আলোকপাত

নারী অধিকার সুরক্ষায়

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০১৩, ২১:৫৭
বিশ্বজুড়ে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, শ্রেণি, ধনী-গরিব নির্বিশেষে সব সমাজেই নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েই চলেছে। যদিও সকল প্রকার সহিংসতা এবং নৃশংসতা প্রতিরোধে রাষ্ট্র তথা সরকার বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন, কিন্তু আইন প্রণয়নে শেষ কথা নয় । আইনের প্রয়োগ এবং বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। আমাদের সংবিধানে নারীর জন্য যেসব সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে, সেসব আমাদের নারী সমাজের একটা বড় অংশই কিন্তু জানে না। নারী শিক্ষার অধিকার, জাতীয় জীবনে সর্বস্তরে নারীর অংশগ্রহণের অধিকার, রাষ্ট্র ও গণজীবনের সকল কর্মকাণ্ডে নারী-পুরুষের সমান অধিকার এসব সংবিধানের বিভিন্ন ধারায় বর্ণিত হয়েছে। এছাড়া বর্তমানে নারী পেয়েছে কথা বলার স্বাধীনতা, মতামত প্রকাশের অধিকার, সমাজ-সংসার-অর্থনীতি-রাজনীতি-শিক্ষায়-দীক্ষায়-গবেষণায় সর্বত্র নারীর সদর্প বিচরণ দেখে আমরা আশ্বস্ত হই, ‘জাগো গো ভগিনী’ বলে যিনি আমাদের অন্তঃপুর থেকে বহিরাঙ্গনে এনেছেন, তার কাছে আমরা চিরকৃতজ্ঞ । আমাদের দেশেই প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেতা, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সবাই নারী। এ একরকম নারীর শৃঙ্খল মোচনের দৃষ্টান্ত বটে। এত কিছুর পরও নির্মম সত্য হলো, প্রতি পদক্ষেপে নারী হচ্ছে হেয়। কি পরিবারে, কি কর্মক্ষেত্রে, কি শিক্ষাঙ্গনে—সর্বত্রই নারী এখনও বৈষ্যমের শিকার। আমাদের দুর্ভাগ্য, বর্তমান বিজ্ঞানের যুগেও কন্যা শিশু জন্মের জন্য জন্মদাত্রীকে ঘর ছাড়তে হয়, নয় তো শিশুসহ প্রাণ দিতে হয়। আবার এমনও পরিবার আছে সেখানে কন্যা শিশু জ্ঞান হবার পর থেকেই জেনে আসছে তার পিতা-মাতার কাছেও সে অনাদৃত, পরিবারে তার ভাইয়ের প্রতি প্রযত্ন অনেক বেশি। সেই শিশুটির মধ্যে হীনমন্যতা তৈরি হয়। আরো নির্মম সত্য হলো, পরিবারের মধ্যেই শিশু হোক আর কিশোরী হোক, নিরাপদ নয়। যৌথ পরিবারে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে বেশি। তবে দুঃখের বিষয়, এসব ঘটনার কথা প্রকাশ করতে দেন না অভিভাবকগণ। পরিবারের মানসম্মানের কাছে নিষ্পাপ কিশোরী মেয়েটি শেষ পর্যন্ত আত্মহননের মধ্যে নিজেকে সমর্পণ করে মুক্তি খোঁজে। নারী নিপীড়নের বহু বিচিত্র মাত্রা তৈরি হচ্ছে প্রতিনিয়ত। সবচেয়ে ভয়ানক হচ্ছে যৌতুক প্রথা, ইভটিজিং, যৌন হয়রানি প্রভৃতি। বিস্ময়ের কথা হলো, এসব অপরাধের জন্য রয়েছে আইন, সুনির্দিষ্ট দণ্ড। তথাপি এসব অপরাধের মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। মূল কথা হলো, আইন প্রণয়ন বড় কথা নয়, আইনের প্রয়োগ এবং সুষ্ঠু বাস্তবায়ন। রাষ্ট্র তথা সরকার একক কোনো ব্যক্তি নয়। সরকার হলো একটি রাষ্ট্রের জনগণের সমষ্টি। নারীর মর্যাদা রক্ষায়, নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে, নারীর নিরাপত্তা বিধানে বর্তমান সরকার বেশকিছু কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছেন। যেমন: নারী সুরক্ষা আইন, নারী উন্নয়ন সংস্থা, ভ্রাম্যমাণ আদালত, নির্যাতিত নারীর জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা, আইনি পরামর্শ পেতে কাউন্সিলিং-এর ব্যবস্থা, জেন্ডার বৈষম্য দূরীকরণের নীতি নির্ধারণ—এমন অনেক নারী সুরক্ষার উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু আমাদের গ্রামাঞ্চলের মেয়েরা এখনও এতসব আইনি সুবিধার কথা জানে না। আবার যারা জানে তারাও নানান দ্বিধা-সংশয়ে নিজের কথা প্রকাশ করতে চায় না। তাছাড়া রয়েছে সমাজের রক্তচক্ষু, পরিবারের প্রতিকূলতা ও অসহযোগিতা, লোকলজ্জা ও সংকোচ। বর্তমান সরকার নারীর মধ্যে ব্যক্তিত্ববোধ সৃষ্টির জন্য শিক্ষার প্রতি প্রাধান্য দিয়েছেন। আর সংকোচ নয়, অভিভাবকের কিংবা সমাজের ভীতি নয়, সকল দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে নারীকে মুখ খুলতে হবে । নারী সুরক্ষা বিষয়ক যে কোনো একটি সংস্থার কাছে অকপটে নির্যাতনের কথা ব্যক্ত করতে হবে। নারীকে দৃঢ় মনোবল রাখতে হবে। যে কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাত্ক্ষণিক আইনের আশ্রয় নিতে হবে। গোপনে অশ্রু বর্ষণ নয়, নিজেকে সংহত রেখে নারী সুরক্ষা আইনের সাহায্য নিতে হবে। এ ব্যাপারে বর্তমান সরকার অত্যন্ত আন্তরিক শুধু নন, আপোষহীনও। বর্তমান সরকারের নারীর প্রতি প্রচেষ্টা অত্যন্ত প্রশংসনীয়, কিন্তু এসব সুযোগ-সুবিধাকে প্রত্যেকের কাছে পৌঁছে দিতে আমাদের গণমাধ্যমকে বিশেষ ভূমিকা রাখতে হবে। পূর্বেই বলেছি, সরকার হলো আমাদেরই সঙ্ঘবদ্ধ শক্তি। আমাদের সচেতনতাই পারবে সরকারের প্রচেষ্টাকে সফল করতে। লেখক :সহযোগী অধ্যাপক, রাজশাহী সরকারি কলেজ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন