প্রতি বত্সরের ন্যায় এবারও যাত্রীদের জন্য বিআইডব্লিউটিএ-র (বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ) ঈদ স্পেশাল সার্ভিস থাকিবে। আগামী ৫-৬ আগস্ট হইতে এই সার্ভিস শুরু হইবে বলিয়া জানা গিয়াছে। কিন্তু এবারও জাহাজ সংকটে পড়িতে পারে এই সরকারি সংস্থাটি। যেমন- ঢাকা-চাঁদপুর-বরিশাল-মোড়েলগঞ্জ রুটে সংস্থার ৫টি জাহাজের মধ্যে মাত্র একটি জাহাজ সচল। বাকিগুলি বিকল। পিএস মাহমুদ ডকইয়ার্ডে আছে তিন মাস যাবত্। কয়েকদিন আগে একদিনেই বিকল হইয়াছে পিএস অস্ট্রিচ ও লেপচা। শেলাও সচলযোগ্য নহে। সচলযোগ্য বলিতে আছে একমাত্র পিএস টার্ন। যদিও বিআইডব্লিইটিসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলিতেছেন যে, ঈদ স্পেশাল সার্ভিস শুরুর আগেই সব জাহাজ সংস্কারপূর্বক সচল করা হইবে, তথাপি এই রুটের নৌযাত্রীরা আশঙ্কামুক্ত হইতে পারিতেছেন না। যেসব জাহাজের একাধিক ইঞ্জিন ভাঙিয়া গিয়াছে, সেসব জাহাজের জন্য কেন্দ্রীয় কার্যালয় হইতে দ্রুত যন্ত্রাংশ পাঠানোর ব্যবস্থা করিতে হইবে।
এইদিকে ‘নিরাপদ নৌপথ’ নামক একটি সংগঠন বিআইডব্লিউটিএ-র নিকট এই মর্মে অভিযোগ করিয়াছে যে, ঈদ উপলক্ষে অনেকগুলো ত্রুটিপূর্ণ নৌযান নূতনভাবে রং করিয়া যাত্রী পরিবহনের কাজে নিয়োজিত করার চেষ্টা চলিতেছে। তাহারা নৌযাত্রার নিরাপত্তার স্বার্থে লঞ্চের ফিটনেস পরীক্ষার উপর জোর দিয়াছেন। কেননা এসময় আবহাওয়াগত কারণে লঞ্চ দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি।
দেশের দক্ষিণাঞ্চলে রাস্তাঘাট ও সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার অনেক উন্নতি হইয়াছে আগের তুলনায়। কিন্তু এতদঞ্চলের বিশাল সংখ্যক মানুষ এখনও নৌযাত্রায় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করিয়া থাকেন। ঈদের সময় নৌযাত্রায় কখনও কখনও তাহাদের নস্টালজিয়ায় পাইয়া বসে। কেননা নৌপথের ঐতিহ্যের কথা সকলেরই জানা। তাহাছাড়া নৌপরিবহন ব্যবস্থা একটি সাশ্রয়ী, আরামদায়ক ও পরিবেশবান্ধব যোগাযোগ মাধ্যম। এজন্য নৌপথের বিদ্যমান সমস্যাগুলিও সমাধান করা প্রয়োজন। বিশেষত ঈদের সময় এ ব্যাপারে আরও সতর্ক হওয়া দরকার। নৌযানের ত্রুটি দূর করাসহ নৌপথের সংকটও দূর করিতে হইবে। গতকাল ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি খবরে বলা হইয়াছে যে, মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌরুটে আকস্মিকভাবে ছোট ছোট ডুবোচর দেখা দিয়াছে। লৌহজং টার্নিং পয়েন্ট হইতে হাজরা চ্যানেল পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার পথে এই ডুবোচর দেখা যাইতেছে গত এক সপ্তাহ ধরিয়া। অবশ্য ইহাতে এখনও ফেরি চলাচলে বিঘ্ন ঘটে নাই। তবে ঈদে ২১ জেলার ঘরমুখো মানুষ চরে ফেরি আটকা পড়িয়া বিড়ম্বনার শিকার হইতে পারেন বলিয়া আশঙ্কা করা হইতেছে। তাই জরুরি ভিত্তিতে সার্ভে ও ড্রেজিং করা দরকার। উল্লেখ্য, এভাবে চরের কারণে চ্যানেলের গভীরতা বিভিন্ন স্থানে কমিয়া গিয়াছে। ঈদের সময় সেসব স্থানে নৌ পরিবহন কিংবা ফেরি চলাচল নির্বিঘ্ন করার ব্যাপারে সর্বাত্মকভাবে সতর্কতা অবলম্বন করিতে হইবে।
প্রতিবারের ন্যায় এবারও ঈদের আগে চারদিন নিয়মিত ট্রিপের পাশাপাশি বাড়তি ট্রিপ পরিচালনা করিবেন সদরঘাটকেন্দ্রিক লঞ্চ মালিকগণ। সবার আগে সেসব নৌযানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করিতে হইবে। অন্যদিকে বাস ও ট্রেনের ন্যায় লঞ্চের টিকিট লইয়াও প্রতি বত্সর হৈ চৈ হয়। যদিও কেবিন ছাড়া লঞ্চ-ডেকের টিকিট অগ্রিম বিক্রির নিয়ম নাই। তাই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ও পরিস্থিতি এড়াইতে সর্বত্র নিয়ম-শৃঙ্খলা বজায় রাখার চেষ্টা করিতে হইবে। প্রতি বত্সর ঈদ অবকাশে গৃহযাত্রা করিতে নৌযাত্রীরা যে ভোগান্তির শিকার হন তাহা মোটেও কাম্য নহে। লঞ্চডুবির ব্যাপারেও এবার বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করিতে হইবে। লঞ্চের টিকিট কালোবাজারিদের হাতে যাহাতে চলিয়া না যায়, সে ব্যাপারে প্রশাসনকে কঠোর হইতে হইবে। অবশ্য লাইনে দাঁড়াইয়া ও ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করিয়াও টিকিট পাওয়া যায় না অনেক সময়। ইহা এক রূঢ় বাস্তবতা। কেননা জনসংখ্যার তুলনায় আমাদের পরিবহনের সংখ্যা এমনিতেই কম। নৌযানের ক্ষেত্রে ইহা আরও সত্য।
এই অবস্থায় টিকিট মহার্ঘ হইয়া ওঠে। ইহা লইয়া কাড়াকাড়ি থাকিবে না এমন আশা করা বাতুলতা মাত্র। যাত্রীদের এইরূপ সাময়িক চাহিদা মিটাইবার জন্য স্থায়ীভাবে নৌযানের সংখ্যা বাড়াইবার কথা ভাবা যাইতে পারে। তাহাছাড়া এই সেক্টরে সামগ্রিকভাবে বিরাজমান বিশৃঙ্খলার অবসান ঘটাইতে হইবে।
