জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন শুরু হইয়াছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত মঙ্গলবার নিজ কার্যালয়ে তিনদিনব্যাপী এই সম্মেলনের উদ্বোধন করিয়াছেন। সকল জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে ৪০টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ সম্পর্কিত ২৪টি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হইবে। সরকারের মন্ত্রী, উপদেষ্টা, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবগণ এইসব অধিবেশনে অংশগ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করিবেন। রীতি অনুযায়ী ইতিমধ্যে মাঠ পর্যায়ের ২৪৩টি সমস্যা চিহ্নিত করিয়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হইয়াছে। আনুষ্ঠানিক আলোচনার পাশাপাশি সরকারের প্রধান নির্বাহী হিসাবে প্রধানমন্ত্রীর সাথে মুক্ত আলোচনায়ও অংশ নিবেন মাঠপ্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ এই কর্মকর্তারা। ধরিয়া লওয়া যায় যে, সম্মেলনে প্রশাসনিক বিষয়াদির পাশাপাশি জেলা প্রশাসকদের কিছু কিছু অভাব-অভিযোগ এবং প্রত্যাশিত সুযোগ-সুবিধার প্রসঙ্গও উত্থাপিত হইবে। তবে ইহা যে একটি রুটিন বৈঠক এবং প্রধানমন্ত্রী প্রতি বত্সরই ডিসিদের সাথে এই ধরনের বৈঠক করিয়া থাকেন—মন্ত্রিপরিষদ সচিব তাহা আবারও স্মরণ করাইয়া দিয়াছেন। তাহা সত্ত্বেও, এই বৈঠকটির যে আলাদা গুরুত্ব রহিয়াছে সেই কথাও অস্বীকার করা যাইবে না। কারণ, বর্তমান সরকারের চলতি মেয়াদে ডিসিদের সাথে প্রধানমন্ত্রীর ইহাই সম্ভবত শেষ বৈঠক। পাশাপাশি, নির্বাচনও সন্নিকটে। সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানে তাহাদের দায়দায়িত্ব ও ভূমিকার বিষয়টিও উপেক্ষা করিবার মতো নহে।
ঐতিহ্যগতভাবে মাঠ প্রশাসনে জেলা প্রশাসকের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণই শুধু নহে, তাহার দায়িত্বের পরিধিও অত্যন্ত ব্যাপক। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসে। মেয়াদ শেষে পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের নিকট দায়িত্ব হস্তান্তর করিয়া তাহারা বিদায় নেয়। কিন্তু তাহাতে মাঠ প্রশাসনের এই কর্মকর্তাদের দায়-দায়িত্বের খুব একটা হেরফের ঘটে না। বরং ক্ষমতার পালাবদলের এই সামগ্রিক প্রক্রিয়ায় প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা হিসাবে তাহাদের ভূমিকাই অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ হইয়া ওঠে। ফলে তাহাদের সততা, নিরপেক্ষতা, ন্যায়পরায়ণতা ও দায়িত্বশীলতার উপর আইনের শাসনের চর্চা ও অনুশীলন যে অনেকাংশে নির্ভরশীল তাহা লইয়া দ্বিমত প্রকাশের অবকাশ নাই। কার্যকরভাবে এই দায়িত্ব পালন করিতে গিয়া তাহারা প্রতিনিয়ত যেইসব সমস্যার সম্মুখীন হন, জেলা প্রশাসক সম্মেলনে বরাবরই তাহা লিখিত বা অলিখিতভাবে উত্থাপিত হইয়া আসিতেছে। এইবারও উত্থাপিত হইবে। গৃহীত হইবে বেশকিছু সিদ্ধান্ত। পাওয়া যাইবে আশাব্যঞ্জক অনেক প্রতিশ্রুতিও। তাহার কতোটুকু বাস্তবায়িত হইবে—সেই অভিজ্ঞতাও কমবেশি সকলেরই আছে। আমরা সেইদিকে যাইব না। বরং প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা হিসাবে সাংবিধানিকভাবে যেই দায়িত্ব জেলা প্রশাসকদের উপর অর্পিত হইয়াছে—সেই দায়িত্ব কতোটা স্বচ্ছতার সাথে ও স্বাধীনভাবে পালিত হইতেছে এক্ষণে সেই প্রশ্নই সর্বাপেক্ষা বড়ো হইয়া দাঁড়াইয়াছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক জেলা প্রশাসকও সেই প্রশ্ন তুলিয়াছেন। নিজেদের ক্রমবর্ধমান অসহায়তার কথা ব্যাখ্যা করিতে গিয়া একজন জানিতে চাহিয়াছেন যে, ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কে নিয়োগ দিবেন—পুলিশ সদর দপ্তর, উপজেলা চেয়ারম্যান নাকি স্থানীয় সংসদ সদস্য? তাহার মতে, ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বত্সরের পর বত্সর ওসিদের একই এলাকায় রাখিয়া দিতেছেন। কোনো অপরাধের জন্য বদলি করা হইলেও খুঁটির জোরে তাহারা আবার ফিরিয়া আসিতেছেন আগের কর্মস্থলে। ফিরিয়া আসিবার পর তাহারা আর ডিসিদের তোয়াক্কাই করিতেছেন না। হাঁড়ির ভাত সব টিপিতে হয় না। বাস্তব অবস্থা অনুধাবন করিবার জন্য এই একটি উদাহরণই যথেষ্ট। ডিসি সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণে তাহাদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলিয়াছেন যে, দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা কাহারো প্রতি কোনো ধরনের পক্ষপাতমূলক আচরণ কিছুতেই মানিয়া লওয়া হইবে না। কিন্তু অপ্রিয় সত্যটি হইল, লাগামহীন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে মাঠ পর্যায়ের প্রশাসন শুধু যে অসহায় হইয়া পড়িয়াছে তাহাই নহে, বরং দলবাজ অসাধু কর্মকর্তারা এই সুযোগ কাজে লাগাইয়া সরকারি দায়দায়িত্ব বিস্মৃত হইয়া মোসাহেবির মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ-উদ্ধারে ব্যস্ত হইয়া পড়িয়াছেন। আর ইহার কুফল ভোগ করিতে হইতেছে জনসাধারণকে। এই অবস্থার অবসানে কার্যকর রাজনৈতিক সংকল্প ও সিদ্ধান্ত ব্যতিরেকে জেলা প্রশাসকদের এই ধরনের সম্মেলন শুধু যে সময় ও অর্থের অপচয় ছাড়া কিছুই নহে—অপ্রিয় হইলেও তাহা অস্বীকার করার উপায় নাই।
