আমরাও পারবো

আপডেট : ২৬ জুলাই ২০১৩, ২১:৩৪
সালটি মনে করতে পারি না। তবে খুব সম্ভবত ১৯৭৯ থেকে ১৯৮১-এর মধ্যকার কোন একদিন ইত্তেফাকের উপ-সম্পাদকীয় বিভাগে একটি প্রতিবেদনে প্রতিবেদক একটি ঘটনা উপস্থাপন করেছিলেন। ঘটনাটি হচ্ছে রাশিয়া থেকে একজন সাংবাদিক এসেছিলেন আমাদের দেশে। তিনি যখন ফেরত যান ঢাকা এয়ারপোর্টে বাংলাদেশের অনেক সাংবাদিক তাকে বিদায় দিতে গিয়েছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে রাশিয়ার ভূমিকা আমাদের জন্য ছিল সহযোগিতামূলক। তাই রাশিয়ার একজন সাংবাদিকের আগমন বা বিদায় ছিল সৌহার্দ্যপূর্ণ বিষয়। বিদায় প্রাক্কালে আমাদের দেশ সম্পর্কে মন্তব্য জানতে চাইলে প্রত্যুত্তরে রাশিয়ার সাংবাদিক বলেছিলেন, আমরা কমিউনিস্ট, আল্লাহ, খোদা, সুপার পাওয়ার এগুলোতে বিশ্বাস অনেক কম। তবে এদেশ ভ্রমণ শেষে আমি যখন দেশে ফিরব তখন ভাববো এরকম কিছু আছে। আমাদের সাংবাদিকরা ভাবলেন বাংলাদেশ মুসলিম প্রধান দেশ। আমাদের দেশে ধর্মভীরু লোকজনের ধর্মীয় কার্যকলাপের পরিপ্রেক্ষিতে তার এই অভিমত। তেমনটি জিজ্ঞাসা করায় তিনি বললেন, “না ধর্মের কারণে নয়। তোমাদের দেশে যে অব্যবস্থা, অনৈতিকতা, দেশের প্রতি পরতে পরতে, খোদা, আল্লাহ বা সুপার পাওয়ার বলে কিছু একটা অবশ্যই আছে। তা না হলে তোমাদের এদেশ চলার কথা নয়।” আমি সেই সাংবাদিকের নাম মনে করতে পারি না। তাই জানি না তিনি আজও বেঁচে আছেন কিনা। তা না হলে উনাকে জানাতে পারতাম আমরা আজো স্বাধীনতার ৪২ বছর একই অব্যবস্থায় পড়ে আছি; কিন্তু থেমে নেই। সাধারণ জনগণ স্বউদ্যোগে এদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। যে দেশের রাজনীতিবিদদের কোন কমিটমেন্ট নেই, নেই রাজনীতির কোন সুনির্দিষ্ট মেরুকরণ, যে দেশের নীতিনির্ধারকেরা আজও শিল্পে না কৃষিতে আমাদের উন্নয়ন, গ্রাম না শহরভিত্তিক অর্থনীতি আমাদের প্রয়োজন এখনও সঠিকভাবে ঠিক করতে পারেননি, যে দেশে ব্যক্তি থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে চরম অনৈতিকতা, বিভেদ-দ্বন্দ্ব, হানাহানি ইত্যাদি হালুয়া রুটির মতো সহজ বিষয় সে দেশ এগুচ্ছে। এ দেশে গত ৫ বছর ধরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশও যখন হিমশিম খাচ্ছে নানা অর্থনৈতিক খরায় তখনও এদেশের কৃষক ১৭-১৮ কোটি লোকের খাদ্য যোগান দিয়ে যাচ্ছে। এদেশের শ্রমিকেরা তৈরি করে দিচ্ছে উন্নতমানের পোশাক সস্তায় আর তার উপর ভর করে বিদেশি নামি-দামি ব্রান্ডের কোম্পানি অর্জন করছে আশাতীত মুনাফা। আমাদের রফতানির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ, প্রবাসীর প্রেরিত রেমিটেন্স প্রবাহ আমাদের এখনও আশা জাগায় প্রতিনিয়ত। ২০১৫ সালে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জন করার কথা। ২০১৩ সালের মধ্যেই তা অর্জিত হবে। খোদ বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের এই অর্জনকে বিরল ও উল্লেখযোগ্য বলে আখ্যা দেয়া হয়েছে। অর্মত্য সেনও তার নতুন বই “এন আনসারটেন গ্লোরী” বইতে বলেছেন, বাংলাদেশ ভারতের তুলনায় অর্ধেক মাথাপিছু আয়ধারী হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন সূচকে চমকে দেয়ার মতো সফলতা অর্জন করেছে। জাপান, চীন, ল্যাটিন আমেরিকা বিনিয়োগ সন্ধানে অগ্রগণ্য ভাবছে এ দেশকে। যদিও বাণিজ্য সাম্রাজ্য বিস্তারের অশনি ইচ্ছা নিয়ে আমাদের দুর্বলতায় আঘাত এনে বিশ্বের কিছু মুরুব্বি দেশ আমাদের মাঝে মাঝে চাপে ফেলে দেয়, তবুও আমাদের উগড়ে দেয়ার মতো পরিস্থিতি আর নেই। এ দেশের প্রতি একরে ফলে প্রচুর ফসল, তা পৃথিবীর আর কোথাও নেই। উপরন্তু এ দেশের এক জমিতে ফলে ২-৩টি ফসল একই বছরে। শুধু আমাদের দেশজুড়ে যেদিকে তাকাই অনিয়ম, অব্যবস্থা, লুটপাট, ভঙ্গুর অবকাঠামো, বস্তাপচা রাজনীতি, দুর্বল পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ, হত্যা, ধর্ষণ যে হারে ছেয়ে গেছে সারা বাংলায় এ দেশ একদণ্ড দাঁড়িয়ে থাকার কথা নয়। তারপরও চলছে এগিয়ে জনসাধারণের ঐকান্তিক ইচ্ছায় । রক্তাক্ত এই সাধারণেরা জমাট বুকে ধারণ করে আছে উন্নয়নের আশার আলো। আমাদের শুধু প্রয়োজন কিছু অনমনীয়, সত্, নিষ্ঠাবান দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব, যারা অন্তত আগামী ১০ বছর এ দেশটাকে আর এর জনগণকে বড় করে দেখবে। প্রয়োজন রাজশাহীতে বর্তমান ও সাবেক মেয়র এইচ এম খায়রুজ্জামান ও মোসাদ্দেক হোসেনের আলুপট্টি মোড়ের চায়ের দোকানের সেই আড্ডার পরিবেশ সমস্ত রাজনৈতিক দলের মধ্যে তৈরি হওয়া। এটা রাজশাহী মেয়রদের মধ্যে সম্ভব হয়েছে। এটা চাইলে বড় রাজনৈতিক দলগুলোও পারবে। আমাদের প্রয়োজন শহরভিত্তিক অর্থনীতিতে উন্নয়নের জোয়ার থামিয়ে গ্রামাঞ্চলের অবকাঠামো, স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, কৃষিভিত্তিক পণ্যের উন্নয়নে মনোনিবেশ করা। এতে সম্পদ সুবণ্টনের ব্যবস্থা হবে এবং শহর ও গ্রামের বৈষম্য কমে আসবে। এতে শহরের উপর যে চাপ দিন দিন তৈরি করছে নরক নাগরিক জীবন, তারও সুরাহা হবে। বিশ্ব ব্যাংকের উক্ত প্রতিবেদনে বাংলাদেশের দারিদ্র্য ও বৈষম্য দুই-ই কমেছে বলে মন্তব্য করা হয়েছে। যদিও তারা এও মনে করিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশের চার কোটি সত্তর লক্ষ লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। এর মধ্যে দুই কোটি ষাট লক্ষ মানুষই চরম দরিদ্র এবং এদের বসত গ্রামাঞ্চলে। নোবেল বিজয়ী বিশ্বখ্যাত ড. মো. ইউনূসের সামাজিক ব্যবসা বিশ্বের অনেক উন্নত দেশেই আদৃত একটি মডেল হিসাবে গৃহীত হচ্ছে। সাধারণ হিসাবে আমারও ধারণা এই দরিদ্র মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে এ দেশে সামাজিক ব্যবসার আদলে গড়তে হবে প্রচুর ব্যবসা । যদিও এই ব্যবসায়ের পুঁজি যোগানদাতা হিসেবে প্রয়োজন আমাদের দেশের পুঁজিপতিদের মনের ভেতর এ দেশটাকে গড়ে তোলার মতো সুন্দর ও নিবেদিতপ্রাণ ও তার জাগরণ। এদেশের বহু কোটিপতি রয়েছেন যারা মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোমে বিনিয়োগ করেছেন, দুবাইতে বাড়ি ভিলা কিনেছেন, অস্ট্রেলিয়ায় আপেল, কমলার বাগানের লিজের মালিকানা নিয়েছেন, লন্ডন, কানাডায় বাড়ি, জমির মালিক হয়েছেন। এ সম্পদ দিয়ে তাদের ও তাদের প্রজন্মের পথ চলা সুন্দর হবে এটা ঠিক; কিন্তু যে দেশ থেকে তাদের রাশি রাশি উপার্জন সেই দেশের উন্নয়নে সামাজিক ব্যবসায়ে তাদের ক্ষুদ্র ফেরতযোগ্য লাভবিহীন বিনিয়োগ বদলে দিতে পারে সারা পৃথিবীতে তাদের দেশের ইমেজ। তাদের একটু দয়া, একটু বিসর্জন গড়তে পারে আমাদের ও আমাদের প্রজন্মের একটি সুন্দর ভবিষ্যত্। অন্যদিকে গাজীপুরে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীদের আটকিয়ে রেখে শ্রমিকদের নির্যাতন, আজিজ সুপার মার্কেটে সেলস্ম্যান কর্তৃক আর্ট কলেজের ছাত্রীর করুণ দশা এগুলোর হাত থেকে আমরা বাঁচবো। কারণ খেটে খাওয়া মানুষগুলো সুযোগ পেলেই আমাদের তুলাধুনা করবে। তারা আমাদের এক পয়সারও সম্মান দেয় না। কারণ তারা জানে তারা বেঁচে আছে তাদের শ্রমে ও কষ্টে। এদেশের পুঁজিপতি, সমাজপতি তাদের স্বার্থে, তাদের জীবনমান বৃদ্ধিতে কোন অবদান রাখছে না। তাদের হিংস্রতার খড়গ নামছে নিরীহ সাধারণের প্রতি। অন্য জায়গায় আজ হয়তো পেরে উঠছে না, কালকের কথা বলা যায় না। আমাদের জগত্খ্যাত মেধা আছে, আমাদের সাধারণেরা সাদামাটা। আসুন না এগুলোকে একত্রিত করে আমরা আবারও নতুন করে গড়তে শিখি, যাতে আমাদের সবারই ভালো হবে। লেখক :ব্যাংকার ই-মেইল : [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন