[ সা ম্প্র তি ক ]

জনপ্রশাসনে নিয়োগ:মেধা ও কোটা

আপডেট : ২১ জুলাই ২০১৩, ২২:১৪
বিভিন্ন মহল থেকে বহুদিন ধরে অভিযোগ করা হচ্ছে যে, জনপ্রশাসনে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার চেয়ে কোটাকে বেশি প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। এই অবস্থার বিরুদ্ধে অনেকদিন ধরেই আন্দোলন চলছে। কোটা ব্যবস্থা থাকা উচিত কি উচিত না, আর থাকলেও তা কোন্ কোন্ ক্ষেত্রে কতটুকুই বা থাকা উচিত-এসব নিয়েই বিতর্ক। এসব বিতর্ক সত্ত্বেও মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা, নারীদের জন্য ১০ শতাংশ কোটা, জেলা ভিত্তিতে ১০ শতাংশ কোটা এবং আদিবাসীদের জন্য ৫ শতাংশ কোটা—অর্থাত্ কোটার আওতায় ৫৫ শতাংশ বহাল রেখেই পিএসসি এখন পর্যন্ত জনপ্রশাসনে নিয়োগ দিয়ে চলেছে। এতদিন এসব কোটা ভিত্তিক নিয়োগ চূড়ান্ত করা হতো বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফলাফল সাধারণ মেধার ভিত্তিতে নির্ধারণ ও প্রকাশ করার পরবর্তী ধাপে। কিন্তু এবার ৩৪ তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের আগেই কোটা ব্যবস্থা প্রয়োগ করা হয়। আগুনে ঘৃতাহুতির মতো তা চাকরি প্রত্যাশীদের ক্ষোভকে প্রচণ্ডভাবে উস্কে দেয়। স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ শুরু হয়ে যায়। তুমুল আন্দোলনের মুখে পিএসসি অবশ্য বাধ্য হয়ে এবার পিছু হটে এসেছে এবং আগের পদ্ধতিতে ৩৪ তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফল পুনঃপ্রকাশ করেছে। কিন্তু কোটা ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্কটি রয়েই গেছে। কোটা নিয়ে বিতর্কে তিন রকম মতামত রয়েছে। কেউ বলছে যে, কোটা পদ্ধতি সম্পূর্ণ তুলে দিয়ে কেবলমাত্র মেধাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। আরেক দল বলছে যে, কোটা পদ্ধতি যেভাবে আছে সেভাবেই তাকে বহাল রাখতে হবে। তৃতীয় মতটি হলো কোটা পদ্ধতি তুলে দেয়া চলবে না, তা বহাল রাখতে হবে বটে, তবে তা বহুমাত্রিকভাবে সংস্কার করতে হবে। এই তিন রকম মতামতের মধ্য থেকে সবচেয়ে উপযুক্ত কোনিট তা বুঝতে হলে মেধা ও দক্ষতার প্রশ্ন, সমতা ও ন্যায়-নীতির প্রশ্ন, রাষ্ট্রের আদর্শ ও লক্ষ্যের প্রশ্ন—এই তিনটি বিষয়কে বিবেচনায় নিতে হবে। স্বাভাবিক কারণেই জনপ্রশাসনে নিয়োগ প্রদানের ক্ষেত্রে মেধা ও দক্ষতার প্রশ্নটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মেধাবী ও দক্ষ ব্যক্তিদেরকে রাষ্ট্রীয় কাজ পরিচালনায় নিযুক্ত করাটি দেশ, রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য একটি প্রয়োজনীয় কর্তব্য। সে কর্তব্যকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শুধু কি জনপ্রশাসনে নিয়োগ দেয়ার আগেই কেবল মেধা ও দক্ষতার তুলনামূলক পরিমাপ করলেই চলবে? কারণ, সময়ের সাথে সাথে মেধা ও দক্ষতার ওঠানামা ঘটাটা স্বাভাবিক। নিয়োগের সময় একজন ব্যক্তির মেধা ও দক্ষতার মাত্রা যা ছিল, কাজে নিয়োজিত হওয়ার পর তা বাড়তে বা কমতে পারে। একজন ব্যক্তির চাকরি জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা তার মেধা ও দক্ষতাকে সাধারণভাবে কম-বেশি বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু সেই বৃদ্ধির পরিমাণ একেকজনের ক্ষেত্রে একেকরকম হয়ে থাকে। সেই পরিমাপটিকে বস্তুনিষ্ঠ ও সঠিকভাবে বিবেচনায় নিয়ে চাকরি জীবনে পদোন্নতি প্রদান নিশ্চিত করতে পারলে জনপ্রশাসনের মেধা ও দক্ষতার ভিত্তি সম্ভাব্য সর্বোচ্চ স্তরে রাখা সম্ভব। তাই, নিয়োগ ও পদোন্নতি উভয় ক্ষেত্রেই মেধাকে গুরুত্ব দেয়া অত্যাবশ্যক। এখন প্রশ্ন হলো, চাকরি প্রদানের সময় মেধা ও দক্ষতার সঠিক পরিমাপের উপায় কি? বাস্তব সত্য হলো এই যে, মেধার হিসেব ষোল আনা নিখুঁতভাবে করা সম্ভব নয়। তাছাড়া অগণিত মানুষের মেধা, প্রতিভা ও দক্ষতা অনেক ক্ষেত্রেই সুপ্ত হয়ে থাকে। সুযোগের অভাবে তা বিকশিত হতে পারে না। তাদের সেই লুকিয়ে থাকা প্রতিভা পরিমাপ করা তো দূরের কথা, তা আবিষ্কার করতে পারাটাও প্রায় অসম্ভব। এসব সীমাবদ্ধতার মাঝেই তুলনামূলক শুদ্ধতার সাথে মেধা পরিমাপের সর্বজন গ্রহণযোগ্য একটিই পথ আছে। তা হলো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রদর্শিত উত্কর্ষতা। লিখিত পরীক্ষা ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে মেধা পরিমাপ করার পথটিই সাধারণভাবে সর্বত্র অনুসরণ করা হয়। এসব পরীক্ষা যাতে পক্ষপাতিত্ব ও ক্রুটিমুক্তভাবে গ্রহণ করা হয়, মেধার ক্রম সঠিকভাবে নির্ধারণের জন্য তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই বিতর্কের ঊর্ধ্বে ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তি সম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়ে নিয়োগ প্রদানের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা সরকারি কর্মকমিশন বা পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) গঠিত হওয়াটা অপরিহার্য। একজন মানুষের ব্যক্তিগত মেধা বহুলাংশে তার নিজস্ব অর্জন হলেও তা সম্পূর্ণভাবে একান্তই ব্যক্তিগত কৃতিত্ব নয়। মানুষের জ্ঞান ও প্রতিভা সঞ্চয়ের উত্স হলো বৃহত্তর মানব সমাজ ও মানব ইতিহাস। তাই সমাজে একজন ব্যক্তির অবস্থান ও ইতিহাসের সুনির্দিষ্ট নানা উপাদান দ্বারাও সেই ব্যক্তির মেধা গড়ে ওঠে। এই মৌলিক বিষয়টিকে অগ্রাহ্য করে মেধাকে এককভাবে ব্যক্তিগত অর্জন বলে ভাবার প্রবণতাই বেশি দৃষ্টিগোচর হয়ে থাকে। মেধাবী হওয়ার জন্য একজন ব্যক্তির গর্বিত হওয়ার পেছনে যুক্তি থাকলেও তা নিয়ে চূড়ান্ত শ্রেষ্ঠত্বের বড়াই করাটা যুক্তিহীন। তাছাড়া জনপ্রশাসনের কাজের জন্য যেটাকে মেধা বলে বিবেচনা করা হয়, জীবনের অনেক ক্ষেত্রেই তা মূল্যহীন হতে পারে। অতি পরিচিত ‘... জীবনটাতো ষোল আনাই ফাঁকি’ কবিতায় সেই সত্যটিই প্রকাশিত হয়েছে। মেধাকে মর্যাদা দেয়া উচিত সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে, শুধুমাত্র মেধাবীকে পুরস্কৃত করার জন্য নয়। মেধাসম্পন্ন জনপ্রশাসনের পাশাপাশি সমাজের স্বার্থ রক্ষায় আরো অনেক কিছু করণীয় রয়েছে। সমাজের কল্যাণে অনেক কিছুর সাথে সাথে বৈষম্য দূর করে সমতার ধারা প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। এটি সমাজতন্ত্রেরতো বটেই, এমনকি গণতন্ত্রের চেতনা ও ধারারও একটি উপাদান। গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র হলো আমাদের রাষ্ট্রের চার মূলনীতির অন্যতম। তাই, জনপ্রশাসন ও সরকারি কাজে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার পাশাপাশি সমতার নীতি প্রয়োগ হওয়াও বাঞ্ছনীয়। মেধা ও সমতা—এই দু’টি উপাদানকে পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে সুসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে মূল্য দিয়ে নিয়োগ বিধি কার্যকর করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হলো, সমতা নিশ্চিত হবে কিভাবে? আমাদের সমাজের একটি মূল বৈশিষ্ট্য হলো তার অভ্যন্তরের বিভিন্ন অংশের মধ্যে অসম বিকাশের বাস্তবতা। ইতিহাসের ধারায় এসব বিভাজন তৈরি হয়েছে। যুগ-যুগের সামাজিক প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন অংশকে দুর্বল ও পিছিয়ে পড়তে বাধ্য করা হয়েছে। পশ্চাত্পদতার ফাঁদে আটকা পড়ায় ‘সমানে—সমানে’ সুযোগের প্রতিযোগিতায় ‘এগিয়ে থাকাদের’ সাথে কুলিয়ে উঠতে না পেরে তারা তুলনামূলকভাবে আরো বেশি ‘পিছিয়ে পড়া’ হয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। অবস্থাটি বোঝার সুবিধার্থে একটি সহজ হিসেবের দিকে নজর দেয়া যাক। ধরা যাক যে, ১০, ৫০ ও ১০০ এই তিন মানের ৩টি সত্তা বিরাজ করছে। প্রত্যেক সত্তাকে যদি সমান ১০ শতাংশ ‘সমান’ হারে বৃদ্ধির সুযোগ দেয়া হয়, তাহলে তাদের মান হয়ে উঠবে যথাক্রমে ১১, ৫৫, এবং ১১০। ‘সমান’ সুযোগের বদৌলতে দ্বিতীয়ের সাথে প্রথমের ব্যবধান আগের ৪০ থেকে বেড়ে এখন হয়ে দাঁড়াবে ৪৪ এবং তৃতীয়ের সাথে তা ৯০ থেকে বেড়ে এখন হয়ে উঠবে ৯৯। অর্থাত্, এরূপ তথাকথিত ‘সমান’ সুযোগ ব্যবধানের পরিমাণকে আরো বাড়িয়ে দিবে। তাই, ‘সমতা’ দাবি করে যে পিছিয়ে পড়া সত্তাকে ‘সমান’ নয় ‘সমানের চেয়ে বেশি’ সুযোগ দিতে হবে। সমাজতত্ত্বের ভাষায় এটিকে বলা হয় ইতিবাচক বৈষম্য বা positive discriminaton। অর্থাত্, বৈষম্যকে আগের পরিমাণে বহাল রাখার জন্যই প্রয়োজন ‘পরিকল্পিত বিপরীতধর্মী বৈষম্য’। বৈষম্যের পরিমাণ সমান-সমান রাখতেই যদি এই ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়, তাহলে বৈষম্য হ্রাস করার জন্য সমাজের পিছিয়ে থাকা অংশকে বাড়তি আরো কতো বেশি সুবিধা দেয়া প্রয়োজন তা সহজেই অনুমেয়। এই বিবেচনাটিই জনপ্রশাসনে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ কোটা ব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে প্রধান যুক্তি। সেজন্য সমাজের পিছিয়ে থাকা অংশগুলোকে প্রথমে সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে হবে। সেক্ষেত্রে নারী সমাজ, আদিবাসী, পিছিয়ে পড়া অঞ্চল, প্রতিবন্ধী—প্রধানতঃ এই চারটি অংশকে সহজেই বাছাই করে নেয়া যায়। দরিদ্র জনগোষ্ঠীও এই বিবেচনার আওতায় গণ্য করা যেতে পারে। এদের জন্য বিশেষ কোটা না রাখলে তাদের ‘পিছিয়ে পড়া’ অবস্থা থেকে ‘এগিয়ে থাকাদের’ সাথে ‘সমান-সমান’ প্রতিযোগিতায় নেমে তারা কখনোই রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে আনুপাতিক সংখ্যায় স্থান করে নিতে পারবে না। কোটা উঠিয়ে দেয়ার দাবিটি তাই প্রকারান্তরে বিদ্যমান অসম বিকাশ ও বৈষম্যকে চিরস্থায়ী করে রাখারই একটি প্রেসক্রিপশন হয়ে উঠতে বাধ্য। জনপ্রশাসনে নিয়োগের ক্ষেত্রে তৃতীয় যে নীতিটি প্রাসঙ্গিক তা চরিত্রের দিক থেকে নীতিগত ও আদর্শিক, এবং সেই অর্থে রাজনৈতিক (দলবাজির অর্থে নয়)। রাষ্ট্র হলো একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। তার একটি রাজনৈতিক-আদর্শিক চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য এবং একটি লক্ষ্যাভিমুখীনতা আছে। রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের দায়িত্ব হলো সেই নীতি-আদর্শ ও লক্ষ্যসমূহকে এগিয়ে নেয়ার জন্য কাজ করা। এসব নীতি আদর্শের বৈরি কোনো উপাদানকে জনপ্রশাসনে প্রবেশ করার সুযোগ দিলে তা রাষ্ট্রের জন্য বিরূপ অবস্থার জন্ম দিবে এবং নৈরাজ্যের ভিত্তি রচনা করবে। একথা সত্য যে, রাষ্ট্র তার সব নাগরিকদেরকে সমান মর্যাদায় বিবেচনা করে। তবে সেক্ষেত্রে সাধারণভাবে ধরে নেয়া হয় যে, সব নাগরিকই রাষ্ট্রের মূলনীতির অনুসারী। এমতাবস্থায় প্রশ্ন উঠতে পারে যে, যদি তাই হয়, তাহলে রাষ্ট্রের নীতি-আদর্শের অনুসারীদের নিয়ে জনপ্রশাসন গড়ে তোলা নিশ্চিত করার প্রসঙ্গটি আলাদা করে আবার আসে কেন? আমাদের দেশে এই বিয়ষটি প্রাসঙ্গিক। কারণ, আমাদেরকে পাকিস্তান নামের একটি প্রতিক্রিয়াশীল ও বৈরী আদর্শিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ করে ভিন্নরূপ প্রগতিবাদী আদর্শের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছিল। এটিই স্বাভাবিক যে, ভিন্ন চরিত্রের সেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জনপ্রশাসন হবে ভিন্ন আদর্শে উদ্বুদ্ধ ব্যক্তিদের দ্বারা পরিচালিত এবং তা হবে পাকিস্তানের জনপ্রশাসন থেকে একটি ভিন্নতর চরিত্রের জনপ্রশাসন। এই বিবেচনায় মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে নতুন দেশের জনপ্রশাসন গড়ে তোলা একটি অপরিহার্য কর্তব্য ছিল। সে কাজটি ছিল ’৭১-এর পরবর্তী কয়েক বছরের জরুরি কাজ। মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সেনাবাহিনীতে ২ বছরের জ্যৈষ্ঠতা প্রদান করা হয়েছিল। কিন্তু সব ক্ষেত্রে সেই পথে সবকিছু আর বেশি দূর অগ্রসর হয়নি। পঁচাত্তরের পর অবস্থা একেবারেই উল্টে দেয়া হয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বৃহদাংশের কোটার বদলে তাদেরকে কার্যতঃ বহুলাংশে নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে অযোগ্য করে রাখা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের ৪২ বছর পরে ’৭১-এর যোদ্ধাদের এখন আর চাকরিতে যোগ দেয়ার বয়সসীমা নেই বললেই চলে। মুক্তিযোদ্ধা কোটার বদলে এখন ‘মুক্তিযোদ্ধা সন্তানের’ জন্য ৩০ শতাংশ কোটা নির্ধারণ করে রাখা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে জনপ্রশাসন গড়ে তোলার অতি জরুরি যে কাজটি যথাসময়ে করা হয়নি, তা কি তাদের সন্তানদের জন্য কোটা সংরক্ষণ দ্বারা সম্পন্ন করা যেতে পারে? মোটেও নয়! কারণ, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ থাকবে তা কে নিশ্চিত করতে পারে? মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কোনো জেনেটিক্যালি প্রবাহিত বিষয় নয়। তাই, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জনপ্রশাসন গড়ে তোলার বিবেচনার সাথে মুক্তিযোদ্ধা সন্তানের জন্য কোটার কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। অনেকে যুক্তি দেয়ার চেষ্টা করেন যে, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানিত ও পুরস্কৃত করার জন্য মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কোটা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদেরকে কি অন্যভাবে সম্মানিত করা যায় না? মুক্তিযোদ্ধারা কি ভবিষ্যতে পুরস্কৃত হওয়ার লোভে ভাড়াটিয়া যোদ্ধার চিন্তা থেকে মুক্তিযুদ্ধ করেছিল? এ ধরনের ভাবনা বা ভাবনা প্রসূত কাজ মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগকে স্বীকৃতি প্রদান ও সম্মানিত করার বদলে তাদের অবদানকে অপমানিত করে। দরিদ্র মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তানদের জন্য সীমিত কোটা রাখার যুক্তি কিছুটা থাকলেও মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের জন্য প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কোটা রাখার যুক্তি থাকতে পারে না বলে আমি মনে করি। এই ঘটনার সুযোগ নিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি কোটা ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আন্দোলনে ঢুকে পড়েছিল। তারা স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধকে হেয় করে শ্লোগান তুলেছিল। স্বাধীনতাবিরোধীদের এসব ষড়যন্ত্র সম্পর্কে হুঁশিয়ার থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, মুক্তিযোদ্ধা সন্তানের জন্য কোটা সংরক্ষণের বিষয়ে প্রশ্ন থাকলেও জনপ্রশাসনকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ধারায় প্রতিষ্ঠা করার কর্তব্যটি মোটেও অবহেলার বিষয় নয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জনপ্রশাসন গড়ে তোলার সেই কাজটি এখনো অবহেলিত। সে কাজ করার জন্য রাষ্ট্রের নীতিকে যেভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ধারা থেকে দূরে সরিয়ে নেয়া হয়েছে, তা সংশোধন করে সমাজতন্ত্র-গণতন্ত্র-ধর্মনিরপেক্ষতা-জাতীয়তাবাদের ধারায় দেশকে ফিরিয়ে আনার কাজে প্রথমে হাত দিতে হবে। রাষ্ট্রই যেখানে আজ মুক্তিযুদ্ধের বিপরীতমুখী ধারায় পরিচালিত তার জনপ্রশাসনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য কোটা রেখেই বা কি লাভ হবে? সুতরাং, যুক্তির কথা হলো এই যে, কোটা ব্যবস্থা বিলোপ করা সঠিক হবে না। তা বহাল রাখতে হবে। তবে তা এখন যেভাবে ও যে পরিমাণে আছে, সেভাবে তা অব্যাহত না রেখে তা যুক্তিগ্রাহ্যভাবে সংস্কার করতে হবে। কোটা দ্বারা সংরক্ষিত আসনের পরিমাণও এক-তৃতীয়াংশের মধ্যে সীমিত করে আনতে হবে। লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি E-mail : [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন