[ আ ন্ত র্জা তি ক ]

কোন পথে মিসরের রাজনীতি

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০১৩, ২১:৫৬
২০১১ সালে শুরু হওয়া আরব বসন্ত পরবর্তী মিসরের রাজনীতিতে চেহারার পরিবর্তন ছাড়া প্রকৃত পরিবর্তন আনতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসির ক্ষমতাচ্যুতির পরে, মিসর আবারো অস্থিতিশীল অবস্থায় পরিণত হয়েছে। মুরসির সপক্ষে ও বিপক্ষে হাজারো সমর্থক রাস্তায় অবস্থান করছে। তারা পরস্পর এবং সেনাবাহিনীর সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ায় সহিংস ঘটনার সূত্রপাত ঘটছে। মুরসির সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুড দেশকে সিরিয়ার মতো সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়ার জন্য সেনাবাহিনী ও সেনাপ্রধানকে অভিযুক্ত করেছে। রিপাবলিক গার্ড কম্পাউন্ডের সামনে সেনাবাহিনী কর্তৃক মুরসির সমর্থক ৫১ জনকে হত্যা ও ৪৩০ জন আহত হওয়ার পর ব্রাদারহুড এই অভিযোগ তুলল। অপরদিকে সেনাবাহিনী আন্দোলনরত মুরসির সমর্থকদের ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়েছে। বিদ্যমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে তাকালে যে কারো প্রশ্ন জাগবে, কোন দিকে যাচ্ছে মিসর? জনগণের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে ইসলামী চেহারার মধ্য দিয়ে থামানো হয়েছে। ফলে মিসরের রাজনীতিতে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার প্রভাব আগের মতো বজায় রয়েছে এবং আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামো ও নীতিকে প্রভাবিত করছে। ব্রাদারহুডকে ক্ষমতায় আরোহণের রাজনৈতিক ফাঁদে আটকানো হয়েছে যদিও প্রকৃত ক্ষমতা তাদের হাতে ছিল না। ফলশ্রুতিতে মুরসির ক্ষমতাচ্যুতি সেনাবাহিনীর মর্জির উপর নির্ভর করে। মিসরের চলমান রাজনৈতিক সংকট উত্তরণে ব্রাদারহুডের উচিত হবে না সেনাবাহিনীর সাথে রাজনৈতিক সমঝোতা করা। যে কোনো ধরনের সমঝোতা মিসরের রাজনীতিতে মুসলিম বাদারহুডের অবস্থানকে দুর্বল করবে। ব্রাদারহুডের উচিত হবে তথাকথিত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সম্পর্কচ্ছেদ করে জনগণকে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে আহবান করা, যা তাকে প্রকৃত ক্ষমতা প্রদান করবে এবং মিসরের অধিকাংশ জনগণকে তার পেছনে পাবে। গত শতকের শেষের দিকের কথা। মুসলিম ব্রাদারহুডের একজন বলিষ্ঠ নেতার কাছে জনৈক আমেরিকান কূটনীতিবিদের ফোন আসে। মিসরের সেই নেতা ফোন কল পেয়ে খানিকটা অবাক হলেও একটা সাক্ষাতের বন্দোবস্ত করেন। লোকে বলে, সেই সাক্ষাতে নাকি সাধারণ নিয়ম রক্ষার কথাবার্তাই হয়েছিল। তবে কথাবার্তার একটা পথ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি সেই আলাপ-আলোচনার পথটাও বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে আমেরিকাকে ‘সাম্রাজ্যবাদী’ বলে মানতে থাকে মিসর, আর মিসরকে ‘মৌলবাদী’ দেশ বলেই মানতে থাকে আমেরিকা। মিসরের ব্রাদারহুড তাদের সংসদের এক-পঞ্চমাংশ আসনে জিতে যায়। আমেরিকার গোয়েন্দা বিভাগ প্রথমে তো বিশ্বাসই করতে পারেনি। সাইরো এবং ওয়াশিংটনে একসাথে কাজকর্ম শুরু হয়। সবাই ঠিক করে যে, এই আন্দোলনকে কঠোর হাতে ধবংস করতেই হবে। কিন্তু এর পাশাপাশি আমেরিকানরা ব্রাদারহুডের সঙ্গে আলোচনার পথটা আবার খোলার কথা বিবেচনা করে দেখে। ব্রাদারহুডের অস্তিত্বের গুরুত্বটা তারা বুঝতে শুরু করে। ব্রাদারহুডের সঙ্গে যোগাযোগ সংস্থাপনকারী আমেরিকান কর্মকর্তাদের সংখ্যাটা হয়ত খুব একটা বেশি ছিল না, কিন্তু পদগত দিক থেকে তারা যথেষ্ট প্রভাবশালী ছিলেন। ঠিক সেই কারণেই মুসলিম ব্রাদারহুড প্রসঙ্গে ওয়াশিংটন ভিন্ন ভিন্ন অভিমত প্রকাশ করতে থাকে। এখন যখন মিসরের প্রশাসনিক পরিকাঠামোতে বড়সড় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, এমতাবস্থায় আমেরিকা আবার ব্রাদারহুডকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার কথা বিবেচনা করছে। মিসরের সাম্প্রতিক অচলাবস্থা থেকে ব্রাদারহুড আপাত দৃষ্টিতে নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছে ঠিকই, তবে আমেরিকা বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছে যে, আগামী দিনে মিসরের সংসদে ব্রাদারহুড একটা বড়সড় শক্তি হিসাবে উঠে আসবে। আগামী দিনে নির্বাচনের আয়োজন করা হলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাক, ব্রাদারহুড কিন্তু নিঃসন্দেহে যথেষ্ট বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করবে। নিজের সময়ে রাজনৈতিক ইসলামের উপর অনেক কাজকর্ম করেছিলেন প্রাক্তন সিআইএ কর্মী এমিলি নাখলে। তার মতে, আমেরিকার এখন অবশ্যই মিসরের বিভিন্ন ইসলামিক রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে আলাপ-আলোচনার পথ সৃষ্টি করা উচিত। দসাই-এর সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ওদের কিছুতেই দূরে সরিয়ে রাখা যাবে না। আমি মিসরের অবস্থা যতটুকু বুঝি, তাতে বলব - ওইসব গোষ্ঠী হয়ত আগামী নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না, কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাবের দিক থেকে ওরা অনেক বেশি গুরুত্ব পেতে শুরু করবে।” কিন্তু এখনই এটা বলা ঠিক হবে না যে, আমেরিকা মিসরের বাস্তব সত্যটা বুঝতে পেরেছে এবং বিবেচকের মতো পদক্ষেপ নিতে চাইছে। কারণ, নাখলের মতো ব্যক্তিরা আজও সংখ্যালঘু। আর মিসর প্রসঙ্গে আমেরিকার দুই রাজনৈতিক দল যে ধরনের মন্তব্য করছে, তাতে আশাবাদী হওয়ার কোনও অবকাশ নেই| আমেরিকার ডানপন্থি রাজনৈতিক গোষ্ঠী তো মিসরের ব্রাদারহুডকে আল-কায়দার সমতুল্য হিসাবে মন্তব্য প্রকাশ করছে| আর ফক্স টিভি তাদের সেই মতামতকে বেশ ফলাও করে প্রকাশ করে চলেছে| হাউস ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির প্রধান রিপাবলিকান ইলিয়ানা রসলেটিনেন বলছেন যে, একমাত্র ইসরাইলপন্থি দলগুলোই মিসরে সত্যিকারের গণতন্ত্র আনতে পারবে| ওদিকে ডেমোক্র্যাটদের তরফ থেকে শেলি বার্কলে এবং অ্যান্থনি ওয়েনার তো মিসরে ‘আরব গণতন্ত্র’ স্থাপন করার কথা বলছেন| ওয়েনারের মতে, “ইসরাইল নিশ্চয়ই এতদিনে টের পেয়ে গেছে যে, আরবে গণতন্ত্র স্থাপিত হলে তাদেরই বিপদ বেশি|” ওদিকে বার্কলের মতে, “বাস্তব হল - আমরা যেভাবে গণতন্ত্রকে চিনি এবং মধ্যপ্রাচ্যে যে ধরনের গণতন্ত্র সম্ভব, তাদের মধ্যে কোনও মিল নেই|” এই ধরনের নেতারাই কিন্তু আমেরিকার বৈদেশিক নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে থাকেন| তাই মিসর প্রসঙ্গে আমেরিকার বৈদেশিক নীতি আদৌ কার্যকর হবে কিনা, সেটা নিয়েই সন্দেহ দেখা দিচ্ছে| তবে বিস্ময়কর ব্যাপার হল, আমেরিকার অধিকাংশ সন্ত্রাসবাদ বিশেষজ্ঞ কিন্তু অন্য ধরনের মত পোষণ করছেন| তাদের মতে, আল-কায়দার মতো সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলো মিসরের ব্রাদারহুডকে মোটেও ভাল চোখে দেখে না| তাদের গণতন্ত্রবাদী রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্যই আল-কায়দার মতো গোঁড়া গোষ্ঠীগুলো ব্রাদারহুডকে ধবংস করতে চাইছে| দসাই-এর সাথে কথা প্রসঙ্গে ওয়াশিংটনের আরব-আমেরিকান ইনস্টিটিউটের প্রধান জেমস জোকবি বলেন, “আমাদের রাজনৈতিক নেতারা শুধু লম্বা লম্বা ভাষণ দিতে পছন্দ করেন| কিন্তু শুধুমাত্র ভাষণ দিয়ে কোনও কাজ হয় না| সবার প্রথমে তো তাদের আরব দুনিয়ার বাস্তব সত্যগুলো ভালোভাবে বোঝা উচিত| সেই বাস্তব সত্য আরব প্রসঙ্গে আমেরিকার বৈদেশিক নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা উচিত| সেই পরিবর্তন না আনলে, আমেরিকার বৈদেশিক নীতি আদৌ কোনও কাজে লাগবে না| শুধুমাত্র বৈদেশিক সাহায্য বন্ধ করার হুমকি দিয়ে কোনও লাভ নেই| বরং একটা উপযুক্ত বৈদেশিক নীতি তৈরি করে মিসরের সামনে তা পেশ করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে| ব্রাদারহুড প্রসঙ্গে যারা সন্দেহ প্রকাশ করছেন, তাদের একবার ভেবে দেখা উচিত যে, বর্তমানে ব্রাদারহুড আইনি স্বীকৃতি লাভ করেছে এবং শক্তিশালী রাজনৈতিক দল হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে| আনোয়ার সাদাতের মৃত্যুর পর রাজনৈতিক পরিমণ্ডল থেকে কেমন যেন হারিয়ে গিয়েছিল ব্রাদারহুড| সরকারি দিক থেকে এই দলকে প্রথমে বেআইনি বলা হলেও জনপ্রিয়তার দিক থেকে তারা অন্য অনেক দলের থেকে এগিয়ে ছিল| ক্রমশ প্রভাব বাড়ার ফলে ব্রাদারহুডকে উপ-রাষ্ট্রপতি ওমর সুলেমানের আলোচনা সভায় প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ দিয়েছিলেন উপরাষ্ট্রপতি স্বয়ং| বলে রাখা ভাল, এই উপ-রাষ্ট্রপতিই কিন্তু বেশ কয়েক দশক ধরে ব্রাদারহুডকে ধ্বংস করার চেষ্টা করেছিলেন| পরে উনি নিজেই এই দলকে আইনি স্বীকৃতি দেন| রাজনৈতিক ইসলাম প্রসঙ্গে যথেষ্ট জনপ্রিয় বিশেষজ্ঞ তারিক রমদান (মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রবক্তা হাসান আল-বানার পৌত্র) ব্রাদারহুডের সন্ত্রাসবাদের সাথে যোগ থাকার সমস্ত ধরনের অভিযোগ নস্যাত্ করে দিয়েছেন| অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ডিগ্রিধারী রমদান আন্তর্জাতিক স্তরের রাজনৈতিক নেতাদের কাছে আবেদন জানিয়েছেন যে, তারা যেন সমস্ত রাজনৈতিক ইসলামিক দলগুলোকে এভাবে দানবের রূপ দেওয়া বন্ধ করেন| ওদিকে অনেক বিশেষজ্ঞই মুসলিম ব্রাদারহুডকে শক্তিহীন ভাবায় ভুল করছেন| ব্রাদারহুডের মধ্যে বিশেষ বিশেষ জায়গায় উদারপন্থি সদস্যদের প্রভাব যথেষ্ট বেশি| আর গ্রামীণ মিসরে কট্টরপন্থি মৌলবাদীদের প্রভাব অনেক বেশি| ক্রমশ শহরের যুবসমপ্রদায়ের মধ্যেই ব্রাদারহুডের জনপ্রিয়তা বাড়ছে| বর্তমানে ব্রাদারহুডের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এমন একজন ব্যক্তি যিনি পেশাগত দিক থেকে চিকিত্সক| এখন পর্যন্ত ব্রাদারহুডের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব মহলে কোনও মৌলবাদী নেতার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি| শুধু তাই নয়, ব্রাদারহুডের ইতিহাস বলছে, যখনই কোনও সদস্য কোনও প্রসঙ্গে ক্রোধ প্রকাশ করেছে বা বিরূপ ব্যবহার করেছে, তাকে প্রথমে শান্ত হওয়ার আদেশ দেওয়া হয়েছে এবং সেই আদেশ পালিত না হলে, তাকে দল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে| জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ এবং ইনস্টিটিউট অফ মিডল ইস্ট স্টাডিজের প্রধান ন্যাথান ব্রাউন দসাই-এর সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে বলেন, “ব্রাদারহুডের অধিকাংশ প্রস্তাবিত যোজনাই যথেষ্ট গণতান্ত্রিক এবং সাম্যমূলক| প্রশাসনিক দুর্নীতিকে দূর করার জন্য তারা ইতোমধ্যেই বিচার বিভাগকে অন্যান্য প্রশাসনিক বিভাগের থেকে আলাদা করার প্রস্তাব দিয়েছে| গত দশকে তারা অনেকগুলো সংস্কারমূলক পদক্ষেপও গ্রহণ করেছিল| শুধু কথাই নয়, কাজের দিক থেকেও তারা যথেষ্ট তত্পর| তারা মোটেও মিসরের প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ মৌলবাদী ইসলামিক প্রশাসন বানাতে চায় না|” গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, এর আগে কিন্তু কোনও বৈদেশিক নীতির বিষয়ে মার্কিন রাজনীতিবিদ এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গি এভাবে বিভাজিত হতে দেখা যায়নি| এই বিভাজন একটা গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বৈকি| তবে সেই ইঙ্গিতটা আমেরিকার প্রশাসন কীভাবে গ্রহণ করবে, সেটা একমাত্র আমেরিকার প্রশাসনই বলতে পারে| বাকি বিশ্ব সেটা দেখার অপেক্ষাতেই আছে| মূলত তিনটি কারণের ভিত্তিতে সেকুলার দলগুলো জনগণকে রাস্তায় নামাতে সক্ষম হয়েছে। কারণগুলো হল শোচনীয় অর্থনৈতিক অবস্থা, দেশ পরিচালনায় ব্রাদারহুডের অযোগ্যতা ও আরব বসন্ত পরবর্তী জনগণের বৈপ্লবিক আকাঙ্ক্ষা বিরাজ করা। ১৯৫২ সালের সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন জামাল আবদেল নাসের পরবর্তী মিসরের রাজনীতিতে সেনাবাহিনী একমাত্র ক্ষমতাধর প্রতিষ্ঠান। যা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠে যখন মিসরের আগের সব প্রেসিডেন্টের সবাই সেনাবাহিনীর সাবেক নেতা। মুসলিম ব্রাদারহুডের উত্থান ছিল মূলত তুরস্কের উসমানীয় খেলাফত ধ্বংসের প্রতিক্রিয়া স্বরূপ। দীর্ঘ ৮৫ বছরের সংগ্রাম, উম্মার ইসলামী আবেগ ও ২০১১ সালে শুরু হওয়া আরব বসন্ত পরবর্তী আমেরিকার মদদপুষ্ট সেনাবাহিনী ব্রাদারহুডের ক্ষমতা আরোহণে সমর্থন দিতে বাধ্য হয়। মিসরের রাজনীতিতে সেকুল্যার দলগুলোর ভঙ্গুর অবস্থানের কারণে বরাবরই মুসলিম ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামের রাজনৈতিক উত্থান তথা প্রভাব বাড়ুক তা মোটেও চায় না। তাই তারা বিদ্যমান গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো লিবারাল ইসলামী দলগুলোকে স্বাগত জানাতে আগ্রহী। লিবারাল ইসলামী দলগুলোর রাষ্ট্র নেতৃত্বে আসীন হওয়ায় আমেরিকা মোটেও চিন্তিত নয়, কেননা রাষ্ট্রের প্রকৃত ক্ষমতা সেকুল্যার কর্তৃপক্ষের হাতেই থাকে। মিসরের ক্ষেত্রে স্পষ্টত তা সেনাবাহিনী ধারণ করে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ পরবর্তী সামরিক জান্তার কোনো ধরনের সমালোচনা না করাই প্রমাণ করে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জনগণের একাংশের দাবির মুখে সেনাবাহিনীর সামরিক পদক্ষেপে সন্তুষ্ট। মুরসি বিরোধী জনগণের জাগরণকে আমেরিকা মিসরের রাজনীতিতে শুধুমাত্র ব্রাদারহুডকে নয় বরং ইসলামের রাজনৈতিক উত্থানকে ঠেকানোর সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে। যদিও এই ধরনের পরিবর্তনে ইসলামপন্থিদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিবে যা মিসরকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে সে ব্যাপারে আমেরিকা ভালোভাবে অবগত আছে। তাহলে কেন যুক্তরাষ্ট্র ও মিসরের সামরিক জান্তা মুরসিকে পরিবর্তনের ঝুঁকি নিল? সেনাবাহিনীর ক্যু’-এর পেছনে প্রথম সম্ভাব্য কারণ হতে পারে, রাজনীতিতে তথা সরকার ও প্রাদেশিক প্রশাসনের উপর ব্রাদারহুডের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে ঠেকানো। আমেরিকার রাজনৈতিক কৌশলের সাথে একমত অনেকে মনে করেন, ইসলামিস্টদের মধ্যে যারা প্রকৃত পরিবর্তনের কথা বলে তাদেরকে ঠেকাতে হলে, লিবারাল ইসলামিস্টদের সাথে আরো বেশি সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, কিন্তু অনেকে আবার লিবারাল ইসলামিস্টদের অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে দেখে, এই মতের অনুসারীরাও শক্তিশালী। তারা মনে করেন এই ধরনের আন্দোলন প্রায়োগিক (Pragmatic) হলেও তাদের মূল উদ্দেশ্য ক্ষমতা দখল করা এবং গণতন্ত্রকে অপসারণ করা। সেনাবাহিনী মূলত দ্বিতীয় মতের অনুসারী, যারা মিসরের তথাকথিত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ইসলামিস্ট প্রভাব দেখতে আগ্রহী নয়। ফলে মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। তাই মিসরের চলমান রাজনৈতিক সংকট সেনা ক্যুর অনিবার্য ফল, যা সেনাবাহিনীকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। দ্বিতীয় সম্ভাব্য কারণ হতে পারে, আমেরিকা মিসরকে সশস্ত্র সংগঠন ও সেনাবাহিনীর মধ্যকার সংঘাতের মধ্যদিয়ে দীর্ঘমেয়াদী একটি সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত করতে চায়। মুরসি পরবর্তী মিসরের সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি বিশেষ করে সেনাবাহিনীর বেপরোয়া গুলিবর্ষণ থেকে তা সহজে অনুধাবন করা যায়। পশ্চিমারা ভালভাবে বুঝতে পেরেছে রাজনৈতিক ইসলাম জনগণ কর্তৃক জোরালো সমর্থন পাচ্ছে, যা আমরা নব্বইয়ে আলজেরিয়া, ইরাক; ২০০০ সালে পাকিস্তান, সুদান এবং বাংলাদেশ, সিরিয়ায় দেখতে পাচ্ছি। সিনাই উপত্যকার সশস্ত্র সংগঠনগুলো সেনাবাহিনীর উপর আক্রমণ চালানোর খবর আসছে। মিসরের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে চলমান আন্দোলন যে কোন মুহূর্তে সংঘাতের দিকে চলে যেতে পারে যা ব্রাদারহুডের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নাও হতে পারে। লেখক :সহযোগী অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন