আলোকপাত

শিথিল করা হোক শিক্ষার্থী বদলির নিয়ম

আপডেট : ২৬ জুলাই ২০১৩, ২১:০৭
বিধিবিধান অনুসারে শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠান বদল করার অধিকার বা সুযোগ থাকা বাস্তবিক কারণেই যুক্তিযুক্ত। বিশেষ করে প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের অপ্রাপ্ত বয়স্ক শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বদলের এই সুযোগ থাকা উচিত অগ্রধিকারভিত্তিক। কেননা তাদের পিতা-মাতা/অভিভাবকের কর্মস্থল বা আবাসিক ঠিকানা পরিবর্তন এক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য কারণ। এছাড়াও সামাজিক পরিবেশগত কারণে ছেলে শিক্ষার্থীদের বখে যাওয়া এবং মেয়ে শিক্ষার্থীদের ইভটিজিং-এর মতো মারাত্মক ক্ষতিকারক করাল গ্রাসের কবল থেকে রক্ষা করার জন্যও বদলি অত্যাবশ্যক হতে পারে। এটি শুধু সরকারি চাকুরেদের জন্যই নয়, যে কোন কর্মজীবীর জন্যই সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হওয়া উচিত। অথচ বর্তমানে স্কুল-কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের টিসি প্রদানের ক্ষেত্রে নতুন কিছু নিয়ম-কানুন করার কারণে সারাদেশের হাজার হাজার শিক্ষার্থী অনেক বঞ্চনার শিকার। বর্তমান নিয়ম অনুসারে কোন শিক্ষার্থী পঞ্চম, অষ্টম, নবম ও একাদশ শ্রেণিতে কোন প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে নাম তালিকাভুক্ত বা রেজিস্ট্রেশন করার পর টিসি নিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। যেমন- যতই প্রয়োজন/সমস্যা থাকুক, নবম ও একাদশ শ্রেণির কোন শিক্ষার্থী প্রতিষ্ঠান বদল করতে পারে না! দশম ও দ্বাদশ শ্রেণিতে প্রমোশন পাওয়ার পরই কেবল সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের অনুমতি সাপেক্ষে নির্ধারিত ফরমে বদলির জন্য আবেদন করতে পারে। কিন্তু সেখানেও নতুন নিয়ম। একটি প্রতিষ্ঠান কেবলমাত্র পাঁচজন শিক্ষার্থীকে টিসি প্রদানের সম্মতি দিতে পারবে। বাদবাকি আরো দশ/বিশজনের যতই প্রয়োজন বা সমস্যা থাকুক, লেখাপড়া থেকে ঝরে পড়ুক, নেশা/ইভটিজিং-এর কারণে জীবন বিনষ্ট হয়ে পড়ুক, মৃত্যুর সাথে আলিঙ্গন করুক, কিন্তু বদলি হয়ে অন্যত্র যেয়ে নিরাপদে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। তদুপরি এমন অনেক শিক্ষার্থী আছে যারা জেএসসি/ এসএসসি পরীক্ষায় অনেক ভালো রেজাল্ট করেছে; কিন্তু উল্লিখিত বা অন্য কোন কারণে নবম/ একাদশ শ্রেণির সকল ক্লাস করতে পারেনি বা নিয়মিত বেতন-ফি পরিশোধ করতে পারেনি অথবা সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারেনি কিংবা সকল বিষয়ে পাস করতে পারেনি বলে প্রতিষ্ঠান তাদের দশম/দ্বাদশ শ্রেণিতে প্রমোশন প্রদান করেনি বিধায় তারা অন্য প্রতিষ্ঠানে বদলির জন্য আবেদনই করতে পারছে না। এসব শিক্ষার্থীর অনেকের ক্ষেত্রে আরো খারাপ খবর হচ্ছে পরবর্তী সরকারি পরীক্ষায় খারাপ রেজাল্ট করে প্রতিষ্ঠানের পাসের হারে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে এমন ভয়ে কোন কোন প্রতিষ্ঠান তাদের পুনরায় নবম/একাদশ শ্রেণিতেও রাখতে চায় না বিধায় বিভিন্ন অজুহাতে অনেকের ভর্তি বাতিল করে দেয়ার কথাও শুনা যায়। এমতাবস্থায় তারা না পারছে বর্তমান প্রতিষ্ঠানে পড়তে, না পারছে বদলি হয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে যেয়ে লেখাপড়া করতে। কি নিষ্ঠুর নিয়মের বেড়াজালে বন্দী তাদের শিক্ষাজীবন! অথচ যখন প্রয়োজন বদলি হয়ে সুবিধাজনক প্রতিষ্ঠানে চলে যাওয়ার সুযোগ উন্মুক্ত করে দিলেই উন্মুক্ত হতে পারে তাদের শিক্ষাজীবন। তাদের অনেকেই হয়তো হতে পারে অনেক উচ্চ শিক্ষিত ও উচচপদস্থ আলোকিত মানুষ। বর্তমান ডিজিটাল যুগে তথ্যের আদান- প্রদান তো আগের চেয়ে অনেক সহজ। কিন্তু এই ডিজিটাল ব্যবস্থার বর্ধিত সুযোগ আরো সীমিত করে শিক্ষার্থীদের স্বার্থ বিনষ্ট করে কেন প্রতিষ্ঠান বদলের এমন কঠিন ও অযৌক্তিক নিয়ম-কানুন? শিক্ষার্থী বদলির সুযোগ সীমিত বা বন্ধ করা হলে শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তা- কর্মচারীদের কাজের জামেলা ও পরিধি হয়তো কিছুটা কমতে পারে। এছাড়া আর কারো কোন সুবিধা তো আছে বলে মনে হয় না। আমাদের কাজ বা অনিয়ম কমানোর জন্য অথবা অন্য কোন সমস্যা সমাধানে ব্যর্থতার জন্য আমাদের সন্তানদের বর্তমান ও ভবিষ্যত্ জীবনের বিন্দুমাত্র ক্ষতি হোক তা তো মেনে নেয়া যায় না কোনভাবেই। মেনে নিতে পারেন না কোন বিবেকবান মানুষ। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট বিভাগে বা শাখায় বৃদ্ধি করা হোক সত্, যোগ্য ও দক্ষ জনবল। আর সে খরচ মেটানোর জন্য প্রয়োজনে বদলির আবেদকারী শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে জনপ্রতি জমা নেয়া হোক অধিক যুক্তিযুক্ত ফিস। যেমন ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে জমা নেয়া হয় রেজিস্ট্রেশন, ফরম পূরণ, সার্টিফিকেট উত্তোলন ও অন্যান্য ফি। যখন প্রয়োজন তখন শিক্ষার্থী বদলির সুযোগ প্রদান করা হলে নিশ্চয়ই নির্ধারিত ফিস প্রদানে অনীহা প্রকাশ করবেন না অভিভাবকগণ। তাই শিক্ষার্থীদের ও তাদের সংশ্লিষ্ট অভিভাবকগণের সুবিধার্থে এবং আমাদের দেশ ও জাতির অধিকতর কল্যাণার্থে অতি শীঘ্রই শিথিল করা হোক শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠান বদলের নিষ্ঠুর নিয়ম-কানুন। লেখক: প্রিন্সিপাল, কিশলয় স্কুল ও কলেজ এবং পার্টটাইম এ্যাসোসিয়েট প্রফেসর, প্রাইম ইউনিভার্সিটি, ঢাকা

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন