২০০৬ সালে প্রণীত ‘শ্রম আইন’ সংশোধন করে জাতীয় সংসদে অবশেষে নতুন শ্রম আইন-২০১৩ পাস হয়েছে। সংশোধিত এই শ্রম আইন নিয়ে চলছে তুমুল বিতর্ক। সে বিতর্ক দেশ ছাপিয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। বেশিরভাগ মহলই তার সমালোচনা করছে, তার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ জানাচ্ছে এবং এমনকি এটিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করছে। রাজনৈতিক বা অন্য কোনো ধান্দাবাজির চিন্তা থেকে কেউ কেউ অবশ্য প্রশংসা করছে অথবা সতর্ক মধ্যপন্থা অবলম্বনের ভান ধরেছে।
সংশোধিত শ্রম আইনটি ভালো না খারাপ, গ্রহণযোগ্য না প্রত্যাখ্যানযোগ্য—সে প্রশ্নের কোনো ‘দুই যোগ দুইয়ে চার হয়’-এর মতো নিরপেক্ষ জবাব নেই এবং তা থাকা সম্ভবও নয়। তার কারণ, শ্রম আইনের বিষয়টি হলো সরাসরি শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি বিষয়। সমাজে যদি শ্রমিক শ্রেণির বৈরি অন্য কোনো শ্রেণির উপস্থিতি থাকে তাহলে শ্রমিক স্বার্থ বিষয়ক কোনো পদক্ষেপ বা আইন একই সাথে উভয় পক্ষের জন্য ভালো কিংবা মন্দ হতে পারে না। এক পক্ষের জন্য তা ভালো হতে পারে তখনই, যখন তা অন্য পক্ষের জন্য মন্দ হয়। শ্রেণিবিভক্ত আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজে এরূপ হওয়াটাই অবধারিত। ভালো-মন্দের হিসেব-নিকেশ ভিন্ন-ভিন্ন হলেও, একটি বিশেষ প্রেক্ষাপটে তা কখনো কখনো উভয় পক্ষের কাছে একই সাথে সাময়িকভাবে গ্রহণযোগ্য হতেও পারে। কিন্তু সংশোধিত শ্রম আইনের ক্ষেত্রে সেরকমটি হয়নি। মালিক শ্রেণি সেটিকে গ্রহণযোগ্য বলে সাদরে মেনে নিয়েছে। অন্যদিকে, শ্রমিক শ্রেণি সংশোধিত শ্রম আইনটি সাধারণভাবে প্রত্যাখ্যান করে তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ও আন্দোলন শুরু করেছে। তারা এটিকে ‘কালো আইন’ বলে চিহ্নিত করেছে।
আধুনিক পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের সব আইন-কানুনই প্রণীত হয়ে থাকে রাষ্ট্রের প্রকৃত ক্ষমতাধর, শোষক-শাসক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষার্থে। রাষ্ট্রের এসব হাজার-হাজার আইনের মধ্যে শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার জন্য যে বিশেষায়িত আইনটি রচনা করতে শোষক-শাসকরা বাধ্য হয়, সেটিই হলো শ্রম আইন। শ্রমিকদের কয়েক শতাব্দী ধরে চলতে থাকা আন্দোলন-সংগ্রামের ফলশ্রুতিতেই এরূপ আইন প্রণয়নে তাদেরকে বাধ্য করা গেছে। তাই, সেই বিবেচনায় শ্রম আইনের মূল্যায়নের প্রশ্নে শ্রমিক স্বার্থের বিষয়টিকে সবচেয়ে আগে হিসেবে নেয়াই বাঞ্ছনীয়। আবার সে বিষয়টিকেও দেখতে হবে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির দৃষ্টিকোণ থেকে।
গণতান্ত্রিক শ্রম আইনের জন্য এদেশের শ্রমজীবী মানুষ বহুযুগ ধরে সংগ্রাম করছে। বৃটিশ আমলে শুরু হওয়া সে সংগ্রাম অব্যাহত থেকেছে পাকিস্তানের যুগে এবং তা চলেছে স্বাধীন বাংলাদেশেও। ছাত্র থাকাকালে আমরা নিজেরাও ৬০-এর দশকে ‘অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার’, ‘আইএলও সনদের ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক শ্রম আইন’ ইত্যাদি দাবিতে রাজপথে শ্লোগান তুলেছি ও ১১ দফাসহ আমাদের গুরুত্বপূর্ণ দাবিনামায় সেসব দাবি অন্তর্ভুক্ত করে সংগ্রাম করেছি। শ্রমিক শ্রেণিসহ দেশের বিভিন্ন অংশের মানুষের সংগ্রাম ও গণতান্ত্রিক-প্রগতিবাদী জাতীয় আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে শ্রমজীবী মানুষের ঘরে এক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমে অনেক সাফল্য এসেছে। বৃটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলের এসব সাফল্যকে প্রতিফলিত করে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রবর্তিত হয়েছে ৫০টির মতো আইন। তথাপি, এসব আইনে নানা ত্রুটি ও দুর্বলতা থাকায় শ্রমিকদেরকে সব সময়ই গণতান্ত্রিক শ্রম আইনের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখতে হয়েছে। এক পর্যায়ে আলাদা-আলাদা এসব ৫০টির মতো আইনকে একত্রিত করে একটি একক শ্রম আইন রচনার কথা ওঠে। তারই ফলশ্রুতিতে প্রণীত হয় ২০০৬ সালের শ্রম আইন।
শ্রমিক শ্রেণির সব অতীত অর্জনগুলো ধারণ করে ও প্রয়োজন মতো সেসব সম্প্রসারিত ও গভীরতর করে একক শ্রম আইন প্রণয়নের কথা থাকলেও ২০০৬ সালে ঘটেছে ঠিক বিপরীত ঘটনা। শ্রম আইন-২০০৬ দ্বারা শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়া ও ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার ও সুযোগগুলো উল্টা বরং আরো খর্ব করা হয়েছে। শ্রমিকরা এটিকে একটি অগণতান্ত্রিক ও শ্রমিক স্বার্থবিরোধী আইন বলে আখ্যায়িত করে তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম গড়ে তোলে। এরূপ আইন পাসের জন্য তত্কালীন বিএনপি সরকারকে শ্রমিক স্বার্থের প্রতি বিশ্বাসঘাতক বলে অভিহিত করা হয়। এটিও বেশ মজার একটি বিষয় যে, সে সময় বিএনপি সরকার সংসদে যতো আইন পাস করিয়েছিল আওয়ামী লীগ তার সবগুলোর বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু কেবল দু’টি আইনের ক্ষেত্রে তারা বিরোধিতা করেনি। সে দুটি আইন হলো মন্ত্রী-এমপিদের বেতন-ভাতা-সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি সংক্রান্ত এবং উল্লিখিত শ্রমিক স্বার্থ বিরোধী শ্রম আইন। কিন্তু ২০০৬ সালের শ্রম আইন পাস করার সময় তার বিরোধিতা না করলেও এই আইনের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত শ্রমিকদের ভোট পাওয়ার উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগ ২০০৮-এর নির্বাচনী ইশতেহারে ‘শ্রমনীতি’ শিরোনামের ১৬নং দফার ১৬.১ উপ-দফার শুরুতেই এই মর্মে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, ‘জাতীয় শ্রমনীতি পুনর্মূল্যায়ন ও সংশোধন করা হবে।’
মহাজোট সরকার তার মেয়াদকালের প্রথম ৪ বছর এই প্রতিশ্রুতি রক্ষায় কোনো কার্যকর পদক্ষেপই গ্রহণ করেনি। অবশেষে গত ১৫ জুলাই এ বিষয়ে সংসদে সংশোধিত শ্রম আইন-২০১৩ পাস করা হয়েছে। তার আগে মন্ত্রিসভায় সংশোধনীর খসড়া অনুমোদন করা হয়। তারও আগে প্রস্তাবিত সংশোধনী সম্পর্কে শ্রমিক নেতৃবৃন্দ ও ট্রেড ইউনিয়নগুলোর মতামত গ্রহণ করা হয়। প্রতিটি পর্যায়ে ট্রেড ইউনিয়নসমূহ ও তাদের নেতৃবৃন্দ খসড়ার দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষার্থে কোথায়-কোথায় কি ধরনের পরিবর্তন করা অপরিহার্য তা সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরেন। অন্যদিকে মালিকদের সংগঠনগুলোও মালিকদের স্বার্থ-রক্ষার্থে শ্রমিক অধিকার ক্ষুণ্ন হয় এমন গাদাগাদি সুপারিশ তুলে ধরে। সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে, ট্রেড ইউনিয়নগুলোর কোনো সুপারিশই মানা হবে না, কিন্তু মালিকদের প্রায় সব সুপারিশই মেনে নেয়া হবে। সেভাবেই মন্ত্রিসভায় আইনের খসড়া অনুমোদন করা হয়।
সে সময় বাংলাদেশে শ্রমিকদের অধিকারহীনতা নিয়ে বিশ্বব্যাপী তুমুল প্রচারণা শুরু হয়। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ফলে এই প্রচারণা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য চাপ বাড়তে থাকে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য জিএসপি সুবিধা বাতিল করে দেয়। সংসদে পাস হওয়ার আগে শ্রমিকদের অনুকূলে শ্রম আইনের খসড়া পুনরায় আরো সংশোধন করার জন্য চাপ বাড়তে থাকে। আইএলও-র পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিমত ও সুপারিশ পাঠানো হয়। সরকার বলতে বাধ্য হয় যে, শ্রম আইনের সংশোধনীগুলো আরো সংশোধন করা হবে। চাপের মুখে সামান্য ১/২টি জায়গায় তাত্পর্যহীন কিছু পরিবর্তন এনে বস্তুত মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত শ্রমিক স্বার্থ বিরোধী ও অগণতান্ত্রিক শ্রম আইনই শেষ পর্যন্ত সংসদে পাস করিয়ে নেয়া হয়েছে।
শ্রম আইন-২০১৩ কে শ্রমিক স্বার্থবিরোধী ও অগণতান্ত্রিক বলার কারণ কি? যে কোনো শ্রম আইনের একটি প্রধান বিষয় হলো শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার। আইএলও-র ৮৭ ও ৯৮ কনভেনশন অনুসারে শ্রমিকদের সাধারণভাবে সংঘবদ্ধ হওয়ার, পছন্দমতো সংগঠন করার এবং স্বাধীনভাবে নেতা নির্বাচন করার অধিকার থাকার কথা। ১৯৬৯-এর আগে নিয়ম ছিল, একটি কারখানায় শ্রমিকের সংখ্যা কম-বেশি যাই হোক, ৭ জন শ্রমিক একত্র হলেই ইউনিয়ন গঠন করতে পারবে। কিন্তু শ্রম আইন-২০১৩ অনুসারে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করার জন্য একটি কারখানার মোট কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যে কমপক্ষে ৩০%কে সদস্য হতে হবে। ২০/৩০ হাজার শ্রমিকের বড় বড় গার্মেন্টস কারখানা এখন বাংলাদেশে অনেক। তাদের মধ্যে ৩০%-কে সদস্য করে ট্রেড ইউনিয়ন চালু করাটা মালিকের ‘সহযোগিতা’ ব্যতীত প্রায় দুঃসাধ্য একটি কাজ। ফলে মালিকের দালাল ট্রেড ইউনিয়ন ব্যতীত শ্রমিকদের নিজস্ব ট্রেড ইউনিয়ন গঠন কার্যত অসম্ভব করে তোলা হয়েছে। তাছাড়া, শ্রম আইন-২০১৩ এর ১.৪ ধারার মাধ্যমে অনেক শ্রমিক ও কর্মজীবীকে সোজাসুজি শ্রম আইনের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।
শ্রম আইন-২০১৩ এর ১৭৯ নং ধারায় বলা হয়েছে যে, একটি প্রতিষ্ঠানে ৩টির বেশি ইউনিয়ন থাকতে পারবে না এবং ৩৫ জনের বেশি ইউনিয়ন কর্মকর্তা থাকতে পারবে না। অথচ, আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী কয়টি ইউনিয়ন থাকবে এবং কতজন কর্মকর্তা হবে তা নির্ধারণের অধিকার শ্রমিকদেরই।
পছন্দ মতো ট্রেড ইউনিয়নের নেতা নির্বাচনের সুযোগও খর্ব করা হয়েছে। শ্রম আইন-২০১৩ এর ১৮০ নং ধারা অনুসারে ব্যক্তি মালিকানাধীন কোনো প্রতিষ্ঠানে সেই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিকের বাইরের কাউকে ট্রেড ইউনিয়নের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য করা যাবে না। কেবল রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে এরূপ ব্যক্তির সংখ্যা ১০%-এর মধ্যে রাখার বিষয়ে ‘ছাড়’ দেয়া হয়েছে। ব্যক্তিগত মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই সুযোগ রাখা হয়নি। আগে ট্রেড ইউনিয়ন কমিটির কর্মকর্তারূপে বহিরাগত অশ্রমিক রাখার সীমা ছিল ২৫% এবং সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতে তা প্রযোজ্য ছিল। এখন দুই খাতের জন্য ভিন্ন দুই আইন করা হয়েছে। তা এমনভাবে করা হয়েছে যাতে ব্যক্তি মালিকানাধীন কারখানায় আইন-কানুন জানা দক্ষ লোকজনের নেতৃত্বে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন তত্পরতা পরিচালিত না হতে পারে। মালিক সমিতির কাজের জন্য শিক্ষিত ও দক্ষ প্রশাসক থাকতে পারলে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নের ক্ষেত্রে সে বিষয়ে বিধি নিষেধ থাকবে কেন? একই দেশে একই বিষয়ে দু’রকম আইন থাকবে কেন? এরূপ আইন আসলে কেবল বৈষম্যমূলকই নয়, তা আইএলও কনভেনশনে স্পষ্টভাবে উল্লেখিত নেতৃত্বে নির্বাচনে শ্রমিকদের অবাধ অধিকারের নিশ্চয়তার বরখেলাপও বটে।
ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে নানা শর্ত ও অন্তরায় দাঁড় করিয়ে শ্রম আইন-২০১৩ এর ২০৫ নং ধারায় ‘পার্টিসিপেটারী কমিটি’ বা ‘অংশীদারিত্ব কমিটি’ গঠনের ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। ট্রেড ইউনিয়ন ও নির্বাচিত সিবিএ-র অনুপস্থিতিতে এসব কমিটিকে শ্রমিকদের দাবি দাওয়া নিষ্পত্তির ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। মালিক পক্ষ, সরকার পক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের দ্বারা এই কমিটি গঠিত হবে। শ্রমিক প্রতিনিধিদের আবার ‘উচ্চপদস্থ’ শ্রমিক হতে হবে। এসব কমিটিতে যে তিনটি পক্ষ থাকবে তাদের মধ্যে মালিক পক্ষ ও সরকার পক্ষ আদতে একই পক্ষ হয়ে কাজ করবে। তাছাড়া শ্রমিক প্রতিনিধি নির্বাচনের কোনো সুস্পষ্ট বিধান না থাকায় মালিক পক্ষ প্রয়োজনে তাদের পোষ্য দালালদেরকে শ্রমিক প্রতিনিধি সাজিয়ে যৌথ দরকষাকষির নাটক সাজিয়ে মালিকের স্বার্থ রক্ষা করবে। এ ধরনের ‘মালিক তোষণের কমিটির’ মাধ্যমে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের গণতান্ত্রিক অধিকারকে বাস্তবে কেড়ে নেয়া হবে।
শ্রম আইন-২০১৩-এর ৪.১১ ধারায় আউট সোর্সিং-এর যে বিধান রয়েছে তার ফলে মালিকরা ঠিকাদার দিয়ে কাজ করাতে পারবে। নিয়মিত চাকরি না দিয়েই মালিকরা প্রতিষ্ঠান চালাতে প্রলুব্ধ হবে।
শ্রম আইন-২০১৩ তে ‘নিরাপত্তা কমিটি’ নামক একটি কমিটিতেও শ্রমিক প্রতিনিধি রাখার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই কমিটির কাজ কি হবে তার সুস্পষ্ট উল্লেখ না থাকায় এরূপ আশঙ্কার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, এই কমিটিকে ‘অবাধ্য’ শ্রমিক দমনে কাজে লাগানো হবে।
শ্রম আইন-২০১৩ এর ২৩.৩ ধারায় শ্রমিক কর্তৃক অসদাচরণের বিষয়টি এমনভাবে লেখা হয়েছে যার দ্বারা মালিক ক্ষতিপূরণ ছাড়াই ইচ্ছে মতো যে কোনো শ্রমিককে চাকরিচ্যুত করতে সক্ষম হবে। প্রতিষ্ঠানে উচ্ছৃংখল আচরণ, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, ভাঙচুর, অন্যের কাজে বাধা দান, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ইত্যাদিকে অসদাচরণ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এ ধরনের ঢালাও সংজ্ঞায়নের কারণে কোনো ‘অধিকার সচেতন শ্রমিকের দৌরাত্ম্য’ থেকে ‘রেহাই’ পাওয়ার জন্য নানা কৌশলে বা তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে মালিক তাকে যখন-তখন চাকরিচ্যুত করতে পারবে। অসদাচরণের অভিযোগের কারণে বরখাস্ত হলে সে কোনো ক্ষতিপূরণও পাবে না। এমনকি বিগত দিনের চাকরির কারণে তার প্রাপ্য পাওনা থেকেও সে বঞ্চিত হবে। আইনটির ২৭.৩ ধারায় মালিকের হাতে এমন অধিকার দেয়া হয়েছে যাতে একজন শ্রমিক ১০ দিনের বেশি কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে মালিক সে শ্রমিককে তার সমস্ত পাওনা থেকে বঞ্চিত করতে পারবে।
শ্রম আইন-২০১৩ এর ৪৬ ধারায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে মাতৃত্বকালীন ছুটি হিসেবে ৬ মাস নির্ধারণ করা হলেও তার অর্ধেক সময় ৩ মাস সন্তান প্রসবের আগে ও অবশিষ্ট ৩ মাস সন্তান প্রসবের পরে বলে নির্ধারণ করা হয়েছে। আরো গুরুতর বিষয় হলো রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে এই মাতৃত্বকালীন ছুটি ৬ মাস নির্ধারিত হলেও ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে তার মেয়াদ মাত্র ৪ মাস করা হয়েছে। এর আগে এ বিষয়ে মালিকরা যুক্তি দেখিয়েছিল যে, মাতৃত্বকালীন ছুটি বেশি দিলে জন্মহার বেড়ে যাবে! সরকার সেই কুযুক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।
শ্রম আইন-২০১৩ তে পুরানো কিছু সুবিধা থেকেও শ্রমিকদের বঞ্চিত করা হয়েছে। ১৯৬৮ সালের আইনে, কোনো কারখানা লাভ করলে সেই লভ্যাংশের ৫% অর্থ সেই প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের কল্যাণে ব্যয়ের বিধান ছিল। কিন্তু বর্তমান আইনের ২৩.৪ ধারায় এই লভ্যাংশ একটি শ্রমিক কল্যাণ ফান্ডের মাধ্যমে ব্যয় করার কথা বলা হয়েছে। ফলে একটি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক সেই প্রতিষ্ঠানের মুনাফার ৫% আগের মতো সরাসরি পাবে না। তাদের সেই প্রাপ্য অর্থ যে কেন্দ্রীয় ফান্ডে যাবে, তা প্রকৃতপক্ষে লুটপাটের ও সরকার দলীয় শ্রমিক সংগঠনের মাফিয়াদের লালন-পালনের তহবিলে পরিণত হবে। মালিক একাধারে ট্যাক্স ফাঁকি দেয়ার কায়দায় আয়-ব্যয়ের হিসেব লুকোতে এবং স্থায়ী শ্রমিকের বদলে বদলি শ্রমিক দিয়ে কাজ চালাতে উত্সাহী হবে।
শ্রম আইন-২০১৩ এর ২(১০) ধারায় ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকের ক্ষেত্রে গ্রাচ্যুইটির পরিমাণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় কমিয়ে দেয়া হয়েছে ও শর্ত কঠিন করা হয়েছে। আইনটির ১২৩ (২) ধারায় চাকরি অবসানের পর প্রদেয় মজুরি প্রদানের জন্য ৭ দিনের বদলে ৩০ দিন ধার্য করা হয়েছে।
শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষার জন্য শ্রম আইন প্রণীত হওয়ার কথা। কিন্তু সংশোধিত শ্রম আইনটি শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষা না করে আগের আইনে যেটুকু স্বার্থ রক্ষার ব্যবস্থা ছিল, সেটুকুকেও কমিয়ে দিয়েছে। ২০০৬ সালে বিএনপি শ্রমিক-স্বার্থের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। ২০১৩ সালে আরেক দফা বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনা ঘটলো এবং তা ঘটলো এবার আওয়ামী লীগ ও মহাজোট সরকারের হাতে। প্রমাণিত হলো, দেশের বুর্জোয়া দলগুলো যতো শ্রমিক-দরদীর ভাব দেখান না কেন, তারা সবাই আসলে শ্রমিকের অধিকার ও স্বার্থ হরণে একই রকম সিদ্ধহস্ত। তারা শ্রমিকের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে না, করে মালিকের। ভোটের আগে তারা যে প্রতিশ্রুতি দেয় তার সবটাই হলো লোক-ভোলানো প্রতারণা। তাই, শ্রমিকদেরকে নিজেদের স্বার্থ ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, নিজেদের সংগ্রাম নিজেদেরই করতে হবে। একথা কখনোই ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, ‘জমি বর্গা দেয়া যায়, কিন্তু স্বার্থ কখনো বর্গা দেয়া যায় না।’
লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
E-mail : [email protected]
