একটি খুব ক্ষতিকর ধারা তৈরি হয়েছে অধুনা। বিজ্ঞ আদালত রায় প্রদানের পর সংক্ষুব্ধ পক্ষ যতটুকু প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে পারে বা যে ভাষা ব্যবহার করা সঙ্গত তা অতিক্রম করে প্রতিক্রিয়া প্রকাশের আলাদা ধারা তৈরি করেছে। এ ধরনের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ আইনের শাসনের পথ ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলে আমাদের আশংকা। অবশ্য প্রতিক্রিয়া প্রকাশ যদি সীমা অতিক্রম করছে বলে মনে হয় তবে তারও কারণ খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়। নানা কারণেই আদালতের ওপর মানুষের আস্থা কমে গেছে। বিশ্বাসের জায়গাটিতে চিড় ধরেছে। পোড়খাওয়া মানুষ বিশ্বাস করতে চায় অর্থ ও রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে কখনো কখনো আদালত অসহায় হয়ে পড়ে। তখন বিচার তার নিজস্ব পথ ধরে এগুতে পারে না। ফলে ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য অথবা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য কোনো কোনো পক্ষ নানা কৌশলে চাপ প্রয়োগ করতে চায়। জনগণের কাছে বিচারক বা বিচারপতিদের জবাবদিহিতার সুযোগ না থাকায় একটি ধোঁয়াশা সব সময়ই তৈরি হয়ে থাকে। বিক্ষুব্ধ অবস্থা তৈরির পেছনে একেও কারণ হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। এসব যুক্তির পরও বলবো, আদালতের দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিবাদ জানানো বা মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের রায় ঘোষণার দিন এবং এর পরের দিন হরতাল আহবান করা বিচার প্রক্রিয়াকেই চ্যালেঞ্জ জানানোর শামিল। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় তা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। সমপ্রতি মানবতাবিরোধী অপরাধী আলী আহসান মুজাহিদের বিচারের রায় ঘোষণার পর কোনো পক্ষের রায় প্রত্যাখ্যান আর কোনো পক্ষের হরতাল আহবান বিচারপতিদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে। তারা নিজস্ব মন্তব্য প্রকাশ করেছেন যে, এ ধরনের আচরণ আদালত অবমাননার শামিল। তাই সকল পক্ষকে বিজ্ঞ আদালত সতর্ক ও সংযত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। আমরা জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আদালতের এই পর্যবেক্ষণকে স্বাগত জানাই।
চলমান মানবতাবিরোধী অপরাধীদের রায় নিয়ে বা রায় প্রদানের পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় সংগঠিত দুই পক্ষকে সক্রিয় দেখি। একপক্ষ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাস্নাত গণজাগরণ মঞ্চের তরুণরা, যারা মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করে আসছে। অপরপক্ষ অপরাধীদের সংগঠন জামায়াতে ইসলাম ও এর অঙ্গ সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রতিক্রিয়া। আদালত কোনো মামলার রায় প্রদানের আগ পর্যন্ত কোনো অপরাধীর জন্য সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানানোকে অন্যায় বিবেচনা করা যাবে না। গোষ্ঠীগত বা গণদাবি থাকতেই পারে। অথবা অভিযুক্তকে নির্দোষ দাবি করে কোনো পক্ষ মুক্তি চেয়ে মিছিলও করতে পারে। কিন্তু রায় হয়ে গেলে তা প্রত্যাখ্যান করা বা আদালতকে হেয় জ্ঞান করে কথা বলা আদালত অবমাননা করার শামিল। দুর্ভাগ্য আমাদের, সকল পক্ষই সামপ্রতিক সময়ে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের রায় শুনে সীমা লঙ্ঘন করে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করছে। আলী আহসান মুজাহিদের রায়ের সময় তাই বিজ্ঞ বিচারপতি সকল পক্ষকে সে কথাই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। বিচারের রায় মনঃপুত না হলে সংক্ষুব্ধ পক্ষ পদ্ধতিগতভাবে আপিল আদালতে যেতে পারে। এ নিয়ে রাজপথ গুলজার করা নয়। একটু বিলম্বে হলেও গণজাগরণ মঞ্চের নেতারা এই সত্য বুঝতে পেরেছেন এবং নিজেদের সংযত করে নিয়মতান্ত্রিক পথে হাঁটার চেষ্টা করেছেন।
অপরদিকে জামায়াতে ইসলামী বরাবরই স্বাভাবিক নর্ম ভেঙ্গেছে এবং জঙ্গি মনোভাব প্রকাশ করেছে। মানবতাবিরোধী অপরাধী জামায়াত নেতাদের বিচারের রায়ের দিনে হরতাল ডেকে প্রথমেই রায়ের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করে আসছে। কেউ কেউ বলেন, জামায়াত নেতারা এবং জামায়াতের আইনজীবীরা আগে থেকে বুঝতে পারেন বিচারে তাদের অপরাধী নেতাদের কঠিন সাজা হবেই। তাই জামায়াত নেতা ও তাদের বড় আইনজীবীরা সাংবাদিকদের প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়ার হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য রায় ঘোষণার দিন আদালতে অনুপস্থিত থাকার সিদ্ধান্ত নেন। সাংবাদিকদের জানিয়ে দেয়া হয় সেইদিন বিকেলে বা সন্ধ্যায় আসামি পক্ষের প্রধান আইনজীবী আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবেন। এসব কারণে বলা হয় জামায়াত নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য হরতাল ডেকে লক্ষ লক্ষ দেশবাসী আর দেশের অর্থনীতির ক্ষতি করছে, যা তারা পারে না। রায় ঘোষণার দিন হরতাল ডেকে আদালতকে অপমানিত করছে। আরো বেশি অপমানিত করছে রায় ঘোষণার পরদিন হরতাল ডেকে। গোলাম আযমের রায়ের পরদিন সংক্ষুব্ধ গণজাগরণ মঞ্চ এবং কয়েকটি বাম দল হরতাল ডেকে একই ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি করেছিল।
আমরা মনে করি হরতাল নামের প্রতিবাদের অস্ত্রটি ক্রমাগত অপব্যবহার করতে করতে এতটাই গুরুত্বহীন হয়ে গেছে যে, তা এখন সন্ত্রাসের প্রতীক হয়ে দেখা দিয়েছে। এখন যে কেউ যে কোনো উছিলায় হরতাল ডেকে ফেলে এবং সর্বত্র সন্ত্রাস ছড়িয়ে দিয়ে হরতাল সফল করার চেষ্টা করে। এই তো কিছুদিন আগে শিবিরের কোনো এক নেতাকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগে পুলিশ গ্রেফতার করলে শিবির রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকে ফেলে। সন্ত্রাস ছড়িয়ে তা সফল করারও চেষ্টা করে।
এখন হরতাল নিঃসন্দেহে অরাজকতা, সন্ত্রাস, সম্পদ ও জীবনহানির অস্ত্র। এর মধ্যে কোনো নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির লক্ষণ নেই। আছে কুরাজনীতির ভয়ঙ্কর থাবা। দেশের মানুষ এখন আর এমন হরতাল চায় না। চায় এর থেকে মুক্তি। আইন করে হরতাল বন্ধ করার পক্ষে এখন প্রবল জনমত। আর তা চাইলে একমাত্র আওয়ামী লীগই পারতো সংসদে তার একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তিতে হরতাল বন্ধের বিল কার্যকর করতে। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতারা তা করবেন না। কারণ একই সুবিধাবাদী চরিত্র সবার। বিরোধী দলে গেলে আবার এই অস্ত্র তাদেরও প্রয়োগ করতে হবে। মাঝখান থেকে পিষে মরবে সাধারণ মানুষ এবং ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের সম্পদ ও অর্থনীতি।
তারপরও জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের কাছে প্রশ্ন, রায় ঘোষণার দিন ও পরের দিন হরতাল করে কী রাজনৈতিক লাভ অর্জিত হচ্ছে আপনাদের? একটি রায়কে কেন্দ্র করে আপনারা দুইদিন নয়, চারদিন সন্ত্রাস করেন। জনগণের জানমালের ক্ষতি তো করেনই, পিকেটিং তথা নৈরাজ্য সৃষ্টির কাজে নিয়োজিত নিজেদের কর্মী-সমর্থকদের পুলিশের সাথে সংঘর্ষে আহত-নিহত করায় ভূমিকা রাখেন। প্রতিপক্ষকে রক্তাক্ত করেন। অপরদিকে নেতৃত্বে থাকা কোনো জামায়াত-শিবির কর্মী আহত-নিহত হয়েছেন তেমন পরিসংখ্যান কী আছে? আগেই বলা হয়েছে, গণজাগরণ মঞ্চ ও কয়েকটি বাম দলের একদিনের হরতাল ডাকাটা সুবিবেচনাপ্রসূত হয়নি। তারপরও দেখুন ওদের হরতাল ছিল অহিংস। জনগণের ওপর ছেড়ে দিয়েছিল হরতালের ভাগ্য। পাশাপাশি উগ্রতা আর ত্রাস সৃষ্টির মধ্য দিয়ে হরতালাতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল জামায়াত-শিবির। জামায়াত ইতোমধ্যে জঙ্গিবাদী দল হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। বিজ্ঞ আদালতও তেমন পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করেছে। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বেআইনিভাবে হরতাল ডেকে জানমালের যে ক্ষতি করছে জামায়াত তা নিশ্চয় রাজনৈতিকভাবে দলটিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
ইসলামী দল হিসেবে দাবি করাটা জামায়াতের কতটা ভণ্ডামি তা তো বারবারই প্রমাণ রাখছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় মাঠে নেমে এর প্রমাণ রেখেছিল জামায়াতে ইসলামী। পাকিস্তানের অখণ্ডতায় বিশ্বাসী থেকে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে তা না হয় গণতান্ত্রিক যুক্তি দিয়ে মানা যায়। কিন্তু মানুষ হত্যা, নারী ধর্ষণ, বাঙালির ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া এবং এসব অপকর্মে পাকবাহিনীকে সহায়তা করার মধ্য দিয়ে জামায়াত দলটি পবিত্র ইসলামের আদর্শকে চরমভাবে লাঞ্ছিত করেছে। জামায়াত যদি ইসলামী দল হতো তা হলে নিজ দলীয় মানবতাবিরোধী জঘন্য অপরাধীদের বর্জন করতো। জনগণের সাথে ঐকতানে এসব পাপাচারীর শাস্তি দাবি করতো। অথচ জামায়াত রমজানের পবিত্রতাকেও রক্ষা করেনি। পবিত্র রমজান মাসে হরতাল ডেকে জনগণকে দুর্যোগের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। জনপদ রক্তাক্ত করেছে। গাড়ি-ঘোড়া ভাংচুর করেছে, অগ্নি প্রজ্বলন করেছে। পথে বসিয়েছে অনেক অসহায় মানুষকে। সারা বছর যে ব্যবসায়ীরা অধীর আগ্রহে রমজানের দিকে তাকিয়ে থাকেন তাদের ব্যবসায়ের দারুণ ক্ষতির কারণ ঘটিয়েছে। বিএনপি নেতারা জামায়াত বন্ধুত্ব বজায় রাখতে গিয়ে মানবতাবিরোধীদের বিচারের রায় সম্পর্কে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি। অসাধারণ মৌনব্রত পালন করছেন। তবে হাজার বন্ধুত্ব থাকলেও রায় ঘোষণার মতো একটি স্বাভাবিক ঘটনাকে ইস্যু বানিয়ে রমজান মাসে হরতাল ডাকা থেকে জামায়াতকে নিবৃত করার ভূমিকা রাখতে পারতেন তারা। অন্তত এই হরতালের বিরুদ্ধে নিজ দলীয় অবস্থান নিশ্চিত করতে পারতেন। এর বদলে নীরব থেকে অন্যায় হরতালের পক্ষে নিজ সমর্থন স্পষ্ট করেছেন।
আমরা মনে করি রমজান মাসে ‘রায় ইস্যু’কে সামনে রেখে এভাবে হরতাল করে জামায়াত সরাসরি এবং বিএনপি পরোক্ষভাবে নিজ নিজ দলীয় ইমেজকে আরো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বিক্ষুব্ধ হয়েছে সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী সকলেই। ঘটনার ধারাবাহিকতা বলে দেয় এদেশের রাজনীতিতে এই অনাচার চলবেই। আমাদের মনে হয় রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর সাধারণ মানুষের চাপ সৃষ্টি, হরতাল বিরোধিতায় কণ্ঠ উচ্চকিত করা এবং হরতাল প্রতিরোধে এগিয়ে আসা ছাড়া সুস্থ সমাজ জীবন ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষের ঘুরে দাঁড়ানো ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই।
লেখক:অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
