আলোকপাত

যানজট নিরসনে করণীয়

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০১৩, ২১:১৯
দেশের যানজট সমস্যা নিয়ে পত্র-পত্রিকায় বহু আলোচনা-পর্যালোচনা ও মতামত ব্যক্ত করতে দেখা যায়। সরকারিভাবে ব্যয়বহুল অনেক দীর্ঘমেয়াদি-স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার কথাও শোনা যায়। এসব পরিকল্পনার কিছু কিছু বাস্তবায়িত হতেও দেখা যায়, যদিও কোন কোন ক্ষেত্রে প্রভাবশালীদের স্বার্থরক্ষায় ও রাজনৈতিক কারণে স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়। যা হোক, সামগ্রিকভাবে যানজট সমস্যার কাঙ্ক্ষিত সমাধান হচ্ছে না। কোন কোন প্রভাবশালী মহল ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মদদে মহাসড়কে বসে কাঁচাবাজার। এটা দেশের সর্বত্র বিদ্যমান। ফলে প্রায়ই সৃষ্টি হচ্ছে অসহনীয় যানজট। মহাসড়কের কোন কোন জায়গায় কাঁচাবাজারের অবস্থানের কারণে তার দুইদিকে মহাসড়কে মাইল-কে-মাইল যানজটের সৃষ্টি হয় এবং যানবাহনের গতি ধীর হয়। কাঁচাবাজারের ফুটপাত ব্যবসায়ী ও তরিতরকারি বিক্রেতার কাছ থেকে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ পুলিশের সহায়তায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ চাঁদা আদায়ে লিপ্ত। যানজট নিয়ন্ত্রণের জন্য ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন করা হলেও অবৈধ ভটভটি, লেগুনা, মালবাহী ট্রাক ও ফিটনেসবিহীন যাত্রীবাহী বাস থামিয়ে পুলিশ কর্তৃক চাঁদা আদায়ের কারণে যানজট আরও তীব্র আকার ধারণ করে। মহাসড়কে দীর্ঘ পথযাত্রায় এমনিতেই যাত্রীরা ক্লান্তি ও অস্বস্তির কষ্টে থাকেন। দীর্ঘ যানজট তাদের কষ্টের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়। যাত্রীদের মধ্যে বৃদ্ধ, রোগাক্রান্ত এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উন্নত চিকিত্সার জন্য বড় হাসপাতালে আসার জন্য মুমূর্ষু রোগীও থাকেন। তাদের দুর্দশার কথা সহজেই অনুমেয়। মানুষ বিভিন্ন প্রয়োজনে মহাসড়কে যাত্রী হয়। চাকরি, বিশেষ করে নির্দিষ্ট তারিখে বিদেশের চাকরিতে যোগদান, ইন্টারভিউ, আরও অনেক জরুরি কাজকর্ম সমাধানার্থে মহাসড়কে যাত্রী হন। এ সমস্ত কারণে যথাসময়ে গন্তব্যে পৌঁছার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। অথচ অবৈধ আয়/চাঁদার লোভে পুলিশের সহযোগিতায় নেতাকর্মীরা মহাসড়কের ওপর কাঁচাবাজার বসিয়ে যানজট সৃষ্টির মাধ্যমে মানুষকে দুর্ভোগ কবলিত করছেন। সব মহাসড়কেই প্রায় একই অবস্থা। দেশের মহাসড়ক ছাড়া রাজধানী ঢাকার অভ্যন্তরেও যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন ব্যস্ততম সড়ক ও ফুটপাত কাঁচাবাজার এবং বিভিন্ন ধরনের পণ্য বিক্রেতাদের দখলে। তাছাড়া রাস্তার ওপর নির্মাণ সামগ্রী ও ময়লা-আবর্জনা স্তূপাকারে জমা করা হয়। বাস-ট্রাক ইত্যাদি থামানোর নির্দিষ্ট স্টপ এড়িয়ে সড়কের মাঝখানে চলন্ত বাস সোজাসুজি যত্রতত্র থামিয়ে যাত্রী উঠা-নামা করা হয়। সড়কে বাস, ট্রাক, প্রাইভেট কার, রিক্সা চলাচলের জন্য লেইন এবং পথযাত্রীদের রাস্তা পারাপারের জন্য নির্দিষ্ট পথ অর্থাত্ জেব্রা ক্রসিং নির্ধারিত নেই। এতে বিভিন্ন যানবাহন চলাচলের বিশৃঙ্খলায় সৃষ্টি হচ্ছে মানুষের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। জনসংখ্যা তথা যাত্রীর তুলনায় সড়ক ও যানবাহন কম থাকায় এমনিতে যাত্রীরা নিরুপায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পথযাত্রীরা ট্রাফিক লাইনে থেকে সময়ের অপচয়ের কারণে নিয়মিত প্রয়োজনীয় কাজকর্ম সম্পাদনে ব্যর্থতার ফলে দারুণভাবে আর্থিক ক্ষত্রিগ্রস্ত হচ্ছেন। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের এক সামপ্রতিক জরিপে প্রতীয়মান হয় যে, ট্রাফিক জ্যামে অলস সময় কাটানোর কারণে ঢাকাবাসীর বছরে প্রায় ৩.২ মিলিয়ন working hour অপচয় হয়, যা আর্থিক হিসেবে প্রায় ২০০ বিলিয়ন টাকা (পরিসংখ্যান সড়ক ও জনপথ বিভাগের রিপোর্ট অনুসারে ১৪/০৭/২০১৩ইং তারিখের দৈনিক ট্রিবিউন-এর তথ্য সূত্রে)। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বাস্তবায়ন সময়সাপেক্ষ। এসব কাজের বাস্তবায়ন চলতে থাকবে। আমার মতে ব্যয়বহুল দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার বাইরে কিছু ব্যয়হীন কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে দেশের তথা ঢাকার যানজট সমস্যা অনেকাংশে লাঘব হতে পারে। তাত্ক্ষণিকভাবে রাস্তাঘাটে কাঁচাবাজার স্থাপন নিষিদ্ধকরণ, ফুটপাত দখলমুক্তকরণ, রাস্তার ওপর নির্মাণ সামগ্রী জমা রাখা নিষিদ্ধকরণ, বাসস্টপ ছাড়া যত্রতত্র রাস্তার মাঝখানে বাস, মিনিবাস থামিয়ে যাত্রী উঠা-নামা ও রাস্তার উপর সভা-সমাবেশ বন্ধকরণ, সময়ে-অসময়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীনভাবে রাস্তাঘাট খোঁড়া অবস্থায় ফেলে অহেতুক কালহরণকরত দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ না রাখতে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বাস, ট্রাক ও প্রাইভেট কার চলাচলের নির্দিষ্ট লেইন চিহ্নিতকরণের মাধ্যমে তাত্ক্ষণিকভাবে যানজট সমস্যার অনেকাংশে আশু সমাধান সম্ভব হতে পারে। আমি মনে করি, এজন্য সরকারের দৃঢ় পদক্ষেপ এবং প্রশাসনের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম ও তত্পরতা অপরিহার্য। লেখক :ভাষাসৈনিক ই-মেইল: [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন