গণতন্ত্রের জনপ্রিয় ধারণাটি হচ্ছে এটি জনগণের শাসন। এই শাসন ব্যবস্থায় জনগণই সকল ক্ষমতার মালিক। বাংলাদেশে ১৯৯১ সাল থেকে ২০০৭-২০০৮ এই দুই বছর বাদ দিলে গণতান্ত্রিক শাসনের বয়স প্রায় বিশ বছর। যদিও এর পূর্বে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ এর ২৫ শে জানুয়ারির পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশে আরও প্রায় দুই বছরের জন্য গণতান্ত্রিক শাসন চালু ছিল। সর্বমোট বাংলাদেশের গণতন্ত্রের বয়স প্রায় দুই যুগের কাছাকাছি। এই দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের দু’টি ধারা স্পষ্ট হয়েছে। প্রথমটির চরিত্র শাসক শ্রেণি কেন্দ্রিক, যেখানে শাসক শ্রেণি নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে গণতন্ত্রকে ব্যবহার করে। যদিও শাসক শ্রেণি নিজেদেরকে প্রমাণ করতে চায় যে, তারা জনগণের ক্ষমতায়নের জন্যই গণতন্ত্র চর্চা করছে। লক্ষ্য করুন, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলনের বিষয়টিতে। এই দাবির পেছনে আওয়ামী লীগ ও বি.এন.পি’র স্বার্থের বন্ধন এক জায়গায় গাঁথা, তা হলো রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল। ক্ষমতাসীন দলের কাছে এই দাবি না মানার পেছনে দলটির ক্ষমতায় টিকে থাকা যে গুরুত্বপূর্ণ তা সকলের কাছে দিবালোকের মত পরিষ্কার।
সংসদীয় ব্যবস্থার দীর্ঘকালীন ঐতিহ্য হচ্ছে নির্বাচন কমিশনই অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান করে থাকে। অথচ নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সকল ধরনের ক্ষমতা দিয়ে শক্তিশালী করতে দু’দলের কোনটিরই আগ্রহ নেই। দলীয় কর্তৃত্বের বাইরে স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে নির্বাচন করে জনগণের সার্বভৌমত্বকে প্রতিষ্ঠা করতে দল দুটো চায় না। এ যাবত্কাল শাসক শ্রেণি কেন্দ্রিক গণতন্ত্র তাই জনগণের ক্ষমতায়নের সত্যিকার স্ফুরণ ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিতে তারা এক পা এগিয়েছে, আবার দু’পা পিছিয়েছে। জনগণের ক্ষমতাকে জনকল্যাণের উপায় হিসেবে সত্যিকার অর্থে ব্যবহার না করে নিজেদের গোষ্ঠী স্বার্থ আদায়ের লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেয়ার ফলে শাসক শ্রেণির-গণতন্ত্র জনগণের দুঃখ-দুর্দশা বাড়িয়েছে, তাদের পালিত কর্মসূচি হরতালের কারণে নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, দেশের অর্থনীতি হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত।
শাসক শ্রেণি নির্ভর বাংলাদেশের গণতন্ত্রে নেতৃত্বের মাঝে জাতীয়তা বোধের ঘাটতি একটি বড় সংকট। বিশ্বায়নের প্রভাব এবং সেই সাথে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের তাগিদ জাতীয় নেতৃত্বকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংকটে ফেলে দেয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনগণের অংশগ্রহণকে গুরুত্বহীন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সংসদকে ব্যবহার না করে অনেক চুক্তি করার নজির আমাদের সামনে রয়েছে। সম্ভবত, আমলা / মন্ত্রিরাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে TICFA চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেবেন। সংসদকে এ বিষয়ে শুধুমাত্র সাক্ষী গোপাল হিসেবে রাখা হতে পারে।
গণতন্ত্রের দ্বিতীয় ধারাটিকে আমরা নাম দিতে চাই প্রতিবাদী ও জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্র। এই গণতন্ত্রের কেন্দ্রে রয়েছে শাসক শ্রেণির অন্যায় ও বৈষম্যমূলক আচরণের প্রতিবাদ করার মাধ্যমে তাদের আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করা, জনগণের স্বার্থের অনুকূলে শাসক শ্রেণিকে সাড়া দিতে বাধ্য করা। বাস্তবতা হচ্ছে, এটি প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রকে অস্বীকার করে না বরং প্রতিনিধিত্বের কেতাবী ধারণাকে নতুনভাবে আমাদের সামনে তুলে ধরে। সরকারের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য এই ধারণায় পার্লামেন্টের ভূমিকাই একমাত্র নির্ধারক নয়। সরকারের অন্যায় কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ ও সমালোচনায় গণমাধ্যম, সিভিল সমাজের প্রতিষ্ঠানসমূহও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এমনকি জনগণের বিভিন্ন অংশের তাত্ক্ষণিকভাবে সংগঠিত প্রতিবাদও শাসক শ্রেণির আচরণকে নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই প্রতিবাদ, সমালোচনা জনগণের সার্বভৌমত্ব বা গণতন্ত্রের চেতনাকে সজীব রাখে। কখনও কখনও শাসক শ্রেণির কোন একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধেও এই প্রতিবাদ সংগঠিত হতে পারে। গণতন্ত্রের ভাষায় এই প্রতিবাদ ও সমালোচনা রাষ্ট্রের ক্ষমতায় জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণেরই সূচক। সামপ্রতিক সময়ে বি.সি.এস. পরীক্ষার্থীদের ৫৬ শতাংশ কোটা নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন প্রতিবাদী এবং জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্রেরই এক রূপ। এই প্রতিবাদের ফলে পি.এস.সি. কে এর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে হয়েছে।
গার্মেন্টস শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরির জন্য আন্দোলন করেছে। এই আন্দোলন ছিল একচেটিয়া মুনাফার খোর মালিকদের বিরুদ্ধে। এই বৈষম্য কমাতে সরকার/গার্মেন্টস এর মালিক পক্ষ অনেকবারই সাড়া দিতে বাধ্য হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটের পল্লী বিদ্যুত্ এর বিরুদ্ধে সেখানকার মানুষের প্রতিবাদের কথা আমাদের সকলেরই স্মৃতিতে ভাস্কর। সেখানে পল্লী বিদ্যুতের দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্থানীয় জনগণ রুখে দাঁড়িয়েছিল। সে সময় ঐ এলাকার এম.পি. এই প্রতিবাদকে আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে। জনগণের এ ধরনের সংগঠিত প্রতিবাদ, বাংলাদেশে গণতন্ত্রের একটি সম্ভাবনাময় দিক। শাসক শ্রেণির গণতন্ত্রের চেহারা কখনও অস্বচ্ছ হয়। যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার রায়ে আমরা এই অস্বচ্ছতা দেখতে পাই। কাদের মোল্লার রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের স্বচ্ছতার বিষয়টিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে গণজাগরণ মঞ্চ। এই মঞ্চ থেকে তরুণ প্রজন্ম রাষ্ট্রকে স্বচ্ছতার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক যুদ্ধাপরাধিদের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের সুযোগের অনুপস্থিতির কারণে নতুন করে যুদ্ধাপরাধের আইন সংশোধন করে রাষ্ট্রপক্ষ আপিলের সুযোগ রাখা হয়।
বাস্তবতা হচ্ছে অন্যায়-বৈষম্যের বিরুদ্ধে দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর অস্বচ্ছ অবস্থান, রাজনৈতিক দলের ভূমিকার উপর জনগণের আস্থাকে অনেকাংশেই হ্রাস করেছে। ফলে প্রতিবাদের জায়গাগুলোতে জনগণের বিভিন্ন অংশ নিজেরাই অবস্থান তৈরি করে নিচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আরও নিবে।
বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অপার সম্ভাবনাময় জায়গা পর্দার অন্তরালেই রয়ে গেছে। শাসক-শ্রেণি নির্ভর গণতান্ত্রিক রাজনীতি তার অনুগত শ্রেণি সৃষ্টির রাজনৈতিক সংস্কৃতির মাধ্যমে এ দেশের ছাত্র-রাজনীতিকে কেবলমাত্র লেজুড়বৃত্তিতে নিয়োজিত করেছে। এই শ্রেণিটি ১৯৫২, ১৯৬৬-এর স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন, ১৯৬৮-এর ১১-দফা, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে এবং স্বাধীন বাংলাদেশে সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেছে। সুশীল সমাজের (বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, সমাজকর্মী) একটি ক্ষুদ্র অংশ রয়েছে যারা সরকারের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মুখর। কিন্তু, এর বড় অংশটিই দলীয় রাজনীতির অতি রাজনীতিকরণের কারণে শিকার। অতি রাজনীতিকরণের কারণে সুশীল সমাজের এই বৃহত্ অংশটিই তাদের যথার্থ ভূমিকা রাখতে সফল হয় না। রাষ্ট্রীয় নির্যাতন, সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ভয় উপরোক্ত শ্রেণিকে প্রতিবাদী হতে উত্সাহিত করে না। অথচ এই সচেতন শ্রেণিটিই বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এই শক্তিগুলো যখন স্বকীয় সত্তায় জেগে উঠবে, তখনই বাংলাদেশের শাসক শ্রেণি নির্ভর গণতান্ত্রিক ধারায় গুণগত পরিবর্তন আসতে বাধ্য। কেননা, বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে পরিবর্তনের মূল শক্তিই হচ্ছে ছাত্র/যুবক শ্রেণি।
তাই বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে শুধুমাত্র শাসক শ্রেণির চোখ দিয়ে দেখলে সত্যিকার গণতন্ত্রের চেহারাটিকে আমরা ধরতে পারবো না। গণতন্ত্রের বাস্তব চেহারাটিকে বুঝতে হলে অবশ্যই আমাদেরকে প্রতিবাদী এবং জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্রের ধারাটিকে বিবেচনায় আনতে হবে।
লেখক :সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
