মানবিক বিলবোর্ডের নূতন মাত্রা

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০১৩, ২১:৫৬
ইত্তেফাকের একটি খবরে প্রকাশ, জাপানের পিআর নামের একটি কোম্পানি উরুতে বিজ্ঞাপন প্রচারের নিমিত্ত নারীদের ভাড়া করিতেছে। এই কোম্পানির কনসালট্যান্ট হিদেনোরি অ্যাসুমির মতে, রাস্তায় লোকেরা সাধারণত মেয়েদের উরুর দিকে তাকায়। সুতরাং এরূপ বিজ্ঞাপন দেওয়ার নীতি কোম্পানির পণ্য প্রসারে অধিক সহায়ক হইবে। তবে এজন্য রহিয়াছে কতিপয় শর্ত। যেমন—যে সব নারী বিজ্ঞাপনের জন্য তাহাদের উরু ভাড়া দেবেন তাহাদের বয়স হইতে হইবে ১৮ বত্সর। তাহাদেরকে জাপানের রাজধানী টোকিওর রাস্তায় দৈনিক কমপক্ষে আট ঘন্টা চলাফিরা করিতে হইবে। তাহাদের শর্ট স্কার্ট ও বড় ধরনের মোজা পরিধান করিতে হইবে। একই সঙ্গে এসব নারীকে ফেসবুক, টুইটার ইত্যাদি সামাজিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযুক্ত থাকিতে হইবে। এই পর্যন্ত খবর পড়িয়া যে কেহ প্রশ্ন করিতে পারেন এ আবার নূতন কোন কলিযুগ আসিল? নারী অধিকার রক্ষার এই যুগে ইহাও কি সম্ভব? অবশ্য নারীবাদে আস্থা নাই এমন লোকেরা বলিতে পারেন নারী স্বাধীনতার যুগে সবকিছুই সম্ভব। তাহারা বরং পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়িতে পারেন, সমঅধিকারের কথা যখন বলা হইতেছে, তখন তাহা পুরুষের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হইবে না কেন? এই বৈষম্যের কোন জওয়াব নাই আমাদের নিকট। এইভাবে পৃথিবীতে মানবিক বিলবোর্ড নিয়া বিতর্ক থাকিলেও ইহার ব্যবহার একেবারে নূতন নহে। পত্র-পত্রিকা, টেলিভিশন, রাস্তাঘাট এবং দেওয়ালে দেওয়ালে বিজ্ঞাপন দেওয়ার রীতি বহুদিনের। এইসব বিজ্ঞাপনে নারীর উপস্থিতিই বেশি, যদিও তাহার পাশাপাশি পুরুষের উপস্থিতিও নজরে পড়ে। কিন্তু রাস্তাঘাটে বা লোকারণ্যে প্ল্যাকার্ড বা পোস্টার বহন করিয়া অথবা বিশেষভাবে বিজ্ঞাপিত পোশাক পরিধান করিয়া যখন কেহ কোন পণ্যের প্রচারাভিযানে অংশগ্রহণ করে, তখন তাহা জীবন্ত মানবিক বিলবোর্ডে পরিণত হয়। শরীরের বিশেষ কোন স্থানে উলকি আঁঁকিয়া তাহা জনসম্মুখে প্রদর্শনের মাধ্যমেও বিজ্ঞাপন প্রচারের কাজ চলে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞাপিত পোস্টারের ওপর ট্যাক্স ধার্য হইলে এবং দেওয়ালে দেওয়ালে বিজ্ঞাপন দেওয়ার রীতি ভয়ঙ্করভাবে বাড়িয়া গেলে লন্ডনে সর্বপ্রথম হিউম্যান বিলবোর্ডের প্রচলন শুরু হয়। আধুনিক যুগে টি-শার্ট বিজ্ঞাপন নীতি বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করিয়াছে। ইহার সূচনা হয় ১৯৩০ সালের দিকে। তবে ২০০৩ সালে রাগবি ওয়ার্ল্ড কাপ চলাকালে টেলস্ট্র্যা মেয়েরা টেলেপ্যাকস ব্যবহার করে। অর্থাত্ টি-শার্টে ছোট্ট একটি টেলিভিশন ও ডিভিডি প্লেয়ার বসাইয়া বিজ্ঞাপনের চলন্ত ছবি প্রদর্শন করে। আধুনিক কালে জনপ্রিয় খেলোয়াড়দের বাহু বা বুকে বিশেষ ব্যাজ পরাইয়া বিজ্ঞাপন দেওয়ার চল রহিয়াছে। শুধু তাহাই নহে, রাজনৈতিক বা সামাজিক আন্দোলনের ক্ষেত্রেও পোস্টার বা প্ল্যাকার্ড গায়ে জড়াইয়া দাবি-দাওয়া সম্পর্কে মিডিয়া ও জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা চলিয়া আসিতেছে। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় নূর হোসেন খালি গায়ে তাহার বুক ও পিঠে লিখিয়াছিলেন, ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’। শেষপর্যন্ত তিনি শহীদ হইয়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মূর্তপ্রতীকে পরিণত হন। মানবিক বিলবোর্ডের উপরোক্ত দৃষ্টান্তগুলি অভিনব ও কার্যকরি। সাধারণত এজন্য মানব দেহের বুক, পিঠ এবং কখনও কখনও মাথার পিছনের অংশ ব্যবহার করা হইয়া থাকে। তবে এজন্য নারীর উরুর ব্যবহার মানবিক বিলবোর্ডের একটি নূতন ডাইমেনশন বা মাত্রা। ধর্মতাত্ত্বিকরা ইহাতে ঘোর আপত্তি জানাইবেন ইহাই স্বাভাবিক। কেহ কেহ মানবিক মর্যাদার বিষয়েও প্রশ্ন তুলিতে পারেন। তবে ইহা আপেক্ষিক। জাপান বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। তাই উন্নত দেশে যাহা সভ্যতা তাহা অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশে অসভ্যতা হিসাবে পরিগণিত হইলেও তাহাতে কিছু যায় আসে না।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন