অর্থনীতি

আমাদের স্বপ্ন, জীবন-জীবিকা

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০১৩, ২১:৪৬
আমাদের দেশে নগরায়ন বিস্তৃতির ক্ষেত্রে উপজেলা ব্যবস্থা প্রবর্তনের একটি বিরাট ভূমিকা রয়েছে। তাছাড়া, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, বিদ্যুত্ ব্যবস্থার প্রসার এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ছোঁয়া নগরায়নকে বিস্তৃত করে। ফলে, বিভিন্ন পেশাজীবীর সংখ্যাও বাড়তে থাকে। শুধু তাই নয়, এর ফলে পেশাজীবীরা আলাদা একটি শক্তি হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করে। গ্রামে ভূমিহীনের সংখ্যা বাড়ার ফলে এই ভূমিহীনেরা পাড়ি জমায় শহরে। এজন্যেই শহরে ভাসমান শ্রমিক এবং স্বকর্মজীবীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। তাছাড়া, গার্মেন্টস, এসেম্বলিং জাতীয় শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় শিল্পশ্রমিকের সংখ্যাও শহরে বাড়তে থাকে। এভাবেই বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীরা বড় একটি শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। স্বাভাবিকভাবেই সামাজিক-অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়ে। উত্পাদন খাতসমূহের ওপর অনুত্পাদক ফড়িয়া, পাইকার শ্রেণী গোষ্ঠীর আধিপত্য, সম্পদের ওপর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণের অভাব, ভূমি ব্যবস্থা, উত্পাদিকা শক্তির শ্লথগতি, অনুত্পাদনশীল খাতে ব্যয় বৃদ্ধি এবং কমিশন এজেন্টদের আধিপত্য বিস্তারের ফলে আমদানি ও বিদেশি সাহায্যের ওপর আমাদের নির্ভরশীলতাও বাড়তে থাকে। পাশাপাশি, হতে থাকে জাতীয় সম্পদের বিপুল অপচয়। এসব প্রতিবন্ধকতা ও প্রতিকূলতা দূর করার জন্যে আমরা কোনো ব্যবস্থা নিতে পারিনি। কারণ, এর জন্যে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়। বলাবাহুল্য, এ দাঁড়াবার শক্তি আমাদের কখনোই ছিলো না, এখনো নেই। এর জন্যে যে সব কর্মসূচি দেয়া দরকার, সে সব কর্মসূচিও আমরা দিতে পারিনি। আমরা আমাদের আর্থ-সামাজিক কর্মকাণ্ডে ব্যাপক জনগণের সম্পৃক্তি এখনো নিশ্চিত করতে পারিনি। রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর জনগণের আস্থারও অভাব রয়েছে। বিরাষ্ট্রীয়করণের নামে আশির দশকের শুরুতে যে লুটপাট শুরু হয়েছিলো, সে লুটপাট এখনো বন্ধ হয়নি। শ্রমজীবী মানুষেরা বাঁচার মতো মজুরিও পাচ্ছে না। কৃষকেরা পাচ্ছে না ফসলের উত্পাদন ব্যয়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ মূল্য, যথোপযুক্ত দৃষ্টি প্রদান করা সম্ভব হয়নি কৃষি উত্পাদন উপকরণে, ক্ষেতমজুরেরাও ন্যূনতম মজুরি পায়নি। সার্বজনীন শিক্ষা আমরা এখনো নিশ্চিত করতে পারিনি। উত্পাদনশীল খাতের সম্প্রসারণ ঘটিয়ে যথাযথ কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব হয়নি আমাদের দেশে। বিনিয়োগসহ সকল ক্ষেত্রে বৃহত্ পুঁজিবাদী দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণ থেকে আমরা মুক্তিলাভ করতে পারিনি। এখনো আমরা অপ্রয়োজনীয় আমদানি বন্ধ করতে পারিনি। তেল, গ্যাসসহ দেশীয় সম্পদের ওপর আমরা এখনো জাতীয় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারিনি। জাতি হিসেবে নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরা গ্রহণ করতে পারিনি আমরা। সর্বস্তরে গণতন্ত্র ও নিশ্চিত হয়নি এদেশে, বন্ধ হয়নি সম্পদের পাচার। এটিতো আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমাদের সামাজিক-রাজনৈতিক বিন্যাসে মৌলিক কিছু পরিবর্তন দরকার। আমাদের সমাজের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও দাবি-দাওয়ার মধ্যে বৈপ্লবিক রূপান্তরের তাগিদ প্রচ্ছন্নভাবে হলেও রয়েছে। আমাদের দেশের কোনো কোনো রাজনৈতিক দল চরম লেজুড়বৃত্তি ও দেউলিয়াত্ব দ্বারা পরিচয় সংকটে জর্জরিত। আমরা ভুলে যাই যে, সমাজ ব্যবস্থায় প্রতিটি ব্যক্তির সাথে অন্যের সম্পর্ক ‘কনট্রাক্টভিত্তিক’। সমস্ত সম্পর্ক বাণিজ্যিক চুক্তিতে আবদ্ধ। আমাদের এটিও মনে রাখতে হবে যে, মানবিক সম্পর্কগুলো নানা কবুলিয়ত-পাট্টায় চাপা। সাধারণ মানুষ বার বার ভোট দিয়েও কোনো ফায়দা পায়নি জীবন-জীবিকার ক্ষেত্রে। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে যে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করা সম্ভব, সে রাজনৈতিক স্বাধীনতা আমাদের দেশে এখনো আসেনি। আর অর্থনৈতিক স্বাধীনতাতো লুটপাটের চিত্র অঙ্কন করে কখনোই সম্ভব নয়। ফলে, এদেশে না আছে রাজনৈতিক স্বাধীনতা, না আছে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। কারণ, মানুষের স্বাধীনতা না থাকলে কোনো স্বাধীনতাই থাকে না। লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট e-mail: [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন