সংশোধিত শ্রম আইন :একটি পর্যালোচনা

আপডেট : ২১ জুলাই ২০১৩, ২১:৫৭
বাংলাদেশের শ্রম আইন-২০০৬ এর খসড়া সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। সংসদে অনুমোদিত হবার সঙ্গে সঙ্গেই সরকার একে দেশের শ্রম অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিশাল অবগতি বলে আখ্যায়িত করেছে। বলা হয়েছে, এ আইনের সংশোধনী পাসের ফলে দেশের শ্রম পরিবেশে স্থিতিশীলতা আসবে। গোয়ালা যেমন নিজের দুধকে কখনোই নিম্নমানের বলেন না। তেমনি আইন প্রণয়নকারী সংস্থার সদস্য হিসেবে সরকার দলীয় নেতারাও এ আইনের সংশোধনী প্রস্তাব পাস করার আগে এর অন্তর্নিহিত ত্রুটিসমূহ খুঁজে পাননি। ফলে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ত্রুটিপূর্ণ ও ন্যায়পরায়ণতা পরিপন্থী ধারা সংশোধিত শ্রম আইনে সন্নিবেশিত হয়েছে। যার ফলে এ আইনের মাধ্যমে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার রক্ষিত হবার বিষয়টি প্রশ্ন সাপেক্ষ হয়ে পড়েছে। গত ২২ এপ্রিল ২০১৩ তারিখে মন্ত্রিসভায় বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬ এই সংশোধনী প্রস্তাব নীতিগতভাবে অনুমোদিত হবার পর দেশের বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এ সংশোধনীর প্রস্তাবের নানা ত্রুটিপূর্ণ দিক সম্পর্কে সরকারকে সুনির্দিষ্টভাবে অবহিত করেছে। তাছাড়া, এ সংশোধনী প্রস্তাব প্রস্তুতের আগে সরকারের শ্রম মন্ত্রণালয় বিভিন্ন পর্যায়ে আইনজীবী, বিশেষজ্ঞ ও শ্রমিক নেতৃত্বের সঙ্গে পরামর্শ সভা করেছে বলে শোনা গেছে। কিন্তু এসবের কোন প্রতিফলনই অনুমোদিত শ্রম আইনের খসড়ায় দেখা যায়নি। ফলে সংশোধিত এ শ্রম আইন নিয়ে দেশের শ্রমিক পরিমন্ডলে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন গুলোও এ আইন নিয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। সংশোধিত বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬ প্রসঙ্গে হিউম্যান ব্রাইটস ওয়াচ গত ১৬ জুলাই বলেছে এ আইন শ্রমিক অধিকার রক্ষায় যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের জনগণ ভাল করেই জানে, সাভারের রানাপ্লাজা,তাজরীন গার্মেন্ট প্রভৃতি বিপর্যয়ের মতো পরিস্থিতির কারণে দেশের শ্রম অধিকার, শ্রমপরিবেশ ও শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা প্রভৃতি ইস্যুতে যে জনমত বা জনচাপ সৃষ্টি হয়েছে। তার ফলে, সরকারকে বিদ্যমান শ্রম আইনকে শ্রমিক বান্ধব ও যুগোপযোগী করার কথা ভাবতে বাধ্য করেছে। পাশাপাশি একই ইস্যুতে পশ্চিমা ক্রেতা সমাজ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর চাপও সরকারকে বিবেচনায় নিতে হয়েছে। সংশোধিত শ্রম আইনের গভীরতর বিশ্লেষণ তাই আজ শ্রমিক শ্রেণী, মালিক ও সরকার সবার জন্যই জরুরি। আমাদেরকে দেখতে হবে শ্রমিকের চাকীি ও জীবনের নিরাপত্তার জন্য সংশোধিত শ্রম আইনে কতটুকু নিশ্চয়তা বিধান করা হয়েছে? শ্রমপরিবেশ ও শ্রমিকের অধিকারের মৌলিক উপাদান হিসেবে সে অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারের কথা আজ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে আইন স্বীকৃত হয়েছে, সংশোধিত আইনে যে অধিকার কতটুকু রক্ষিত হয়েছে। দেখতে হবে, এ আইনের মাধ্যমে শ্রমিক অধিকার রক্ষার আন্তর্জাতিক মান রক্ষিত হচ্ছে কিনা? এ আইনে নারী শ্রমিকের বিশেষ অধিকার কতটুকু রক্ষিত হয়েছে ইত্যাদি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা উত্তর ও স্বাধীনতা পরবর্তী ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বরাবরই এ আন্দোলন গৌরবময় ঐতিহ্যমন্ডিত ছিল। এদেশের শ্রমিক শ্রেণী শুধু নিজেদের পেশাগত অধিকার রক্ষার সংগ্রামই করেনি। পাশাপাশি ভাষার অধিকার, স্বাধীনতা ও গনতন্ত্রের সংগ্রামেও এদেশের শ্রমিক শ্রেণীর উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল। পাকিস্তানী যুগেও সরকারি কর্মচারীসহ শ্রমিক কর্মচারী এমনকি পুলিশেরও ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার ছিল। আই, আর ও ৬৯ অনুযায়ী কারখানা কিংবা প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরা তাদের শ্রমিক সংস্থায় শতকরা ২৫ ভাগ বহিরাগত কর্মীদের নেতা নির্বাচিত করতে পারতো। ফলে বামপন্থী কিংবা মানবতাবাদী মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ বহু উচ্চ শিক্ষিত তরুণ তখন শ্রমিক আন্দোলনে যুক্ত হতে পেরেছিল। যার ফলে, তখনকার শ্রমিক আন্দোলনও ছিল গুণগতমানে অনেক উন্নত ও দায়িত্বশীল। কিন্তু দেশের গণতন্ত্রের আকাশে কালোমেঘ দেখা দিলে শ্রমিক আইনেও সেই কালো মেঘের প্রভাব বিস্তার হয়। সামরিক শাসকরা ক্ষমতায় এসেই গণতন্ত্রের টুটি চেপে ধরার পাশাপাশি শ্রমিক আন্দোলনের ও টুটি চেপে ধরে। ফলে ১৯৭৭ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে সরকারি এবং বেসরকারি উভয় খাতে ঢালাওভাবে ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার ছিনিয়ে নেয়া হয়। সামরিক শাসকরা এবং তাদের আদর্শের অনুসারীরা সুশৃঙ্খল ট্রেড ইউনিয়ন এর বদলে বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন ও সি, বি, এ তে পরিকল্পিতভাবে এক ধরনের “ মাস্তানতন্ত্র্ত্র কায়েম করে। ফলে দুর্বৃত্তায়িত হয় শ্রমিক আন্দোলন। সংশোধিত আইনে সরকার সে দুর্বৃত্তায়ন রোধের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ না করে উপরন্তু শ্রমিক অধিকার হরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সংশোধিত শ্রম আইনের কয়েকটি ধারা পর্যালোচনা করলে এর অগণতান্ত্রিক চেহারাটি সবার কাছেই স্পষ্ট হয়ে উঠবে। এ আইনের ৩০৯ ধারায় বিপজ্জনক পরিণতি সম্পন্ন আইন লংঘনের জন্য নিয়োগকর্তা ও মালিকদের জন্য যে দণ্ড বিধান করা হয়েছে তা খুবই অপর্যাপ্ত। তাছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত বা নিহত শ্রমিকের জন্য ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ও হিসাবের যে মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে,তাও যুক্তিহীন। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শ্রমিকের সারাজীবনের আয়ের হিসেবে ও পরিবারের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার মতো ক্ষতিপূরণের বিধান থাকা বাঞ্ছনীয় ছিল। ২৩(৩), (৪)( ছ) ধারায় শ্রমিকের অসদাচরণের যে সংগা নির্ধারণ করা হয়েছে তাও ত্রুটিপূর্ণ। যার আশ্রয় নিয়ে মালিকরা নিরপরাধ শ্রমিককে চাকরিচ্যুত করতে পারে। তাছাড়া এই ধারার সংশোধ ীিপস্তাবটি একই আইনের ২৩ ও ২৪ ধারার সাথে সাংঘর্ষিকও বটে। ধারা ২ (৪৫) এ মজুরীর সংজ্ঞা হতে বাড়ীভাড়া বাদ দেয়া হয়েছে। নিম্ন আয়ের এই শ্রমিক শ্রেণীর ওপর এই বিধান দিগুণ চাপের সৃষ্টি করবে। ধারা ১০ এ ছুটির মেয়াদের ক্ষেত্রে সাময়িক ও অসুস্থতা জনিত ছুটি অন্তর্ভুক্ত কিনা তা স্পষ্ট করা হয়নি। জিএসপি সুবিধা বাতিলসহ নানা বিতর্কে পশ্চিমা দেশগুলো বিশেষত, ইউরোপীয় ইউয়নের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলো গার্মেন্টস শিল্পে কোম্পানির মুনাফায় শ্রমিকের অংশিদারীত্বের দাবীটি জোরের সাথে এনেছিল। ১৯৬৮ সা েকার্যকর না করে গার্মেন্ট মালিকরা শ্রমিকদের কোটি কোটি টাকা পাওনা বঞ্চিত করেছে। অথচ সরকার আবারও মালিক শ্রেণীর পক্ষাবলম্বন করে এই আইনের ২৩২ (৩) এবং ২৩৩ ধারা সংশোধন করে গার্মেন্টস শ্রমিকদের কোম্পানির% মুনাফা হতে বঞ্চিত করেছে। নারী শ্রমিকদের জন্য মাতৃকল্যাণ সুবিধা মাসে উন্নীত করার বহুল আলোচিত বিধানটিও সংশোধিত আইনে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। সর্বোপরি প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের প্রক্রিয়াকে সহজীকরণ করার কোন কার্যকর প্রস্তাব সংশোধনীতে করা হয়নি। ফলে শ্রম পরিচালক বা রেজিষ্ট্রার অব ট্রেড ইউনিয়নস্ এর স্বেচ্ছামূলক ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের কোন বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ না থাকার ফলে কারখানা বা প্রতিষ্ঠানে ট্রেড ইউনিয়নের নিবন্ধন পাওয়া আরো কঠিন হয়ে পড়বে। জাতীয় সংসদে অনুমোদিত এই সংশোধিত শ্রম আইন আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও দেশের ইমেজ ক্ষুণ্ন করবে। কারণ, জাতিসংঘের সদস্য হিসেবে। বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আই, এল, ও এর ৮ টি কনভেনশনও এর মধ্যে ৭টি অনুমোদন করছে। যেগুলোর মূল কথা হলো, শ্রমিকদের সংগঠন ও সমাবেশ করায় স্বাধীনতা এবং শ্রমিকদের নিজেদের নেতা নির্বাচনের স্বাধীনতা। সংশোধিত শ্রম আইন-২০০৬ এর বিভিন্ন ধারা আই,এল, ও এর এইসব্ কনভেনশনসমূহের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক । সরকারের এই দ্বৈত অবস্থান বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যে নিঃসন্দেহে নানা প্রশ্নের জন্ম দেবে। কেন সরকারের এই অবস্থান? জাতীয় সংসদের ২৬ জন সদস্য প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে গামের্ন্টস মালিক শ্রেণীর প্রতিনিধি হবার ফলেই কি শ্রম আইন-২০০৬ শ্রমিকবান্ধব হবার বদলে মালিকবান্ধব হলো? দেশে-বিদেশে এরকম নান প্রশ্ন এবং শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ নিয়ে সংশোধিত শ্রম আইন-২০০৬ তার যাত্রা শুরু করলো। এ আইনের ফলে যদি শিল্প শ্রমিক পরিমন্ডলে কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন না আসে। তাহলে এর দায়ভার আইন প্রণেতাদেরই বহন করবে হবে। বর্তমানে দেশের শ্রমশক্তির প্রায় ৯৪ শতাংশ ব্যক্তিমালিকানাধীন খাতে কর্মরত। সঙ্গত কারণেই, এ আইনের ত্রুটির জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ব্যক্তিমালিকানাধীন খাত এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমিকশ্রেণী। লেখক :আইজীবী, রাজনীতিক Email: [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন