আজ ৩০ জুলাই। আন্তর্জাতিক বন্ধু দিবস। পৃথিবীতে মানুষ একা থাকতে চায় না। চায় সংগ। এই সংগ থেকেই সৃষ্টি হয়েছে ঘরের। আর এক ঘরের লোকের সংগে অন্য ঘরের লোকদের সর্ম্পকের কারণে সমাজ গড়ে উঠেছে। মানুষ মিলেমিশে চলতে চেষ্টা করে সমাজে।
এই সমাজের ভেতর থেকে বন্ধুত্ব গড়ে উঠে সমবয়সী মানুষের। ছোট-বড় সবার বন্ধু থাকে। যদি কারো বন্ধু না থাকে আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে তার বন্ধু নেই কেন? আসলে বন্ধু থাকাটাই স্বাভাবিক। বন্ধুর জন্য বন্ধুর অনুভব ক্ষমতা থাকে প্রবল। এ প্রসংগে উল্লেখ্য, ১৯৩৫ সালের আগস্টের প্রথম শনিবার আমেরিকায় এক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। নিহত ব্যক্তির বন্ধু এতই মর্মাহত হন যে, পরদিন রবিবার তিনিও আত্মহত্যা করেন। আমেরিকায় ঘটনাটি সাড়া ফেলে। আমেরিকান কংগ্রেস এই দিবসটিকে বন্ধু দিবসের ঘোষণা দেয়। এর আগে হলমার্কের প্রতিষ্ঠাতা জয়েস হল ১৯১৯ সালে বন্ধু দিবসের ঘোষণা দেন বলে অনেকে মনে করেন। আবার ১৯৫৮ সালের ৩০ জুলাই বন্ধু দিবস নির্ধারণ করে প্যারাগুয়ে সরকার। এভাবে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দেশ বন্ধু দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১১ সালে জাতিসংঘ ৩০ জুলাইকে ‘আন্তর্জাতিক বন্ধু দিবস’ হিসেবে ঘোষণা দেয়।
বিশ্বায়নের মূলমন্ত্র বন্ধুত্ব। কোন দেশ স্বয়ংসম্পন্ন নয়। পারস্পরিক আদান- প্রদানের মাধ্যমে এর পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়। বন্ধুত্ব সম্পর্কের কারণে পৃথিবী ছোট হয়ে আসছে। এগিয়ে আসছে একজন আরেকজনের প্রয়োজনে। মানুষে মানুষে গড়ে উঠছে সেতুবন্ধন। আদান-প্রদান হচ্ছে সংস্কৃতির। এক দেশের সমস্যা সমাধানে পথনির্দেশ দেয় তার বন্ধু দেশ।
বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে আছে সবাই; কিন্তু বন্ধুত্ব করার কৌশল জানা থাকতে হবে।
ব্যক্তিগত জীবনে বন্ধু গ্রহণে সমস্যা আছে। যার-তার সাথে বন্ধুত্ব করা যায় না। যদি বন্ধু বাছাই ভালো না হয় তাহলে উপকারের চেয়ে অপকার বেশি হয়। একজনকে অন্যজনের ভালোলাগা, কথায়, কাজে মিল থাকা প্রভৃতি বন্ধুত্বের মাপকাঠি বলা যায়। দুইজনের বন্ধুত্বের বড় উপাদান সততা। বন্ধুকে ভালোবাসতে হবে। তা না হলে ঠুনকো সম্পর্ক যাবে ভেঙ্গে। বাড়িতে বাবা-মা, ভাই-বোনের সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক, বন্ধুত্ব এসবের বাইরে। এখানে আত্মার সম্পর্ক। সম্পর্ক বিশ্বাসের। ছোট্ট শিশুটি মা-বাবা, ভাই-বোনের বাইরেও বন্ধু খোঁজে। এই বন্ধুর গুরুত্ব তার কাছে অনেক বেশি। স্কুলেও তারা বন্ধু খুঁজে নেয়। পড়াশুনা করতে গিয়ে বন্ধুদের নিয়েই তারা চলে। একজন মানুষের অনেক রকমের বন্ধু থাকে—স্কুলের বন্ধু, কলেজের বন্ধু, ভার্সিটির বন্ধু, অফিসের বন্ধু, বার্ধক্যে হাঁটার বন্ধু।
মানুষের জীবনে একজন ভালো বন্ধুর ভীষণ প্রয়োজন। জীবনটা ফুল বিছানো পথে নয়। দুঃখ, কষ্ট, সুখে অতিবাহিত হয় এ জীবন। মানুষের ভেতরে জমা হয় অনেক কষ্ট। সেসব কথা একমাত্র বন্ধুকে বলা যায়। বন্ধু পারে সান্ত্বনার বাণী দিয়ে তার কষ্ট ভুলিয়ে দিতে। মানুষ যখন এসব কথা কাউকে বলতে পারে না তখনই অসুস্থ হয়ে পড়ে।
আবার সুখের দিনেও বন্ধু পাশে থাকে। বিয়ে, জন্মদিনে বন্ধু না হলে জমেই না। বন্ধুর প্রভাব পড়ে পরিবেশে। ভালো বন্ধুর আড্ডায় সৃষ্টি হয় ভালো কিছু। বন্ধুদের আড্ডায় বসে লাভ হয়। লেখক মুজতবা আলীর কথায়-‘আমি ভালবাসি চায়ের দোকানটি। সেখানে সকাল-সন্ধ্যা হাজিরা দিই। পাড়ার পটলা, হাবুল আসে। সবাই মিলে বিড়ি ফুঁকে গোষ্ঠী-সুখ অনুভব করি আর উজির নাজির মারি। আমার যা কিছু জ্ঞানগম্মি তা আড্ডারই ঝরতি- পড়তি মাল কুড়িয়ে নিয়ে।’
বন্ধুত্বের প্রভাব পড়েছে সারা বিশ্বে। নতুন নতুন উপায়ে বন্ধুত্ব লাভ হচ্ছে। বর্তমানে ফেসবুক বন্ধু খোঁজার নতুন মাধ্যম। ভূমিকা রাখছে মোবাইল ফোনও। আগে ইচ্ছে করলেই বন্ধুর সংগে যোগাযোগ করা সম্ভব হতো না। এখন বন্ধুত্বের পথ সুগম করে দিয়েছে মোবাইল ফোন। উপহার দেয়া-নেয়া বন্ধু দিবসের একটা সুন্দর রীতি। আজ ৩০ জুলাই বন্ধু দিবসের স্মরণে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে বন্ধুরা উপহার বিনিময় করবে। তাই বলতে ইচ্ছে করে—
বন্ধু দিবসে মনের আলোতে
জ্বালিয়ে বন্ধুদীপ
দুর্গম পথ পাড়ি দিতে পারি
কপালে রক্তিম টিপ।
লেখক : কথাসাহিত্যিক
