কেয়ারটেকার সরকার বাংলাদেশের একসংকট সময়ের উদ্ভব। স্মরণ পড়ে ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর মাগুড়া নির্বাচনী এলাকায় একটি উপ-নির্বাচন নিয়ে মওদুদ-এরশাদীয় কায়দায় সৃষ্ট বিএনপি সরকারের ভোট কেন্দ্র দখলদারির মত একটি অপকর্মের ফসল। কেয়ারটেকার ব্যবস্থার পক্ষে আন্দোলন হয়। বিএনপি চেয়ারপারসনের ভাষায় “পাগল আর শিশু ছাড়া” কেউই নিরপেক্ষ নয়। তাই কেয়ারটেকার তিনি মানেন না। কিন্তু আন্দোলনের মুখে সংসদে কেয়ারটেকার বিল আসে। ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি ভোটার বিহীন নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর খুনীসহ অনেকজন বিচ্ছিন্ন নেতারা নির্বাচনে জয়ী হয় এবং সংসদ ও সরকার গঠন করা হয়। শেষ পর্যন্ত ঐ সংসদেই কেয়ারটেকার বিল পাস হয়। বিলে বলা হয় তিনটি সংসদ নির্বাচনের পর কেয়ারটেকার ব্যবস্থা বাতিল হয়ে পূর্বের ব্যবস্থায় ফেরত যাবে। অর্থাত্ অনির্বাচিত ব্যক্তিদের নিয়ে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা থাকবে না। কেয়ারটেকার ব্যবস্থায় প্রথম নির্বাচন ১৯৯৬ সালে, সেটাও নির্ঝঞ্ঝাটে যায়নি। তত্কালীন রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাসের সংগে তত্কালীন সেনাবাহিনীর সাথে মতবিরোধ দেশকে সংকটের দিকে ধাবিত করে তবে শেষ রক্ষা হলো বিচারপতি হাবিবুর রহমান সুষুমভাবে নির্বাচন পরিচালনা করেন এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অব্যাহত রাখেন। কিন্তু ২০০১ সালের কেয়ারটেকার সরকারের দায়িত্ব পান লতিফুর রহমান যিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেই বলেছেন তিনি দায়িত্ব নেয়ার ৩ মাস আগ থেকেই হোম এক্সারসাইজ করেছেন কেয়ারটেকার সরকারের কর্ম পদ্ধতি নিয়ে। এমনকি ঐ সরকারের সদস্যরা একে অপরের আত্মীয় ছিলেন। অর্থাত্ বিএনপি দলীয় স্বার্থ রক্ষার কাজ শুরু করেছেন, ৩ মাস আগের থেকে ঐ লতিফুর রহমান। যিনি নিজের বইতে লিখেছেন তার বিএ পরীক্ষার তৃতীয় শ্রেণীর কথা। দেখা যায় সাংবিধানিক নিয়ম মোতাবেক সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান। শুরু হয় প্রধান বিচারপতির পদ নিয়ে রাজনীতির কূটকৌশল এবং অংক কষা। বিচার বিভাগের জন্য তথা দেশের জন্য একটি অশনিসংকেত। মরার উপর খাঁড়ার ঘা আসে ২০০১-২০০৬ আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমদের আনীত বিচারপতির চাকরির অবসর বয়স দুই বছর বৃদ্ধি। কাজে লাগবে বিএনপিপন্থী বিচারপতি কেএম হাসানের কেয়ারটেকার সরকারের প্রধানকরণ প্রজেক্ট বাস্তবায়ন। অনেক সংগ্রাম আর আন্দোলনে সে প্রচেষ্টা ভেস্তে যায়। নতুন প্রজেক্ট সৃষ্টি হয় রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনকে কেয়ারটেকার সরকার প্রধান করা। তাই করা হলো, সদস্য করা হলো নিজের পছন্দ মত বেশ কিছু লালুপান্জু জোকারদের এবং দুর্নীতিবাজ নিয়ে সরকার গঠন করা নিয়ে তামাশা করা হল ১৬ কোটি বাঙ্গালির সাথে।
এখানেই শেষ নয়। ভুয়া ভোটার তালিকা ফাইন্যাল না করেই নির্বাচনী তারিখ ঘোষণা খসড়া তালিকার ভিত্তিতে যেখানে ১ থেকে সোয়া কোটি ভুয়া ভোটার যুক্ত করা হয়। নীল নক্সায় নির্বাচন সম্পন্ন করার সর্বাত্মক কৌশল প্রয়োগ করা হয়। ২২ জানুয়ারি ২০০৭ তারিখে নির্বাচনের দিন ধার্য করা হয়। আন্দোলনের মুখে সেনা হস্তক্ষেপে জরুরি অবস্থা জারির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ চলে যায় আরেক অধ্যায়ে। বিপন্ন হয় গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে সৃষ্ট চলিত চরম রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা পরবর্তীকালে কেয়ারটেকার সরকারের বিরুদ্ধে কোর্টের একটি রায়ের ভিত্তিতে ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী জাতীয় সংসদে কেয়ারটেকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। দেশের আইন ব্যবস্থার সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান সুপ্রিম কোর্ট এবং আইন প্রণয়নকারী সর্বোচ্চ ভোটে দেশের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশিলতার স্বার্থে এবং সময়ের দাবিতে এ ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। প্রশ্ন আসে কেয়ার টেকার সরকারের রাজনৈতিক অর্থনীতির ভিত্তি নিয়ে। দেখা যায় এরশাদ পরবর্তী কেয়ার টেকার সরকার গঠিত হয় ১৭ জন সদস্য নিয়ে ৯০ দিনের জন্য। সদস্যদের কোন দায়-দায়িত্ব নাই সিদ্ধান্ত নেয়ার বেলায়। অভিযোগ আসে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় কেয়ারটেকার সরকারের সদস্যরা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে এবং বিশেষ রাজনৈতিক দলকে পৃষ্ঠপোষকতা করার। দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থা একটি চলমান প্রক্রিয়া। কিন্তু এ ৯০ দিন বাংলাদেশের মত গরীব দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে সক্রিয় কোন স্বল্পমেয়াদী এবং মধ্যমেয়াদী কোন সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না। নির্বাচন পরবর্তী সরকার আসার পর কেয়ারটেকার কালীন সৃষ্ট জঞ্জাল পরিষ্কার করতে সময় লাগে কমপক্ষে আরো ৬ মাস থেকে ১২ মাস। এত দেখা যায় তত্ত্বাবধায়কের কর্মবিহীন ৩ মাস শুধু নির্বাচন চালানো ১৬ কোটি মানুষ বঞ্চিত হয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থেকে নতুন সরকারের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় এবং কাজ শুরু করতে কমপক্ষে এক বছর সময় লাগে। এ ব্যবস্থা বাংলাদেশকে পিছিয়ে দিচ্ছে। দেখা যায় ২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি সরকার চলে কমপক্ষে ২ বছর অর্থাত্ ২৪ মাস এটাও শুধু নির্বাচন প্রস্তুতি এবং পরিচালনা। একমাত্র নির্বাচন পরিচালনার জন্য সরকার ব্যবস্থা একটি বিরল দৃষ্টান্ত বাংলাদেশ এরপর নির্বাচিত সরকার বিগত ২ বছরের জঞ্জাল পরিষ্কার করতে ১ বছর চলে যাওয়া স্বাভাবিক। এতে বাংলাদেশের ১৬ কোটি জনগণ হারায় অকার্যকর ৩ বছর। দেশ হয়ে পড়ে আমলা নির্ভর। ব্যাহত হয়েছে উন্নয়ন প্রক্রিয়া। গবেষকদের উচিত টকশোতে এসে এ লোকসানের পরিমাণ মেপে জনগণের সামনে তা হাজির করা। তথাকথিত টকশোর ধান্দাবাজরা বাংলাদেশ নিয়ে আর কত ষড়যন্ত্র করতে চায়। এসব মুখোশধারীর ট্যাক্স ফাইলসহ যাবতীয় আয়ের অনুসন্ধান করা দরকার।
রাজনীতিকরা দেশ পরিচালনা করবেন এটাই গণতন্ত্রের দীক্ষা। বাংলাদেশের রাজনীতির বর্তমান একটি উল্লেখযোগ্য দিক দুই প্রধান দল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় দুই দলই এক জায়গায় অবস্থান করছে বলে দেখা যায়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থাশীল থেকে সাংবিধানিক পদ্ধতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে জনগণের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে দুই দলই যেকোন নির্বাচনের জন্য সর্বদায় প্রস্তুত থাকা উচিত। তাতেই গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র “জনগণই সকল ক্ষমতার উত্স” প্রতিফলিত হবে।
সকল কর্মকাণ্ডের মূলকেন্দ্র জাতীয় সংসদেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে রাজনৈতিক দলকেই। সেই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হবে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভিত্তিতে। একমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠতাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সিদ্ধান্তের ভিত্তি। এটাই ঐতিহাসিক বাস্তবতা। যারা সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বাইরে কিছু করতে চান তারা দেশ এবং সমাজ বিরোধী, এদের কর্মকাণ্ড অশুভ শক্তির ইঙ্গিত। যারা বিকল্প কিছু চিন্তা করেন তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ঐ ব্যবস্থায় ফিরে যেতে চাইলে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে আশা উচিত।
লেখক :এফসিএ, সহ-সভাপতি,
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি
