সরকারি দল সমর্থিত চিকিত্সকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিত্সক পরিষদের (স্বাচিপ) একটি গ্রুপের ভয়ে দুই সপ্তাহ ধরিয়া হাসপাতাল ছাড়িয়া পালাইয়া বেড়াইতেছেন ঢাকা শিশু হাসপাতালের পরিচালক। উল্লেখ্য, একই চক্রের দাপটের ঝাপটায় ব্যবস্থাপনা বোর্ডের চেয়ারম্যান গত মার্চে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করিয়া হাসপাতালটিকে বিপদে ফেলিয়া গিয়াছিলেন। আর এখন পরিচালকের অনুপস্থিতির কারণে শিশু রোগ চিকিত্সায় দেশের সবচাইতে বড় ও বিশেষায়িত এই হাসপাতালের নৈমিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা কর্মকাণ্ড গুরুতর সঙ্কটে নিপতিত হইয়াছে। বন্ধ রহিয়াছে হাসপাতালের জরুরি ক্রয়, জনবল নিয়োগ, বাজেট অনুমোদন, ব্যাংক হিসাব ব্যবস্থাপনাসহ প্রায় সকল গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম। ঔষধ-পথ্য বাকিতে ক্রয় করিতে হইতেছে; উপরন্তু, চলতি মাস শেষে রোগীদের খাদ্য সরবরাহও অনিশ্চয়তার মুখে পড়িবে। একাধিকবার এইসব বিষয় মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হইলেও কোনো সুরাহা দেখিতেছেন না হাসপাতালটির চিকিত্সক-কর্মচারীরা। এমনিতেই দেশের স্বাস্থ্য খাতের বেহাল-বিশৃঙ্খল দশার কারণে জনগণকে নিয়মিত নাকাল হইতে হয়, তাহার উপরে সরকার পরিচালিত মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালগুলির এইরূপ অচলাবস্থা কিছুতেই মানিয়া লওয়া যায় না।
অভিযোগ রহিয়াছে, এই হাসপাতাল শাখা স্বাচিপের সভাপতি ও সম্পাদক অনেক দিন ধরিয়াই কেনাকাটা, নিয়োগ, ঠিকাদারি এবং হাসপাতালের কেন্টিনের ইজারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিবার চেষ্টা করিয়াছেন। কিন্তু ব্যবস্থাপনা বোর্ডের বেশিরভাগ সদস্যের শক্ত অবস্থানের ফলে অনেক ক্ষেত্রেই তাহারা ফায়দা লুটিতে পারেন নাই। ফলে, কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাহাদের বিরোধ অনিবার্য হইয়া উঠিয়াছিল। তাহাদের ক্ষুব্ধ আচরণের মুখেই ব্যবস্থাপনা বোর্ডের চেয়ারম্যান গত মার্চ মাসে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করিয়াছিলেন। আর এখন নূতন চেয়ারম্যান নিয়োগে তাহাদের পছন্দের প্রার্থীর নাম প্রস্তাব না করিবার খেসারত দিতে পরিচালককেও আসন ছাড়িয়া পালাইতে হইয়াছে। এই হট্টগোলে গত ছয় মাস ধরিয়া প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা বোর্ডের সভা হয়নি। জরুরি ভিত্তিতে সঙ্কট নিরসনের জন্য বোর্ডের নূতন চেয়ারম্যান নিয়োগদান তো দূরের কথা, এতোকাল ধরিয়া বোর্ডের চেয়ারম্যান নিয়োগবিধি কিংবা বোর্ডের মেয়াদকাল কী হইবে তাহাও মন্ত্রণালয় হইতে নির্ধারণ করা হয়নি। ফলে জন্মলগ্ন হইতেই সরকার দলীয় নেতাদের মর্জির উপর নির্ভর করিয়া শিশু হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কর্মকাণ্ড চলিতেছে।
১৯৭৪ সালে রাজধানীতে শিশুদের চিকিত্সা দিতে ঢাকা শিশু হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠিত হয়। আজ এই হাসপাতালটিতে শিশুদের হূদরোগের সকল ধরনের সার্জারি, এনজিওগ্রাম ও ডিএনএ পরীক্ষাসহ অত্যাধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিত্সা সেবাদানের প্রতিষ্ঠান হইতে পারিয়াছে। কিন্তু, সম্পূর্ণরূপে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বত্সরের পর বত্সর এই হাসপাতালের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করিয়া আছে। ফলে, যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে, সেই সরকারের দলীয় চিকিত্সক ও কর্মচারীদের দাপটে হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মন্ত্রণালয় হইতে চেয়ারম্যান মনোনয়নের বিষয়টি চূড়ান্ত করা উচিত। নয়তো হাসপাতালটির অচলাবস্থা কাটিবে না। বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিমান হইতে শুরু করিয়া স্বায়ত্তশাসিত অনেক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অবস্থাই অনুরূপ। অচলাবস্থা, কারচুপি, দলীয়করণ এবং সরকারি দলের মেজাজ-মর্জি সামাল দিতেই প্রতিষ্ঠানগুলির নাভিশ্বাস উঠিয়া যায়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বদলের সঙ্গে সঙ্গে লুটিয়া খাইবার দলের পরিবর্তন ছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলির ভাগ্যে আর কোনো হেরফের ঘটে না। ফলে, জনগণের সেবা ও উন্নয়নের জন্য এই সকল প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হইলেও তাহাদের কপালে জুটিতেছে নিয়মিত দুর্ভোগ, যদিও তাহাদের পকেটের পয়সাতেই চলে সরকার নিয়ন্ত্রিত এই সকল প্রতিষ্ঠান। স্বাধীনতার চার দশক পার হইয়া গেলেও এই রাষ্ট্রের সেবা-প্রতিষ্ঠানগুলি সুষ্ঠু ও নিয়মমাফিক চালাইবার মতো রাজনৈতিক সংস্কৃতি আমরা গড়িয়া তুলিতে পারি নাই—জাতি হিসেবে ইহা আমাদের অত্যন্ত লজ্জা ও দুঃখের কথা।
