মনুষ্যত্ব নিয়েই মানুষ। মানুষ্যত্ব বিহনে মানুষ অমানুষ। অর্থলোলুপ লালসার ফল মানব জাতির জন্য যে কত বড় ভয়াবহ হতে পারে তা খাদ্যে ভেজালের তথা বিষের পরিণাম দেখলেই উপলব্ধি করা যায়। অর্থের লালসা মানুষের চিরন্তন। আজ মানুষ আর সত্পথের কথা বা সততার কথা চিন্তা করে না। যে কোন উপায়ে হোক তার চাই টাকা।
ভেজাল এখন আমাদের দেশে একটি জাতীয় সমস্যায় রূপান্তরিত হয়েছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের কোন জিনিসটিতে ভেজাল নেই তা বের করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার। অসাধু ব্যবসায়ীরা জনগণকে নানাভাবে প্রবঞ্চিত করছে। সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। বর্তমানে ভেজাল একটি মারাত্মক ব্যাধি। সমগ্র জাতিকে এ ব্যাধি গ্রাস করতে বসেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে জাতির ভবিষ্যত্ অচিরেই তলিয়ে যাবে গভীর অন্ধকারে। খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল সংবাদটি আজ আর নতুন নয়। প্রায় প্রতিদিনই এ নিয়ে জাতীয় দৈনিকগুলোতে ছাপা হচ্ছে বিভিন্ন সংবাদ। দৈনিক ইত্তেফাকের সচিত্র প্রতিবেদনে আম, কাঁঠাল, আপেল, মাল্টা, খেজুর, কলা, আঙ্গুর ইত্যাদি ফলে কেমিক্যাল দেয়ার কথা শুনেও আমরা ফল খাচ্ছি। ফরমালিন মেশানো ফল খাওয়ার কারণে ধীরে ধীরে আমাদের কিডনি ও যকৃত্ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তথাপি কেন আমরা এ সমস্ত বিষ খাচ্ছি? আমরা এসব না খেয়ে থাকতে পারি না? সবকিছু জেনেশুনে বিষ খাচ্ছি।
কার্বাইড, ফরমালিন, কেমিক্যাল, কমদামী কাপড়ে ব্যবহূত রং, মবিল ইত্যাদি বিষাক্ত পদার্থগুলো শরীরে ঢুকে বিষক্রিয়া ঘটাচ্ছে। আর আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ কঠিন ও জটিল সব ব্যাধিতে। তবে এসব খাদ্যদ্রব্য না খেয়েই বা করবে কি? কারণঃ মাছ, মাংস, চিনি, লবণ, চাল, আটা, দুধ, ঘি, মিষ্টি ওষুধ ভেজাল সর্বত্রই। আর এই ভেজাল দেয়ার রয়েছে বিচিত্র সব পদ্ধতি। মাছকে তাজা দেখানোর জন্য ব্যবহূত হচ্ছে রং আর ফরমালিন। তরল দুধে মেশানো হচ্ছে ফরমালিন। গুঁড়া দুধে মেশানো হচ্ছে মেলামাইন। ওষুধে মেশানো হচ্ছে ট্যালকম পাউডার, আটা, ময়দা। তাই বলতে চাই আমরা আসলে কোথায় আছি, যাচ্ছিই বা কোথায়? আমাদের ভবিষ্যত্ কি?
আগামী প্রজন্ম কতটা শংকামুক্ত এবং নির্বিঘ্ন? সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এখানে ফরমালিনমুক্ত আম পাওয়া যায়। খাঁটি ঘি, খাঁটি মধু, খাঁটি দুধ ইত্যাদি প্রচারের অভাব নেই। আসলে এসব খাঁটি ভেজালের দৌরাত্ম্যে খাঁটি কথাটাই কথার কথায় পরিণত হয়েছে। এখন সবাই বোঝে খাঁটি মোটেই খাঁটি নয়। লোভের কারণে মানুষ নানা রকম অন্যায় ও পাপের কাজে লিপ্ত হয়। লোভী মানুষ কখনও সুখী হয় না। শান্তি পায় না। সে যত পায় আরও চায়। মহানবী (স.) বলেছেন, তোমরা লোভ থেকে সাবধান হও, লোভ তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ধ্বংস করে দিয়েছে। কথায় বলে লোভে পাপ পাপে মৃত্যু।
অপরাধ আর অপরাধীকে প্রশ্রয় দেয়া উচিত নয়। তাই এর প্রতিরোধ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতে হবে। দেশের সংবিধানে বলা হয়েছে, জনগণের পুষ্টির স্তর উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতি সাধন রাষ্ট্রের অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য বলিয়া গণ্য করিবে। এর জন্য রাষ্ট্রকে অবশ্যই সর্বাগ্রে ভেজাল ও নিম্নমানের খাদ্যদ্রব্য এবং এসবের যোগানদাতাদের বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত হতে হবে। জনগণকেও এ ব্যাপারে সচেতন করে তুলতে হবে। বাংলাদেশে পিওর ফুড অর্ডিন্যান্সে জরিমানা মাত্র ৮০০ টাকা। এই অর্থ জারিমানা করে ভেজাল খাদ্যের রমরমা ব্যবসা থামানো সম্ভব নয়। জেল-জরিমানা দিয়েও এ অসাধু মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের দমানো যাচ্ছে না। তাই ভেজাল খাদ্য রোধে পিওর ফুড অর্ডিন্যান্স আরো শক্তিশালী করা উচিত।
চলুন পণ করি, আমরা কোন ফরমালিনযুক্ত ফল খাব না। এমন একটি পদ্ধতি বের করতে হবে ক্রেতা নিজেই যেন বুঝতে পারে মাছ, মাংস, সবজি, ফল ইত্যাদিতে ফরমালিন আছে। তবে সে আর ঐসব খাদ্যদ্রব্য কিনবে না। কারণ মোবাইল কোর্ট (সিটি কর্পোরেশন, বিএসটিআই) ফরমালিনমযুক্ত খাবার শনাক্ত করার পর (কার্যকরি পদক্ষেপ নিয়ে) তারা যখন চলে যায় অসাধু ব্যবসায়ীরা পুনরায় আগের মত ফরমালিন মিশিয়ে খাবার বিক্রি করে। কোনভাবেই এটা রোধ করা যাচ্ছে না। এর জন্য কঠিন থেকে কঠিনতর ব্যবস্থা নিতে হবে। জেল-জরিমানা নয়। সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে।
সবশেষে বলবঃ ক্ষমা করা সত্ত্বেও যদি কেউ বার বার অপরাধ করতে থাকে, তাহলে তাকে কড়া শাসনে রাখতে হবে। খাদ্যদ্রব্যে ভেজালের বিষয়টি জিরো টলারেন্সে নিয়ে আসতে হবে। সেইসঙ্গে অসাধু ব্যবসায়ীদের কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। কঠিন শাস্তি দিতে হবে। তাহলে তারা এহেন পাপ কাজ করতে ভয় পাবে। আর তখনই সমাজ জীবনে ফিরে আসবে সুখ ও শান্তির বন্যা।
লেখক :এসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার, সোনালী ব্যাংক লিঃ
