রাজধানীসহ দেশের বড় বড় শহরে এ সময়ে যে ভয়াবহ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে, সেটিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও ব্যবসা বেড়ে উঠার ফল বলেও বিবেচনা করা যায়। অর্থনীতিবিদরা বিষয়টিকে এভাবেই দেখতে চাইবেন। আর ব্যবসায়ীরা তো বটেই। কারণ কেনাকাটা নিয়ে মানুষের এমন ব্যস্ততায় তারা লাভবান হচ্ছেন। রমজানের শুরু থেকেই এবার ঈদের বাজার জমে উঠেছে রাজধানীতে। দেশের আরও কিছু শহর থেকেও ঈদ শপিংয়ে যানজট সৃষ্টির খবর পাওয়া যাচ্ছে। ১৫ রোজা পরবর্তী সময়টায় এটা আরও বাড়বে বলেই মনে হয়। মাসের শেষে বেতন পেয়ে গেলে লোকে আরও বেশি করে ছুটবে কেনাকাটায়। নিজের জন্য যত না, তারচেয়ে বেশি পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য। লোকে আজকাল উপহারও কম দিচ্ছে না। ঈদ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে জাকাতের কাপড় কেনার প্রবণতাও বাড়বে। রমজানে সাধারণভাবে বেড়ে যায় খাদ্যপণ্যের চাহিদাও। বাড়ে এর ব্যবসা তথা পণ্য পরিবহন। এজন্যও যানজট বাড়ে। এ সময় দেশজুড়ে বেড়ে যায় মানুষের সচলতা। ঈদ যত নিকটবর্তী হবে লোকে তত বেশি যাবে গ্রামের দিকে। শপিংসহ নানা উদ্দেশ্যে মানুষ কিন্তু এখন বেশি করে আসছে শহরে। রাজধানীসহ বড় বড় শহরে বেড়ে উঠেছে দরিদ্রদের উপস্থিতি। রিকশা ও ভ্যানচালকের সংখ্যা নিশ্চিতভাবে বেড়ে গেছে এর মধ্যে। একটু বেশি ভাড়া হাঁকছে তারা এখন। কত মানুষ স্রেফ ভিক্ষা করতে চলে এসেছে শহরে, কে রাখে তার খবর। এরাও যানজট সৃষ্টি করছে। এ সময় দেশের স্কুল-কলেজে চলছে ছুটি। তা না হলে যানজট পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটতো। বিপুলসংখ্যক লোক এখন আবার ব্যস্ত হয়ে পড়বে বাস-ট্রেন-লঞ্চের টিকিট সংগ্রহে। বাসের টিকিট না পেলে ছুটবে তারা ট্রেন স্টেশন বা সদরঘাটে। এ ছোটাছুটিও যানজট আরও বাড়িয়ে তুলবে। রাজধানীতে যানজটের কারণে সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছা সম্ভব হয় না অনেক ক্ষেত্রেই। এক কর্মদিবসে একাধিক কাজ সাঙ্গ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এটা আরও বাড়বে এখন। আরও বেশি করে বিঘ্নিত হবে অফিস-আদালতের কাজ; সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য। রাস্তায় লোকজন যদি আটকে থাকে অস্বাভাবিক দীর্ঘ সময় ধরে, তাহলে ব্যবসায়ীরা পাবেন কম ক্রেতা। যত দিন যাবে, ততই আরও বেশি রাত পর্যন্ত দোকানপাট খোলা রাখা হবে অবশ্য। প্রশাসন এতে বাধা দেবে না। তাদের বরং বলা হবে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুত্ জুগিয়ে যেতে। ব্যবসায়ীদের উপর চাঁদাবাজি যেন না হয় সে দাবিও জানাবে সবাই। মহাসড়কে দুর্বৃত্তপনা বন্ধের দাবি থাকবে। এ সময় বড় ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটে, এমনকি ব্যাংকে টাকা জমা দিতে যাওয়ার সময়। ব্যাংকিং কার্যক্রম বেড়ে উঠাও এখন যানজট অসহনীয় হয়ে উঠার একটা কারণ।
রোজার শুরুতে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে থাকা দুইটি মামলা ঘিরে পরপর চারদিন সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডাকে জামায়াতে ইসলামী। হরতাল তেমন একটা হয়নি; তবে ঈদ শপিং ব্যাহত হয়েছে এতে। রমজানের শুরু থেকেই শপিং জমে উঠেছে বলে যারা ওই চারদিন যেতে পারেননি তারা অস্থির হয়ে কেনাকাটা করেছেন পরবর্তী ক’দিন। মনে হয়তো আতংকও ছিল, সামনে আরও হরতাল ডাকা হবে কিনা। যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াত-শিবির যেমন আচরণ করছে, তাতে এদের উপর লোকের আস্থা কম। এ অনাস্থাও প্রতিফলিত হয়েছে ব্যস্তসমস্ত হয়ে এই ক’দিনের ঈদ শপিংয়ে। পাইকাররাও একই সময় রাজধানীতে ছিলেন পণ্যসামগ্রী সংগ্রহ করে এলাকায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। যানজটে তাদের মূল্যবান সময়ও কম নষ্ট হয়নি। মফস্বল শহরে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে তারা পণ্যসামগ্রী জোগাবেন এখন। মধ্যস্বত্বভোগী হলেও অর্থনীতিতে এদের ভূমিকা বিরাট। তারা যত বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারবেন, তৃণমূল থেকে তত কম লোক আসবে শহরে—ঈদের কেনাকাটায়। রাজধানীর পার্শ্ববর্তী জেলা ও উন্নত শহরগুলোয় বেশ কিছু শপিং সেন্টার অবশ্য গড়ে উঠেছে সাম্প্রতিক বছরগুলোয়। সেসব ঘিরে ক্রেতার ভিড় বেড়ে উঠার খবর কিন্তু রাজধানীবাসীর জন্য ইতিবাচক। স্থানীয় পর্যায়ে কেনাকাটা সেরে নিতে পারলে অনেকেই আর আগের মতো রাজধানীমুখী হবেন না। এখানে যানজট একটু ছড়িয়ে গিয়ে সহনীয়ও হয়ে পড়তো, যদি রাজধানীর অন্য প্রান্তে কিছু পাইকারি বাজার গড়ে তুলতে পারতাম আমরা। আমাদের প্রায় সব পাইকারি বাজার পুরোনো ঢাকার দিকে। এজন্য স্বাভাবিক সময়ও ওখানে থাকে তীব্র যানজট। ঈদের বাজারে এটা স্বভাবতই বেড়েছে। পুরোনো ঢাকার লোকজন অবশ্য ঈদ শপিংয়ে শামিল হন দেরিতে। তাদের যারা ব্যবসায়ী, তারা ঐতিহ্যগতভাবে কেনাকাটা করেন ‘চানরাতে’। ওই সময়টায় রাজধানী ফাঁকা হয়ে যায়। এবার যেমন যানজট মোকাবিলা করতে হচ্ছে, তাতে নতুন ঢাকাবাসীর অনেকেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন দেরিতে শপিংয়ে যাওয়ার। শেষদিকে অবশ্য পছন্দসই জিনিসপত্র মেলে না। ঈদ শপিংয়ে দামের দিকে লক্ষ্য থাকে কম; বেশিরভাগ মানুষ চায় বেশি দামে হলেও পছন্দের জিনিসটি কিনতে। এই কেনাকাটা সত্যি আনন্দের হয়ে উঠতো লোকে যদি পেত একটা স্বাভাবিক পরিবেশ। এর বদলে রাজধানীসহ বড় বড় শহরের রাস্তাঘাটে যে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে, তাতে ঈদ শপিং হয়ে উঠেছে একটা দায়িত্ব পালনের ব্যাপার। কেনাকাটা শেষ হলেই যেন লোকে বাঁচে!
রোজায় এমন যানজট সৃষ্টি তো আর হঠাত্ করে হয়নি। ঢাকা কেবল প্রশাসনিক কেন্দ্র নয়, এটা একই সঙ্গে আমাদের শিল্প-বাণিজ্যের কেন্দ্র। একটা দেশের রাজধানীতে যেভাবে শ্রমঘন গার্মেন্ট শিল্প কেন্দ্রীভূত হতে দেয়া হয়েছে, তাতেই বোঝা যায় এখানকার শাসকগোষ্ঠী কতটা অদূরদর্শী। দ্রুত প্রসারিত সেবা খাতকেও কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে এখানে। নতুন রাস্তাঘাট কম বানানো হলেও গাড়ির সংখ্যা ও চলাচল কোনোটাই নিয়ন্ত্রণ করা হয়নি। মাথার উপর দিয়ে রাস্তাও তৈরি হচ্ছে এতদিন পর—সমস্যা যখন সংকটে পরিণত। এক সময় আমরা উদ্বিগ্ন হতাম রাজপথে রিকশা ও ভ্যানের মতো অযান্ত্রিক বাহনের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি দেখে। সিটি করপোরেশন থেকে অনেকদিন ধরেই আর লাইসেন্স দেয়া হচ্ছে না; তা সত্ত্বেও বেড়ে চলেছে এগুলো। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রাইভেট কারের বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ। নীতিনির্ধারকরা এক সময় দামের দিক দিয়ে একে সহজলভ্য করারও ব্যবস্থা করেছিলেন। প্রাইভেট কারে সিএনজি ব্যবহারের সুযোগ দিয়েও এর সংখ্যা দ্রুত বাড়িয়ে তোলা হয়। অনেক সম্পন্ন পরিবারে একাধিক কার ব্যবহারের প্রবণতাও গড়ে উঠে এতে। রাজধানীতে অপরিকল্পিতভাবে প্রতিষ্ঠিত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল-ক্লিনিক, কমিউনিটি ও শপিং সেন্টার আর খাবারের দোকানের সামনে গাড়ির ভিড় দেখে বোঝা যায় একশ্রেণির লোকের হাতে প্রচুর টাকা এসেছে। কিভাবে এসেছে সেটা দেখার দায়িত্ব অবশ্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও দুর্নীতি দমন কমিশনের। রিকশার পর প্রাইভেট কারের অতিব্যবহারে এখানে যে নতুন করে যানজট সৃষ্টি হলো, সেটাও তো দেখতে হবে। একা পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ এ দায়িত্ব পালন করতে পারবে বলে মনে হয় না। দেশের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের ব্যাপার হয়ে উঠেছে এটি। সে কারণেই বোধ হয় ঈদের বাজারে যানজট নিয়ে আলোচনা চলার সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে করণীয়ের একটি তালিকা দিয়েছে ট্রাফিক বিভাগ। স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কিছু কর্তব্যকর্ম স্থির করেছেন তারা যানজট মোকাবিলায়। খবরটি মিডিয়ায় এসেছে বলে এখানে আর নতুন করে তুলে ধরতে চাই না। এসব কাঙ্ক্ষিত পদক্ষেপের কথা সাধারণ মানুষেরও জানা হয়ে গেছে এর মধ্যে।
ঈদের বাজারে যানজট সহনীয় করে আনতে ‘কঠিন’ কোনো পদক্ষেপ এখন নেয়া হবে বলে মনে হচ্ছে না। ‘রাজনৈতিকভাবে সঠিক’ তো হবেই না, অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও হকার বা অবৈধ রিকশা উচ্ছেদের মতো কাজ সমর্থন পাবে না এখন। উদারভাবে প্রাইভেট কার বাড়তে দেয়ার পর ওই কাজে হাত দেয়াটা নৈতিকভাবেও কঠিন হয়ে পড়েছে। কার মালিকরা অবশ্য বলতে পারেন তাদের জন্য কয়টা বহুতল পার্কিং প্লেসের ব্যবস্থা করেছে সরকার? সব শপিং সেন্টার আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেও বাধ্য করা হয়নি পার্কিং প্লেস রাখতে। যেখানে এ ধরনের প্লেস রয়েছে, সেখানে আবার টাকার বিনিময়ে গাড়ি রাখায় অনাগ্রহ দেখা যায় অনেকের মধ্যে। এরা ভালো করেই জানেন, আইন নাগাল পাবে না তাদের। ঈদের বাজারে পুরোনো ঢাকায় দেখছি রিকশা ও ভ্যানের দাপট আর ভিআইপি রোডে হাজার হাজার গাড়ির সারি। একসঙ্গে (ও কম খরচে) অনেক মানুষ বহনে সক্ষম বড় বাস এর মধ্যে হাতে গোনা যায়। প্রাইভেট কারের বদলে এগুলো বাড়িয়ে তোলার কথা কত না বলা হয়েছে! ঈদের বাজারে অবর্ণনীয় দুর্দশায় পড়ে কার মালিকরাও হয়তো এখন সেসব মনে করবেন। তাদের দোষ দেয়া যায় না, দোষ নীতিনির্ধারকদের। কেবল উত্পাদনমূলক ও ব্যবসায়িক কাজে গাড়ির ব্যবহার উত্সাহিত করে তাদের দায়িত্ব ছিল পাবলিক ট্রান্সপোর্ট বা গণপরিবহন বাড়িয়ে তোলা। পাশাপাশি রিকশাসহ অযান্ত্রিক যানের সংখ্যা কমানো। সংখ্যা না কমিয়ে এগুলোর চলাচল নিয়ন্ত্রণ কোনো কাজের কথা নয়। এতে শুধু নন-ভিআইপি রোডে যানজট বেড়েছে। সৃষ্টি হয়েছে বৈষম্য ও বিদ্বেষ। এর পাশাপাশি ফুটপাতের ধারণাটাই নিঃশেষ করে দেয়া হয়েছে। ফুটপাত অনেকদিন ধরেই হাঁটাচলার নয়, যথেচ্ছাচারের জায়গা। এটি ধ্বংস হয়ে গেছে বলেও লোকে এখন হাঁটাপথে রিকশা নেয়। রিকশার ভাড়াও অবিশ্বাস্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মেজাজ ঠিক রাখতে সিএনজিচালিত স্কুটারের কথা এখানে না তোলাই ভালো। ঈদের বাজারে এসব যানের চালকও কম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন না। যানজটের কারণে তারা এখন আবার মিটারে যাওয়াটা পছন্দ করছেন। সম্প্রতি এ লেখকের এক বন্ধুকে ডাক্তার ধরার জন্য দুপুর রোদে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে হয়েছে কয়েক কিলোমিটার যানজটে তার বাহনটি ফেলে। এটা এখন অনেকেরই অভিজ্ঞতা। এদের মধ্যে নেতা-এমপি এবং পদস্থ আমলাও থাকবেন। জাতীয় পতাকা উড়িয়ে ও শৃঙ্খলা বাহিনীর এসকর্ট নিয়ে যারা চলেন, তাদের কথা অবশ্য আলাদা। এই তীব্র যানজটে সাধারণের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে তারা স্বেচ্ছায় আটকে থাকবেন, এমনটি তো আর আশা করা যায় না। অফিস আওয়ারে নিতান্ত প্রয়োজন হলে তারা এখন বরং পারেন হেলিকপ্টারে চলাচল করতে (কিছু ধনাঢ্য ও ব্যস্ত ব্যবসায়ী এটা শুরু করেছেন)। এতে সরকারের খরচ বাড়লেও ক্ষতি নেই বোধ হয়। ঈদের বাজারে লাখ লাখ মানুষ তাদের কারণেও দীর্ঘ সময় রাজপথে আটকে থাকলে ক্ষতি হবে এরচেয়ে অনেক বেশি।
লেখক :সাংবাদিক
[email protected]
