আমরা ক্রমশ যন্ত্রের দাস হইয়া উঠিতেছি। প্রযুক্তির দাস। দাস হইতে হইতে আমাদের জন্য এমন দিন ঘনাইয়া আসিতেছে, যখন আমাদের ‘প্রাইভেসি’ বলিয়া কিছু থাকিবে না। সেই প্রাইভেসি বা গোপনীয়তা রক্ষায় এক্ষণে কালঘাম ছুটিতেছে বিশ্বের তাবড় তাবড় নিরাপত্তা সংস্থার। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দশাও তথৈবচ। তাই নূতন করিয়া কদর বাড়িয়াছে টাইপরাইটার যন্ত্রের, যাহাকে হ্যাক করা যাইবে না, মুহূর্তে মাল্টিপল কপি করা যাইবে না, ছড়াইয়া দিয়া যাইবে না অন্য কোথাও—গোপনে।
ডিজিটাল প্রযুক্তি এক ধরনের রূপকথার ফ্যান্টাসি জগেক বাস্তবের জমিনে টানিয়া আনিয়াছে, আনিতেছে আরো অভাবিত চমক। ইহার অতিমনোহর জাদুকরি শক্তি আমাদের চমকাইয়া থমকাইয়া বিবশ বাকরুদ্ধ করিয়া দেয়। তাই ডিজিটাল প্রযুক্তির এই অমৃত পানে আমাদের আগ্রহ ও উচ্ছ্বাস সীমাহীন। ইহা আমাদের কল্পবিজ্ঞান গল্পের কুশীলব করিয়া দেয়। কিন্তু আমরা কল্পনাও করিতে পারি না, এই অমৃতের তলে রহিয়াছে গরলের সরোবর। অন্তঃসলিলার মতো অন্তঃগরলও আমাদের জীবনকে বিষময় করিয়া তোলে তলে তলে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে কিছুদিন কাজ করিলে শীত-আতপকে আর আমাদের শরীর নিয়ন্ত্রণ করিতে পারে না। আমরাই ওই যন্ত্রের দাস হইয়া অধিক পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত করিবার ব্যবস্থা করি। ইহা ঠিক যে, গ্লাসের অর্ধেক শুধু খালি নহে, অর্ধেক পূর্ণও। কিন্তু আমরা যে শুধু ভরা দিকটাই দেখি নিজেদের আরাম- আয়েশের কারণে।
প্রযুক্তির সুবিধার কথা বলিয়া শেষ করা যাইবে না ইহা ঠিক, কিন্তু যন্ত্রের যন্ত্রণাও কোনো কোনো ক্ষেত্রে অস্বস্তির চূড়ান্ত হইয়া ওঠে। তেমন একটি জগতে আমরা ইতিমধ্যে ঢুকিয়া পড়িয়াছি। নিজেদের ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় এমন এক প্রাযুক্তিক জগতে প্রবেশ করিয়াছি যেইখানে কোনো গোপন কথাই আর রহিবে না গোপনে, সেই গোপন কথা ব্যক্তিপর্যায়ের হউক কিংবা কোনো রাষ্ট্রের। অর্থাত্ ইংরেজিতে ‘প্রাইভেসি’ বলিয়া যেই শব্দটি অতি উচ্চমার্গের ব্যক্তিস্বাধীনতার সমার্থক ছিল এতদিন—তাহা নিশ্চিতভাবেই মিউজিয়ামে চলিয়া যাইবে অদূর ভবিষ্যতে। না গিয়া উপায় নাই। প্রযুক্তির অমোঘ শক্তি ও নজরদারির কাছে আমরা অসহায় ভীষণ। এবং তাহা শুরু হইয়া গিয়াছে অনেক পূর্বেই। দিনকে দিন তাহা আরো নিষ্ঠুরভাবে চাপিয়া বসিতেছে আমাদের ব্যক্তিসত্তার উপর।
একটি আটপৌরে উদাহরণ দেওয়া যাক। ব্যক্তিগত কারণে গোপনে যে কেহ যেইখানেই যান না কেন, সঙ্গে মোবাইল ফোন থাকিলে প্রযুক্তির নজরদারির ভিতরে তিনি পড়িবেনই। যেই মোবাইল ফোন ব্যতীত ‘জেনারেশন ওয়াই’ তাহাদের জীবন ভাবিতেই পারে না, সেই মোবাইল ফোনই এখন অদৃশ্য টিকটিকির ভূমিকায়। অর্থাত্ মোবাইল ও ইন্টারনেটের যুগে মানুষের গোপনীয়তা বজায় রাখা অসম্ভব হইয়া পড়িয়াছে এখনই।
প্রযুক্তির উত্কর্ষের মহাবিস্ফোরণের দিন তো পড়িয়াই রহিয়াছে সামনে। সেই সময় প্রযুক্তির নব নব আবিষ্কারের সুফলের পাশাপাশি এর মানসিক যন্ত্রণার গ্রাফও আকাশ ছুঁইয়া যাইবে, তাহাতে সন্দেহ নাই। মার্কিন গুপ্তচর সংস্থার কর্মী স্নোডেন প্রযুক্তির এই নজরদারির গোপন কথা ফাঁস করিয়া বিব্রত করিয়াছে যুক্তরাষ্ট্রকে। কিন্তু এই তথ্য স্নোডেন ফাঁস করিয়া শুধু নিজের ব্যক্তিগত বিপদ ডাকিয়া আনিয়াছে। কারণ, এই নজরদারির কথা ফাঁস না হইলেও যাহা হইত, ফাঁস হইলেও তাহা হইবে। আমরা সর্বার্থেই প্রযুক্তির বৃত্তে আটকাইয়া গিয়াছি চিরতরে। সেই বৃত্তের ভিতরে বৃত্ত রহিয়াছে, তাহার অন্তর্জালে আমরা স্বেচ্ছাবন্দী। আমরা এমন একটা দুনিয়া আর কখনই পাইব না, যেইখানে প্রাইভেসি বলিয়া কিছু অবশিষ্ট থাকিবে। তাই যাহাদের তাহা দরকার, তাহারা ডিজিটাল ছাড়িয়া সেই পুরাতন প্রযুক্তির আশ্রয় লইতেছেন, যাহাতে গোপন কথাটি গোপন থাকিবে। রাশিয়ার পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপসহ অনেক রাষ্ট্রই তাহাদের গোপনীয়তা ও সুরক্ষা লইয়া নূতন করিয়া ভাবিবে।
প্রযুক্তির তুলনামূলক প্রাথমিক কাল ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সময়। তাহার পরও তিনি প্রযুক্তির যেইটুকু ঝংকার দেখিয়াছিলেন তাহাতে ‘সভ্যতার প্রতি’ অঙ্গুলি তুলিয়া বলিয়াছিলেন—‘দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর’। তাহার মনে হইয়াছিল এ সভ্যতা নিষ্ঠুর, সর্বগ্রাসী।
সর্বগ্রাসীই বটে। রাষ্ট্রের ক্ষমতা অনেক, কিন্তু মানুষের ব্যক্তিপর্যায়ের স্বাধীনতার কফিনে পেরেক ঠোঁকা চলিতেছেই। তাহা অনতিক্রম্য, অনিবার্য।
