড় কোম্পানি তাদের টেকনোলজি সংক্রান্ত কাজের জন্য ডাইসিসকে ডাকে। ১৯৯৮ সালে ডাইসিসের আয় দাঁড়ায় সাত লাখ ডলারে। সে সময় কম্পিউটার যন্ত্রাংশের যে বিপ্লব ঘটে, তা দারুণভাবে পক্ষে যায় ডাইসিস কোম্পানির। ২০০০ সালে তারা ভার্জিনিয়া স্টেটের সঙ্গে ৪০ লাখ ডলারে চুক্তিবদ্ধ হয় টেকনিক্যাল কাজের জন্য। তারপরের চিত্র আগেই বলা হয়ে গেছে। মাহফুজ এখন বিপুল সম্পদের মালিক। তিনি মনে করেন তার দাদাজানের পরামর্শে কোনো ভুল ছিল না। ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে ভাষান্তর : অদ্বয় দত্ত

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন