একের পর এক সংবাদ তৈয়ার করিয়া যাইতেছে ছাত্রলীগের দুবির্নীত ছেলেরা। ক্যাম্পাসে, রাজপথে, সরকারি অফিসে, মার্কেটে, শহর ও গ্রামে সবখানে তাহাদের উদ্ধত উপস্থিতি। পরোয়া করে না তাহারা কাহারও। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসন যেনবা অসহায় তাহাদের সন্মুখে। রা করিবার সাধ্য নাই কাহারও। প্রতিবাদ করিলে কিভাবে উচিত শিক্ষা দিতে হয় তাহা খুব ভাল করিয়াই জানা আছে ছাত্রলীগ নামধারী তরুণ-যুবাদের। রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার ইউএনও এবং শিক্ষা কর্মকর্তা হাড়ে হাড়ে টের পাইয়াছেন কত ধানে কত চাল! সকল নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করিয়া ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের পছন্দের একটি প্রাইমারি স্কুল সরকারিকরণের জন্য সুপারিশ করিতে বেচারা শিক্ষা অফিসার অসম্মতি জানাইয়াছিলেন। বলিহারি স্পর্ধা ওই ছাপোষা অফিসারের! ছাত্রলীগের নেতারা তাহা মানিয়া লইবে কেন! কাজেই বেধড়ক পিটাইয়া তাহারা ওই বেয়াড়া শিক্ষা কর্মকর্তাকে একটি কক্ষে অবরুদ্ধ করিয়া রাখে। এই খবর পাইয়া পুলিশ সহযোগে পীরগঞ্জের নির্বাহী কর্মকর্তা অকুস্থলে ছুটিয়া যান এবং অবরুদ্ধ শিক্ষা কর্মকর্তাকে উদ্ধার করেন। অতঃপর ক্ষিপ্ত হইয়া ছাত্রলীগের সোনার ছেলেরা অবরোধ করে ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক। পুলিশ আসিলে বাধিয়া যায় সংঘর্ষ। এক পর্যায়ে ইউএনও নিজেও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের রোষানলের শিকার হন। তাহাকে লাঞ্ছিত করা হয়। পরে ইউএনও সাহেব সাংবাদিকদের বলেন যে, তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনার অপেক্ষায় আছেন। নির্দেশ পাইলে ঘটনার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হইবে। তবে পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয় যে, এই ঘটনায় মামলা হইয়াছে এবং জনাদশেককে পুলিশ আটক করিয়াছে। গত মঙ্গলবার এই ঘটনার সচিত্র বিবরণ ছাপা হইয়াছে পত্রিকান্তরে।
মামলার ফল শেষপর্যন্ত কী হইবে, সেই চিন্তা এক্ষণে বৃথা। গত সাড়ে চার বত্সরে সারাদেশে ছাত্রলীগের নামে এই ধরনের ঘটনা সংঘটিত হইয়াছে শতশত। প্রতিকারের খবর পাওয়া গিয়াছে কমই। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, দখলদারি, মাস্তানি-তাফালিং, স্কুল-কলেজে ভর্তিবাণিজ্য—কোথায় নাই ছাত্রলীগ! এই সেদিনের ঘটনা, শাহবাগে ছাত্রলীগের ক্যাডাররা ধুমসে পিটাইয়াছে কোটা বিরোধী আন্দোলনকারী ছেলেদের। ঈদে-পার্বণে ছাত্রলীগের নামে চলে ব্যাপক চাঁদাবজি। এইবারও ঈদ সামনে তাহারা বসিয়া নাই। নামিয়া পড়িয়াছে আগের মতই। ছাত্রলীগের সঙ্গে পাল্লা দিয়া একইরকম কর্মকাণ্ড করিয়া চলিয়াছে যুবলীগের একশ্রেণীর নেতা-কর্মী। শ্রমিকলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাথে জড়িতরাও এইসব কাজে পিছাইয়া নাই। অন্যদিকে শাসক দলের কোনো কোনো সাংসদ ইতিমধ্যে স্বেচ্ছাচারিতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিয়া বিশেষ নাম করিয়া ফেলিয়াছেন। এইসব বিষয়ে পত্র-পত্রিকায় নিরন্তর লেখা হইতেছে। টকশোর টকারগণ এইসবের বিপক্ষে উচ্চকণ্ঠ। কিন্তু কে শুনে কাহার কথা। সকলই অরণ্যে রোদন যেনবা। চার সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের ফলাফল দেখিয়াও হুঁশ হইতেছে না।
আমরা এই কথা বলি না যে, শাসক দলের এক শ্রেণীর নেতা-কর্মীর দৌরাত্ম্য দেশবাসী এই প্রথম প্রত্যক্ষ করিতেছেন। নিশ্চয়ই এই কথা সত্য যে, যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, সেই দলের এবং সহযোগী বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মীরা ধরাকে সরা জ্ঞান করিতে মোটেও কসুর করেন না। তাহারা ভুলিয়া যান যে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। অন্যায়-অনাচারের মচ্ছবে মাতিয়া ওঠে একশ্রেণীর নেতাকর্মী। কিন্তু আখেরে ইহার মূল্য কড়ায়-গন্ডায় শোধ করিতে হয় দলকে। ক্ষমতার দম্ভে যে যেখানে যত অনাচার করুক না কেন, শেষতক তাহার দায়ভার কিন্তু বহন করিতে হয় শীর্ষ নেতৃত্বকেই। ইহাই ইতিহাসের শিক্ষা।
