[ রা জ নী তি ]

প্যাঁচকাটা চক্রে আটকে গেছি আমরা

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০১৩, ২০:৫৩
সমুদ্রের তীরে কিছু বয়স্ক কচ্ছপ থাকে, যারা সমুদ্রের ঢেউ থেকে শুরু করে বড় বড় ঝড়-জলোচ্ছ্বাস সামলে নেয়। বছরের পর বছর ধরে তাদের এই টিকে থাকার অভিজ্ঞতার ঝুলি টইটমু্বর হয়ে ওঠে। তারপরও যাপিত ঘটনার পরম্পরায় একদিন এমন একটি অলক্ষ্য মুহূর্ত আসে যখন তারা ঢেউয়ের তোড়ে উল্টে যায়। শূন্যে কিলবিল করে তাদের চারটে পা। তখনও কি কচ্ছপ বুঝতে পারে কী বিপর্যয় নেমে এল জীবনে? সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে আস্তে আস্তে সময় বয়ে যায়, সেই উল্টানো দশার আর কোনো হেরফের হয় না। রাজনৈতিক যে কোনো দলের অবস্থা অকস্মাত্ ওই কচ্ছপের মতো হতে পারে। সর্বশেষ পাঁচটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে একটি দলের ভরাডুবির পর কেউ বিষণ্ন, কেউ আবার উত্ফুল্ল। এমনকি আগামী সাধারণ নির্বাচন আদৌ অনুষ্ঠিত হবে কিনা—এ নিয়েও শঙ্কিত কেউ কেউ। কোনো না কোনো সমঝোতায় যদি নির্বাচন অনুষ্ঠিতও হয়, তবে সে নির্বাচনে একটি দলের ভরাডুবি নাকি আটকাতে পারবে না কেউ! রাজনীতি হলো এমন একটি পুলসিরাতের ওপর দিয়ে হাঁটা, যা চুলের মতো সরু, তলোয়ারের মতো ধারালো। আর সেই পুলসিরাতের নিচে বইছে দাউদাউ আগুন। রাজনীতিবিদদের কারবার জনগণের সঙ্গেই। কিন্তু যে পথ ও পদ্ধতিতে রাজনীতিবিদরা আমজনতার কাছে পৌঁছুতে চায়, সেখানে কোনো গণ্ডগোল থাকলেই তাদের ভাবমূর্তিতে বিপর্যয় নেমে আসে। ভাব হচ্ছে কোনো রাজনীতিকের প্রতি বিদ্যমান ধারণা। আর মূর্তি হচ্ছে তার বাস্তবতা। এই ভাব ও মূর্তির থেকে যে কোনো একটি আগলা হয়ে গেলেই রাজনীতিবিদদের পুলসিরাত-চ্যুত হতেই হয়। একটি বিশেষ প্রভাবশালী জনপ্রিয় দল আগামী নির্বাচনে হারবেই—এমন রটনা সম্প্রতি আকাশে-বাতাসে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এমন প্রচারণা জনপ্রিয়তা পেলে স্বাভাবিকভাবেই ওই দলটি ভোটের ভাটায় পড়বে, হালে পানি পাবে না। এটার একটা সাধারণ প্রবণতাও আছে। যেমন ফ্লোটিং ভোটাররা সবসময় ভোট দিতে চান তাকে যার জয়ের সম্ভাবনা থাকে। তাদের কথায়— ভোট নষ্ট করবো না। অর্থাত্ যাকে ভোট দেবেন তিনি জিততে না পারলে যেন ভোট ব্যর্থ বা নষ্ট হয়ে যায়! আর ভোট সার্থক করতে তিনি প্রয়োজনে দুর্নীতিপরায়ণ প্রার্থীকেও সমর্থন করতে পারেন—এমনই অদ্ভুত সাইকোলোজি ভোটারদের। কোনো দলের ব্যাপারে নিশ্চিত পরাজয়ের চিত্রনাট্য যদি আগে থেকেই মানুষের মনে ছাপ ফেলে দেয়, তবে ওই দলটির কোনো দুর্নীতি বা অনুন্নয়নের ফিরিস্তির দরকার পড়বে না। পাঁচ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের ব্যারোমিটার। সেই ব্যারোমিটারের বায়ুচাপ দেখে বিমর্ষ ও চিন্তিত হয়েছেন একটি দলের প্রধান নেতা। তাঁর আক্ষেপ যে, যারা সত্, যারা উন্নতি করেছে—তারা ভোট পায়নি। যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত, আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টি আর খুনের সঙ্গে জড়িত, তারা কিনা জিতে এল? তিনি এই জেতার রহস্য বের করতে পারছেন না। কেননা, তাঁর মতে বিগত সাড়ে চার বছরে তাঁর সরকার জনগণের জীবনের মানোন্নয়ের জন্য আগের সরকারের তুলনায় সব দিক থেকেই ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। তিনি শুনেছেন একটি বিশেষ জাতীয় ইস্যুর কাছে নাকি তাঁর প্রার্থীরা হেরে গেছেন। সেই ইস্যুকে তিনি বা তাঁর দলের নীতিনির্ধারকরা গুরুত্ব দেননি। আর তা হলো, আস্তিক আর নাস্তিক। বিষয়টি নি:সন্দেহে মর্মবেদনার। কেননা, এদেশের রাজনীতিতে ধর্মের এমন সার্থক ব্যবহার পাকিস্তানও করতে পারেনি। এই সময়ের দুর্নীতি ও জনজীবনের দুর্ভোগ নিয়ে আলোচনার আগে ফিরে যাই মাত্র কয়েকদিন আগের ঘটনার দিকে। মানবতাবিরোধী অপরাধের আসামী কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন সাজার রায়ের পর তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ শাহবাগে শ্লোগান তোলে সরকারের বিরুদ্ধেই—আঁঁতাতের রায় মানি না। অভিযোগ রয়েছে যে, শাহবাগের এই স্বতঃস্ফূর্ত গণজাগরণের জোয়ারকে সরকার নিজের আঙিনায় টেনে নেয়। কিন্তু বিপ্লবের পাশে প্রতিবিপ্লবও ঘাপটি মেরে বসে থাকে। ইতিহাসও তার সাক্ষ্য দেয়। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে যারা বিচারাধীন, তাদের সংগঠনের অর্থ ও জনবল এতটাই শক্তিধর যে, এদের রক্ষার্থে সমস্ত কূটকৌশলই প্রয়োগের পরিকল্পনা হবে। এটাই স্বাভাবিক। সুতরাং উপায় খোঁজা হোক। সেই উপায় মেলে ইন্টারনেটের বিপুল তথ্য বিস্ফোরণের ভেতরে। ইন্টারনেট হলো বিশ্বগ্রাম, এর কোনো স্বদেশ-বিদেশ নেই। বাংলাভাষী অনেকেই বিশ্বের নানা প্রান্তে বসে নেটে যেসব ভালো-মন্দ কাজ করেন, তার ভেতরে ধর্মচর্চাও আছে। সেই ধর্মচর্চার ভেতরে ধর্মপ্রেম ও ধর্মবিদ্বেষ—উভয়ই আছে। যেমন আছে অসংখ্য মহামূল্যমান টিউটোরিয়াল, জ্ঞানের আকরতুল্য তথ্য এবং পর্নোগ্রাফি। সব প্রধান প্রধান ভাষাতেই কম-বেশি আছে। বাংলায়ও আছে। বলা যায় বাংলায় আছে তুলনামূলক অনেক কম, সব কিছুই, ভালো জিনিস এবং মন্দও। সেই বাংলায় কোন কোন ওয়েবসাইটে কে কে কবে কবে কি কি অতি ভয়ঙ্কর নোংরা ধর্মবিদ্বেষী লেখা লিখেছে, তা আন্তর্জাল চষে বের করে আনা হলো। এ হলো ডেসটিনির হায়-হায় এমএলএম ব্যবসার রহস্য বোঝার মতো, যার শুরু ২০০১ সালে, অথচ সেটা যে একটা লোকঠকানো ব্যবসা, রয়ে গেছে তাতে ভয়ঙ্কর শুভঙ্করের ফাঁকি—তা জানতে কিনা সময় লেগে গেল এক দশক! বাস্তবতা হলো, সবই জানা ছিল শুরু থেকেই, প্রয়োজন মতো সময়ে তা সামনে আনা হয়েছে মাত্র। ইন্টারনেট অনেকাংশেই এক স্বেচ্ছাচারী জায়গা। সেখানে ডাস্টবিনের নোংরার চেয়েও অধিক নোংরা জিনিস রয়েছে ভূরি ভূরি। যার যা প্রয়োজন সে সেটা বেছে নেয়। ডাস্টবিনও প্রিয় অনেক প্রাণীর কাছে। সুতরাং অসংখ্য ধর্মবিদ্বেষী নতুন-পুরনো বাংলা রচনা সামনে আনা হয় ওই বিশেষ সময়ে। ধর্মপ্রেম থেকে নয়, ওই বিশেষ সময়ে বিশেষ প্রয়োজনে ওই নোংরা লেখাগুলোকে আর্ন্তজাল থেকে টেনে বের করা হয়। তার ফল হয় মারাত্মক। এই নোংরা ঘাটাঘাটির উদ্দেশ্য অনুযায়ী বহুলাংশেই অভাবিত সুফল বয়ে নিয়ে আসে কৌশলীদের কাছে। গত ৬ মে বিকেলে আমার ভাড়া বাড়ির ধর্মপ্রাণ দারোয়ান চাচা আমাকে দেখে পাংশু মুখ করে বললেন, ‘ভাই, কাল রাতে তো শাপলা চত্বরে হাজার হাজার মুসল্লিরে সরকার মাইরা ফালাইছে।’ শুনে আমিও চমকে উঠি। কিছুদিন সময় নিয়ে নানা সূত্র থেকে সত্য জানার চেষ্টা করি। আমার নিজের মনে ধোঁয়াশা কাটে না পুরোপুরি। কিন্তু জনমানসের ধোঁয়াশা কাটাতে সরকারের ব্যর্থতা প্রায় শতভাগ। অপারেশন শাপলায় ওই মধ্যরাতে যত অল্প বা বেশি মানুষের মৃত্যু হোক না কেন, সরকারের দেওয়া ব্যাখ্যা বেশিরভাগ জনগণই বিশ্বাস করেনি। কেননা, দিন যত যায় ততই এই সংখ্যা সাধারণ মানুষের মুখে হাজারের নিচে আর নামে না। এরপর সাধারণ মানুষের সিদ্ধান্ত হলো, যে সরকার এমন কাজ করে তারা সবচেয়ে বড় নাস্তিক। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেও যথারীতি বলা হয়েছে—এই দেশে আল্লাহ-নবীর নাম রাখতে চান, নাকি মুছে ফেলতে চান? আগামী নির্বাচনেও এই প্রচারণা চলবে, এটাই স্বাভাবিক, কেননা, এর তাত্ক্ষণিক ফল অতুলনীয়। আমরা দেখছি যে, দেশে দেশে ধর্মনিরপেক্ষতার ভুল ভাবমূর্তিতে ধর্মান্ধতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। মানুষকে মনে করানো হচ্ছে, ধর্ম বিপন্ন হচ্ছে, সেই বিপন্নতার বিষ ঢুকে পড়ছে আমজনতার মনে। আর সেই বিষ নিয়ে খেলছে ধর্মব্যবসায়ীরা। ভোট কৌশলের খেলা। সুতরাং আমজনতাকে কীভাবে সম্মোহিত করলে ব্যালেট বাক্স ভরে উঠবে তার দলের ভোটে, সেটা প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নিজস্ব উদ্ভাবনকৌশল। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বর্তমান সরকার বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছিল মূলত আগের সরকারের দুর্নীতি ও দুঃশাসনের কারণে। লক্ষণীয় যে, এই ঘটনাটি ভাইস ভার্সা হয়ে যাচ্ছে। শেয়ারবাজার, হলমার্ক, পদ্মাসেতুসহ বর্তমান সরকারের যুব ও ছাত্র সংগঠনের কাণ্ড এমনভাবে জনমানসে গেঁথে গেছে যে, এখন বালতি বালতি দুধের অর্ঘ সরকার জনগণের সামনে নিবেদন করলেও সেখানে ওই সব গো-চোনা চোখে পড়ে সবার আগে। আসলে ধনতান্ত্রিক লুটেরা অর্থনীতি এবং উন্নয়নের অনিবার্য উপসর্গ হিসাবে জেঁকে বসে দুর্নীতি। প্রশ্ন হলো এর মাত্রা নিয়ে। যদি সহনীয় মাত্রায় থাকে, এ নিয়ে হইচই হয় না, স্বাভাবিক ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু যখন প্রকল্পের বিপুল অঙ্কের টাকাই হজম করার চেষ্টা হয়, তখনই গোলমাল দেখা দেয়। এই চিত্র পুরো উপমহাদেশের। বাংলাদেশে এই লুটেরা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি গণতান্ত্রিক রূপ সৃষ্টি হয়েছে নব্বই দশকের পর। তখন থেকে এ দেশের জনগণ কোনো দলকে পর পর দুইবার ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বহাল রাখেনি। এবার হয়তোবা তার ব্যতিক্রম হতেই পারে, যদি সরকার ওই চোনার দিকে খেয়াল রাখে। তার সঙ্গে আস্তিক-নাস্তিকের প্রচারণায় অতি শক্তিশালী কৌশল, যা তীব্র বানের জোয়ারে ভাসিয়ে নিতে পারে সবকিছু। ভোটের মাধ্যমে জনগণ ক্ষমতার পালাবদল ঘটায় একটু সুখে-শান্তিতে থাকার জন্য। কিন্তু আমরা কেমন সুখে-শান্তিতে আছি? সুখ হয়তো একটু বেশি আছে আমাদের মনে। কিন্তু শান্তি বোধহয় শান্তিতে নেই। বিশ্বে সুখী দেশের তালিকায় আমাদের সর্বশেষ অবস্থান ১১তম। আমরা অল্পতেই তৃপ্ত-তুষ্ট হই বলেই কি সুখপাখি আমাদের নীড় ছাড়ে না? কিন্তু শান্তির পায়রা বোধহয় এত সহজে বাসা বাধঁতে চায় না এই বিক্ষুব্ধ ব-দ্বীপে। গার্ডিয়ানে প্রকাশিত একটি সংবাদে জানা যায়, শান্তিসূচকে আমাদের অবস্থান ১০৫তম! অথচ ২০১২ সালেও এই অবস্থান ছিল ৯১তম। শান্তির জন্য চাই সামাজিক নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সংঘাতহীনতা ইত্যাদি। এসবের যে আকাল পড়েছে, তা বুঝতে শান্তিসূচকের দিকে তাকাতে হয় না। তীব্র গরমে নাভিশ্বাস উঠলে যেমন দরকার পড়ে না থার্মোমিটারের পারদের কাঁটার দিকে তাকাতে। ২০০৮ সালের পর পৃথিবীতে শান্তি এবং স্থিতিশীলতার পতন ঘটেছে ৫ শতাংশ। আর মাত্র এক বছরে, ২০১২ থেকে ’১৩-এর মাঝামাঝিতে আমাদের স্থিতিশীলতার পতন ঘটেছে ১৩ শতাংশ। আমরা কেমন সময় পার করছি তা বোঝা যায় স্থিতিশীলতার এমন অকস্মাত্ পতনে। তাই বর্তমান চিত্ররূপ স্পষ্ট বলে দেয় যে, সামনে পরিবর্তনের পেন্ডুলাম দুলবে গভীর অনিশ্চয়তায়। কিন্তু সেটা কি আমাদের শান্তির নিশ্চয়তা দেবে? আমরা হয়তো কড়াইতে ভাজা ভাজা হতে হতে মুক্তির আশায় লাফ দিচ্ছি। কিন্তু গিয়ে পড়ছি চুলার দাউদাউ আগুনের ভেতরে। সেখান থেকে আবার হয়তো পুড়তে পুড়তে কড়াইতে গিয়ে আশ্রয় নেব তুলনামূলক ভালো থাকার আশায়। আমরা যেন এক অনতিক্রম্য চক্রব্যুহে আটকে গেছি অভিমন্যুর মতো, বের হবার পথ জানি না। লেখক: সাংবাদিক ইমেইল : [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন