দেশে ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার লইয়া অনেক কথা হইয়াছে। বিশ্বের কোথাও এত বেশি হারে সুদ দিতে হয় না বিনিয়োগকারীদের। যাহার কারণে বিনিয়োগকারীরা বরাবরই বিনিয়োগে উত্সাহ হারাইতেছেন। তবুও সাহস করিয়া যাহারা বিনিয়োগ করিয়াছেন, তাহাদের অবস্থা কি দাঁড়াইলো তাহাও বিবেচনার দাবি রাখে। বেশি সুদে ঋণ লইয়া শিল্প গড়িয়াছেন এমন উদ্যোক্তারা আজ কঠিন বিপাকে পড়িয়াছেন। বিগত বত্সরগুলিতে গ্যাস-বিদ্যুত্ তথা জ্বালানি সংকট এতটাই প্রবল ছিল যে, জ্বালানির অভাবে শিল্পের চাকা ঘুরাইতে পারেন নাই উদ্যোক্তারা। দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক রিপোর্টে বলা হইয়াছে, বর্তমান সরকারের সময়ে গ্যাস সংকট এতটাই প্রবল ছিল, যাহা অতীতে কোন সরকারের সময় হয় নাই। ফলে, কারখানা চালু করা যায় নাই। উত্পাদন বিঘ্নিত হওয়ায় ব্যবসা করিতে না পারিয়া উদ্যোক্তাগণ ব্যাংকের কাছে খেলাপি হইয়া যাইতেছেন। আর একবার খেলাপি হইলে নিয়মতান্ত্রিক যাহা শাস্তি, তাহাও মাথা পাতিয়া লইতে হইবে। কিন্তু এই কথা জিজ্ঞাসা করিবার কেহ নাই যে, উদ্যোক্তা খেলাপি হইয়াছে কাহার দোষে? তাহার দোষে? নাকি সরকার তাকে জ্বালানি সরবরাহ করিতে পারে নাই, সেই কারণে। যদি সরকার যথাযথ জ্বালানি সরবরাহ করিতে না পারে, তাহা হইলে সেই ব্যর্থতার দায়ভার কেন একজন উদ্যোক্তার কাঁধে পড়িবে। বিশেষত যিনি উচ্চ সুদের বোঝা কাঁধে লইয়াছেন। কিছু মানুষের কাজের সুযোগ করিতে চাহিয়াছেন, যাহার বিনিময়ে দেশমাতার যদি ন্যূনতম উপকার হইয়া থাকে। কিন্তুু কে বলিবে এই সব সত্য, সত্য বলা যে বড় কঠিন!
বিদ্যমান এই সংকটের মধ্যে আরো যোগ হইয়াছে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। আগামী সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া যে ‘অনিশ্চিত ভবিষ্যতের রূপরেখা’ আঁঁকা হইতেছে তাহাতে বিনিয়োগকারীর হাত-পা গুটাইয়া বসিয়া থাকা ছাড়া গত্যন্তর নাই। মনে রাখিতে হইবে যে, বিদ্যমান বিনিয়োগকারীরা যদি ভাল না থাকে, তাহা হইলে নূতন বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে আগাইয়া আসিবে না। আর বিনিয়োগ না হইলে দেশের অর্থনীতি ভাল হইবে কিভাবে? বিষয়টি কি নীতিনির্ধারকরা ভাবিয়া দেখিয়াছেন?
বলা হইতেছে, ব্যাংকিং খাতে বিপুল অংকের অলস অর্থ পড়িয়া আছে। এই অলস অর্থ ইহাই প্রমাণ করে যে, দেশে বিনিয়োগ হইতেছে না। অলস অর্থ বাড়িতেছে দেখিয়া ব্যাংকগুলি আমানতের উপর সুদের হারও কমাইয়া দিয়াছে। কিন্তু যাহা করিলে বিনিয়োগ বাড়িতো, অর্থাত্ ঋণের সুদের হার কমাইলে বিনিয়োগকারীরা আগ্রহী হইতো, তাহা কিন্তু করা হইতেছে না। জ্বালানি সংকটের দুরবস্থা কিভাবে কাটানো যাইবে, তাহা নিয়াও সুদূরপ্রসারী কোন চিন্তাভাবনা আছে বলিয়া মনে হইতেছে না। আর এই অবস্থা যদি বেশিদিন ধরিয়া চলিতে থাকে, তাহা হইলে ভবিষ্যত্ অর্থনীতি যে থমকিয়া দাঁড়াইবে তাহা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশের মত জনবহুল দেশে অর্থনীতি বেগবান করিতে না পারিলে ইহার বিরূপ প্রভাব রাজনীতিকেও প্রভাবিত করিবে। তাই কালবিলম্ব না করিয়া বিনিয়োগে বন্ধ্যাত্বের পেছনে যেইসব কারণগুলি রহিয়াছে, সেইগুলি দ্রুত চিহ্নিত করিয়া ব্যবস্থা গ্রহণ করিলে সকলেরই মঙ্গল হইবে। রাজনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের মনে রাখিতে হইবে, নির্বাচনের আগে আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি উন্নত করিবার বিকল্প নাই।
