সঠিক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০১৩, ২১:৫৫
অবশেষে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিতর্কিত সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনিকে গ্রেফতার করা হইয়াছে। একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের সাংবাদিককে মারধর ও হত্যাচেষ্টা মামলায় গত বুধবার বিকালে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ তাহাকে গ্রেফতার করে। ইহার আগে ঢাকা মহানগর হাকিম এই মামলায় ইতঃপূর্বে প্রদত্ত জামিন বাতিল করিয়া তাহাকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেন। মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যে নির্দেশটি পালিত হইয়াছে—যাহা ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালীদের ক্ষেত্রে একটি বিরল দৃষ্টান্তই বলা চলে। লক্ষণীয় যে, আমাদের দেশে হরহামেশাই সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটিতেছে। হত্যার ঘটনাও কম নহে। দায়ী ব্যক্তিদের পার পাইয়া যাওয়ার উদাহরণও ভূরি ভূরি। সঙ্গত কারণেই সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় একজন সংসদ সদস্যকে গ্রেফতারের যৌক্তিকতা লইয়া প্রশ্ন উঠিতে পারে। ইহার উত্তরে এইটুকু বলাই যথেষ্ট যে, এই ক্ষেত্রে সাংবাদিক নির্যাতনের বিষয়টি মুখ্য নহে, মুখ্য হইল অভিযুক্ত আইন প্রণেতা আইন নিজের হাতে তুলিয়া লইয়াছেন। দায়িত্ব পালন করিতে গিয়া সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকেরা বাড়াবাড়ি করিয়া থাকিলে তিনি আইনের আশ্রয় গ্রহণ করিতে পারিতেন। তাহা না করিয়া তিনি নিজেও সাংবাদিকদের উপর চড়াও হইয়াছেন। আর আইন নিজের হাতে তুলিয়া লইবার এই প্রবণতা যে আকস্মিক নহে, বরং নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে মনে করিবার মানসিকতাপ্রসূত তাহাও দিবালোকের মতো স্পষ্ট। সকল বিচারেই ইহা যে সঠিক ও সময়োপযোগী একটি পদক্ষেপ তাহাতে সন্দেহের অবকাশ নাই বলিলেই চলে। আমরা সরকারের এই পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানাই। ইহা সুবিদিত যে, শিল্পোন্নত দেশগুলিতে সরকার ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারী ব্যক্তি এবং আইন প্রণেতাদের নীতি-নৈতিকতার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হইয়া থাকে। তাহাদের আচার-আচরণে পান হইতে চুন খসিবারও উপায় নাই। নিয়ম-নীতি ও আইনের সামান্যতম বিচ্যুতিকেও জনগণ ক্ষমার অযোগ্য বলিয়া বিবেচনা করিয়া থাকেন। কিন্তু আমাদের চিত্রটি ইহার সম্পূর্ণ বিপরীত। ক্ষমতাসীনদের জন্য সাত খুন মাফ বলিয়া একটি কথা প্রচলিত আছে আমাদের দেশে। কথাটি অমূলক নহে। ক্ষমতায় গেলে অনেকের হুঁশ থাকে না। তাহারা হিতাহিত জ্ঞান হারাইয়া ফেলেন। আইনের ঊর্ধ্বে ভাবিতে শুরু করেন নিজেদেরকে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীনদের ক্ষেত্রে আইনও নিজস্ব গতিতে চলে না। আইন যাহাদের প্রয়োগ করিবার কথা তাহারাও নিজেদের অবশ্যপালনীয় কর্তব্য বিস্মৃত হইয়া তাকাইয়া থাকেন উপরের দিকে। চলেন অদৃশ্য অঙ্গুলি হেলনে। অবশ্য এইসব কোনো নূতন কথা নহে। দিনের পর দিন এমনটিই হইয়া আসিতেছে। সরকার বদল হইলেও অবস্থা বদলাইতেছে না। বর্তমান মহাজোট সরকারের গত সাড়ে চার বত্সরের চিত্রও ভিন্ন নহে। বরং প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে আইন প্রণেতা হইতে শুরু করিয়া ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের বাড়াবাড়ি ইতিমধ্যে এমন পর্যায়ে পৌঁছিয়াছে যে, সাধারণ মানুষ দিশেহারা হইয়া পড়িয়াছেন। চরমে পৌঁছিয়াছে তাহাদের হতাশা ও ক্ষোভ। আর দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইহার দায় বহন করিতে হইতেছে সরকার ও সরকারপ্রধানকে। পরিণামে অনেক ইতিবাচক অবদান সত্ত্বেও সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা যে তলানিতে আসিয়া ঠেকিয়াছে সমপ্রতি অনুষ্ঠিত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে তাহা স্পষ্ট হইয়া গিয়াছে। উপর্যুক্ত বাস্তবতার নিরিখে সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনির বিরুদ্ধে গৃহীত পদক্ষেপটি সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারে কিছুটা হইলেও সহায়ক হইবে বলিয়া আমাদের বিশ্বাস। পাশাপাশি, ক্ষমতার দম্ভে যাহারা নিজেদেরকে আইনের ঊর্ধ্বে ভাবিতে শুরু করিয়াছেন তাহাদের জন্যও ইহা নিঃসন্দেহে বিশেষ বার্তাবহ। তবে সবকিছুই নির্ভর করিতেছে সরকারের সংকল্প ও সদিচ্ছার উপর। সরকার যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় অবিচল ও আপসহীন—তাহা প্রমাণ করিতে হইলে তাহাদেরকে যে আরো দীর্ঘ ও কঠিন পথ পাড়ি দিতে হইবে তাহাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন