শেষ পর্যন্ত আপনিও! পটুয়াখালী-৩ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনি দুইজন সংবাদকর্মীকে পিটিয়েছেন- দেশের একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সেই খবরে একজন পাঠক তার মন্তব্যে এভাবেই তার বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। খবরটি বিস্ময়কর, তাই ওই পাঠক যে কেবল একা বিস্মিত হয়েছেন তা নয়, বিস্মিত হয়েছেন অনেকেই। আমরা যারা দেশের বাইরে থাকি এবং দেশের যে কোন একটি সুখবর শোনার জন্য প্রতিনিয়ত উদগ্রীব থাকি—এ খবরটি তাদেরকে কেবল বিস্মিতই করেনি, প্রচণ্ড রকম আঘাতও দিয়েছে।
আমার সহকর্মী রাইদুল আলম, যিনি বিএনপির একজন সমর্থক এবং স্বভাবতই আওয়ামী লীগ বিদ্বেষী, তিনি খবরটি শোনার পর এক বাক্যে বলে দিলেন, ‘এটি মিথ্যা সংবাদ’। তার কথা হচ্ছে—রনি ভাই এমন করতেই পারেন না । এটা মিডিয়ার বানোয়াট নিউজ।
এটা নাকি হওয়া সম্ভব নয়। রাইদুলকে দেশের বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী পত্রিকার সংবাদ দেখালাম, তাতেও তার বিশ্বাসের খুব একটা হেরফের হয়েছে বলে মনে হয়নি। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওয়েবসাইট ফেসবুকে নিয়মিত রনি’র লেখা ও ভিডিও শেয়ার করেন। তার মত আরও অনেক রনিভক্তের কাছে খবরটি এক কথায় অবিশ্বাস্য ও হতাশাজনক। যা ফেসবুকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা গেছে ।
টেলিভিশন টক শো কিংবা কলাম লেখনিতে এমপি গোলাম মাওলা রনি গঠনমূলক সমালোচনা করেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে নিজ দল আওয়ামী লীগকেও ছাড় দেন না। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এ ধরনের ভূমিকা বিরলই বটে। যে কারণে নিজ দলের বাইরেও তার অনেক ভক্তের সৃষ্টি হয়েছে। যারা মনে করেন রনি সঠিক পথেই আছেন। দেশের মঙ্গলের জন্য তার মত রাজনীতিবিদের প্রয়োজন—এমন আশাবাদ অনেক রনিভক্তের।
এ লেখাটি যখন লিখছি, তখন হঠাত্ই বেজে উঠল পাশে থাকা মোবাইল ফোনটা। ফোনের অপর প্রান্তে আমার শ্রদ্ধেয় পরিচিতজন বাবুল চাচা। ভদ্রলোক বিলেতে আছেন চল্লিশ বছর ধরে। সারাক্ষণ শুধু দেশের ভাল-মন্দ নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করেন। তার প্রশ্ন, ‘রিয়াদ, হিপোক্রেটের বাংলা অর্থ কি?’ মাঝ রাতে তার এ প্রশ্নে কিছুটা হকচকিয়ে যাই। জানতে চাই—‘কেন, কি দরকার?’ চাচা বললেন, ‘ওই যে, তোমাদের এমপি রনি, লোকটা একটা হিপোক্রেট, টিভিতে কত সুন্দর সুন্দর কথা বলেন, আবার কিনা সাংবাদিকের গায়ে হাত তোলেন। সারাক্ষণ অন্যের সমালোচনা করে বেড়ান অথচ নিজের সমালোচনা সহ্য করতে পারেন না।’
এতক্ষণে বুঝলাম, সারাদিন বিভিন্ন কাজ শেষে টিভির সামনে বসে খবরে সংসদ সদস্য রনি’র হাতে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা দেখে তার মেজাজটা চড়ে গেছে, প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছেন তিনি।
পত্রিকার পাতায় প্রায়ই সংসদ সদস্য বা ক্ষমতাবানদের হাতে সংবাদকর্মীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের মার খাওয়ার খবর ছাপা হয়। তবে সংসদ সদস্য রনি’র এ মারের ঘটনাটি বেশি আলোড়িত হয়েছে। কারণ অতীতের নানা বিতর্কের পরে সামপ্রতিককালে তিনি তার কথা ও লেখনির মাধ্যমে একটা আলাদা ইমেজ গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু শনিবারের ঘটনায় তিনি নিজেই সেটাকে দূষিত করলেন। আর সেই সঙ্গে প্রশ্নের জন্ম দিল—রনি কি গল্পের সেই নেকড়ের মত কেবল উপরের পোশাকটা পরিবর্তন করে মেষের দলে মিশতে চেয়েছিলেন?
লেখক :লন্ডন প্রবাসী সাংবাদিক
ই-মেইল ঃ [email protected]
