বর্তমান সরকার বিভিন্ন খাতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়াছে সত্য। কিন্তু তাহাদের সাফল্যের চিত্রটিও উল্লেখ করিবার মতো। আর এই অর্জনের অংশটিতে উজ্জ্বল হইয়া রহিয়াছে শিক্ষা খাতের সাফল্য। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাসমূহ অর্জনে ‘বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রতিবেদন ২০১৩’ শিরোনামের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে দারিদ্র্য পার্থক্য কমানো, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় জেন্ডারসমতা ও শিশুমৃত্যুর হার কমানোসহ বেশকিছু সূচকে বাংলাদেশ আগাইয়া রহিয়াছে। প্রতিবেদনটিতে বলা হইয়াছে, কয়েকটি বিষয়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করিতে পারিলেও বাংলাদেশ পিছাইয়া রহিয়াছে আয়ের বৈষম্য, ক্ষুধাজনিত দারিদ্র্য কমাইয়া আনা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির হার, বয়স্ক শিক্ষার হার বৃদ্ধি, নারীদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বনাঞ্চল বৃদ্ধি ইত্যাদিতে। ২০০২ সালে প্রবর্তিত এমডিজির ৬০টি সূচকের মধ্যে ৩৪ সূচকের লক্ষ্য দেওয়া আছে। ইহার মধ্যে বাংলাদেশ ৯টি অর্জন করিয়াছে এবং ১১টি অর্জনের পথে। বাকিগুলি হয়তো নির্ধারিত সময়ে অর্জন করা সম্ভব নাও হইতে পারে।
শিক্ষা খাতে, বিশেষত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে, বাংলাদেশের অর্জন উল্লেখ করিবার মতো। চার দশকের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও তাহা বাস্তবায়ন, ২৩ কোটি পাঠ্যবই বিনামূল্যে প্রদান, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে লিঙ্গসমতা অর্জন, নূতন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, শিক্ষার গুণগত মান বাড়াইতে সাড়ে তিন লাখ শিক্ষককে প্রশিক্ষণ, ৮০ হাজার নতুন শিক্ষক নিয়োগ, ঝরিয়া পড়িবার হার ৪৮ ভাগ থেকে কমাইয়া ২১ ভাগে নামাইয়া আনাসহ শিক্ষার বিভিন্ন শাখায় উন্নয়ন সাধিত হইয়াছে। কোচিং বাণিজ্য বন্ধে সরকারের তত্পরতাও চোখে পড়িবার মতো।
কিন্তু সম্প্রতি জানা গিয়াছে যে, দেশের প্রতি চার শিশুর একজন স্কুলে যায় না। আর ছয় হইতে ১০ বছর বয়সী প্রায় ২৩ শতাংশ শিশু এখনো স্কুলের বাহিরে থাকিয়া গিয়াছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস) ও ইউনিসেফ সম্মিলিতভাবে ‘শিশু সমতা মানচিত্র: সামাজিক বঞ্চনার ক্ষেত্রসমূহ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এইসব তথ্য জানাইয়াছে। প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে ভালো কাজ করিবার সুনাম রহিয়াছে এমন উপজেলায় ১০ শতাংশ শিশু স্কুলে যায় না। খারাপ মানের উপজেলাগুলোতে এই হার ৪৫ শতাংশ। এই তথ্য নির্দেশ করে যে, অনেক কাজ এখনও বাকি রহিয়াছে, গর্ব করিবার সময় এখনও আসে নাই।
ভবিষ্যতের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়িতে হইলে দেশের প্রতিটি শিশুকেই শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় আনিতে হইবে। শিক্ষায় জেন্ডারসমতা হয়তো অনেকখানি কমিয়াছে, কিন্তু শহর ও গ্রামের শিশুদের মধ্যকার শিক্ষার মানের বৈষম্য এবং সাধারণ-মাদ্রাসা-ইংরেজি মাধ্যম ইত্যাদি নানান রকম শিক্ষাপদ্ধতির উপস্থিতির কারণে শিক্ষা খাতে বৈষম্য থাকিয়াই গিয়াছে। এইরূপ বৈষম্যমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা সমাজের সত্যিকারের অগ্রগতির প্রতিবন্ধকস্বরূপ। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষা খাতে সমতা আনিবার কোনো উদ্যোগও চোখে পড়ে না। বিষয়গুলি সরকার ও নীতিনির্ধারক মহলকে গুরুত্ব দিয়া ভাবিতে হইবে। বিশেষত ২৩ শতাংশ শিশু এখনও স্কুলের বাহিরে থাকিয়া গিয়াছে, ইহা একটি গুরুতর তথ্য। খুব আন্তরিকতার সহিত এই ব্যর্থতার মোকাবিলা করিতে হইবে।
