দালান নির্মাণে বিল্ডিং কোড মেনে চলা

আপডেট : ৩১ জুলাই ২০১৩, ২১:৫৪
সাভার রানা প্লাজা ধসের পর বিল্ডিং কোড এখন আলোচনার পাদপীঠে। বিল্ডিং ধসে পড়া, হেলে পড়া বা বিল্ডিংয়ে আগুন লেগে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেই চলেছে। ২০১২ সালের নভেম্বরে আশুলিয়ায় তাজরীন ফ্যাশন্স ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের দগদগে ক্ষত না শুকাতেই আমাদের জাতীয় জীবনে নেমে এল সাভার ট্র্যাজেডির মতো আরেক ট্র্যাজেডি, যা এগারশ’-এর অধিক গার্মেন্টস শ্রমিকের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। হাজারো জীবনের হঠাত্ লাশ হওয়া দেখে বেদনাসিক্ত হয়েছে পুরো জাতি। আলোর খুব কাছাকাছি এসেও অন্ধকারের গহীনে স্তব্ধ হয়ে গেছে শাহিনার জীবনের শেষ স্পন্দন। অনেকে পংগু হয়ে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণাক্লিষ্ট ব্যথায় কাতরাচ্ছে। মর্মস্পর্শী এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে দেশের প্রকৌশলী, স্থপতি ও নাগরিক সমাজে বিল্ডিং কোড মেনে দালান নির্মাণের ব্যাপারে সরব আওয়াজ উঠেছে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, কোড প্রকাশের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এর প্রয়োগে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি আজও। দালান নির্মাণে আমরা খুব কমই বিল্ডিং কোড মেনে চলি। ফলে কিছুদিন পরপর হয় আগুনে পুড়ে, না হয় বিল্ডিং ধসে ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে শত শত তাজা প্রাণ অকালে মৃত্যুবরণ করে। লোভ-লালসায় মত্ত হয়ে নিয়ম ভাঙে একশ্রেণি আর তার দায় শোধ করে আরেক শ্রেণি, সর্বোচ্চ মূল্যে, জীবনের বিনিময়ে। এ অবস্থা কারুরই কাম্য নয়। সহস্রাধিক শ্রমিকের মৃত্যুশোকের উপর ভর করে আমাদের এখনই শিক্ষা নিতে হবে। ঘটনার ভয়াবহতা সময়ের টানেলে বিলীন হওয়ার আগেই দালান নির্মাণে বিল্ডিং কোডের প্রয়োগ বাধ্যতামূলক করতে হবে। বিল্ডিং কোড বলতে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড, যা সংক্ষেপে বিএনবিসি নামে পরিচিত। দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষিত বিবেচনায় রেখে দালান ডিজাইন, নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত এই কোড প্রস্তুত করা হয়েছে। এটি প্রণয়নে প্রকৌশলীদের পেশাগত সংস্থা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ (আইইবি) সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। এর প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৯৩ সালে, যা ইতিমধ্যে দেশের দালান নির্মাণ শিল্পে এক মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। কোড প্রস্তুতের ক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী দেশ ও বেশ কয়েকটি পাশ্চাত্য দেশের কোড বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করে দেশের চলমান প্রযুুক্তির ধারা ও কৌশল বিবেচনায় আনা হয়েছে। দেশে বিরাজমান আর্থ-সামাজিক অবস্থা, প্রযুক্তিগত সামর্থ্য, পরিবেশ, আবহাওয়া, ভূ-তত্ত্ব ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের সাথে খাপ খাইয়ে কোড প্রস্তুতের জন্য ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। বিগত বহু বছরের আবহাওয়া সংক্রান্ত তথ্যাদি যেমন-বাতাসের গতিবেগ, বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ইত্যাদি বিশ্লেষণ করে দালানের প্লান ও ডিজাইন স্পেসিফিকেশন প্রস্তুত করা হয়েছে। এতদঞ্চলের শত শত বছরের ভূমিকম্পের তথ্যাদির ভিত্তিতে দেশের ভূ-তাত্ত্বিক ও জিওটেকনিক বৈশিষ্ট্যের সাথে সম্পর্ক নির্ণয় করে বাংলাদেশের অঞ্চলভিত্তিক একটি সিজমিক ম্যাপ তৈরি করা হয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ মেট্রোপলিটান শহরগুলোতে জমির স্বল্পতাহেতু গড়ে উঠছে গগনচুম্বী অট্টালিকা। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার আবাসন চাহিদা মেটাতে নির্মিত হচ্ছে সুউচ্চ এপার্টমেন্ট ভবন। যত্রতত্র গড়ে উঠেছে গার্মেন্টস কারখানা। অথচ এসব ভবনের ফায়ার সেফটি সিকিউরিটি নিশ্চিতকরণের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে না। কাজেই প্রতিনিয়ত অগ্নিঝুঁকির মধ্যেই আমরা বসবাস করছি। এ থেকে মুক্তি পেতে কোডে দালান পরিকল্পনা, ডিজাইন ও নির্মাণ পদ্ধতিতে অগ্নিকাণ্ডের বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা হয়েছে। বিল্ডিং কোডে দালানের অগ্নিপ্রতিরোধ ও নির্বাপণ সংক্রান্ত উপায়সমূহকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। দালানের আগুন প্রতিরোধ ও বিস্তৃতিরোধ। দালান নির্মাণে অগ্নিনিরোধক পদার্থ ব্যবহার ছাড়াও দালান এমনভাবে পরিকল্পনা করতে হবে যাতে আগুন লাগলে দ্রুত আশপাশে ছড়িয়ে পড়তে না পারে। প্রতিটি কক্ষ এমনভাবে নির্মাণ করতে হবে যেন তা কিছু সময়ের জন্য আগুন ধরে রাখতে পারে। সিঁড়িঘর, লিফট গহ্বর ইত্যাদি অগ্নিকাণ্ডের সময় যাতে আগুন আটকে রাখার খাড়া কম্পার্টমেন্ট হিসেবে কাজ করতে পারে দালান পরিকল্পনা ও নির্মাণে সেটিও খেয়াল রাখা প্রয়োজন। অগ্নিকাণ্ডের সময় জীবনরক্ষার্থে দ্রুত দালান থেকে বেরিয়ে আসার উপায়। অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হওয়ার সাথে সাথে দালান ব্যবহারকারিগণকে সতর্কীকরণ ও বাইরের সহযোগিতা আহ্বানের জন্য বিপদসংকেত প্রদানের ম্যানুয়াল বা স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা রাখতে হবে। দালানের করিডোরের আকৃতি, সিঁড়ির প্রশস্ততা ও অবস্থান এমন হওয়া উচিত, যাতে অগ্নিকাণ্ডের সময় নিরাপদ বহির্গমন পথ হিসেবে ব্যবহূত হতে পারে। ব্যবহারকারীর সংখ্যা অনুযায়ী দালানে পর্যাপ্ত বহির্গমন পথ, করিডোর, সিঁড়ি ইত্যাদি থাকা আবশ্যক। দালানের ভিতরে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রপাতি ও ব্যবস্থাদি স্থাপন। দালানের বিভিন্ন স্থানে বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রপাতি স্থাপন করতে হবে। এগুলো শুধু স্থাপন করলেই চলবে না, অপারেশন পদ্ধতিও জেনে নিতে হবে। বহুতলবিশিষ্ট দালানের ক্ষেত্রে অগ্নিনির্বাপণের জন্য ভূ-গর্ভস্থ জলাধার নির্মাণ করে সার্বক্ষণিক পানি ভর্তি রাখতে হবে। বিদ্যমান সুবিধাদি বিবেচনায় রেখে বিল্ডিং কোডে যুক্তিযুক্তভাবে অগ্নিপ্রতিরোধ স্ট্যান্ডার্ড নির্ধারণসহ বিভিন্ন ধরনের দালানের বহির্গমন পথ সংক্রান্ত প্রশস্ততা, সিঁড়ির অবস্থান ইত্যাদি বিশদভাবে নির্ণয় করা হয়েছে। অগ্নি দুর্ঘটনায় প্রাণহানি রোধে হাইরাইজ দালানের ফায়ার ড্রিল ও ইভাকুয়েশন পদ্ধতির দিকনির্দেশনা দেয়া আছে। অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে শিল্প-কারখানা ও গোডাউনের ভেন্ট, ফায়ার ডিটেকশন পদ্ধতি এবং কুড়ি মিটারের অধিক উচ্চতার দালানের ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যবস্থাদির উল্লেখসহ ফায়ার এলার্ম পদ্ধতি সম্পর্কে স্ট্যান্ডার্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। কাঠামো ডিজাইন যা দালানের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করে সেটি করতে হবে মাটির ধরন বিবেচনা করে। দালানের শ্রেণি ও অবস্থান অনুযায়ী ডেড লোড, লাইভ লোড ও এনভায়রনমেন্টাল লোড বিবেচনা করে দালান কাঠামো ডিজাইন করা হয়। ডেড লোড হচ্ছে দালানের বিভিন্ন অংগ যেমন-বিম, স্লাব, কলাম ইত্যাদির নিজস্ব ওজন। ব্যবহারের ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের দালান ডিজাইনের ক্ষেত্রে লাইভ লোডের পরিমাণ ভিন্ন ভিন্ন বিবেচনা করা হয়, যার টেবিল বিল্ডিং কোডে সন্নিবেশ করা আছে। দালানে স্থাপিত মেশিনারির ভাইব্রেশন্স ও ইমপ্যাক্ট অতিরিক্ত লাইভ লোড হিসাবে ধরা হয়, যা ডাইনামিক এনালিসিস করে নিরূপণ করা হয়। এনভায়রনমেন্টাল লোড যথা-বায়ুপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত, ভূমিকম্প ইত্যাদি নির্ণয়ের জন্য বিশ্বাসযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে বায়ুর গতিবেগ মানচিত্র, বৃষ্টিপাত মানচিত্র ও একটি সংশোধিত সিজমিক জোনিং ম্যাপ তৈরি করা হয়েছে। সিজমিক ম্যাপ অনুযায়ী সারাদেশকে তিনটি জোনে ভাগ করা হয়েছে। জোন-১ সবচেয়ে কম ভূমিকম্পপ্রবণ, জোন-২ মধ্যম ও জোন-৩ সবচেয়ে বেশি ভূমিকম্পপ্রবণ । ভূমিকম্প লোড নির্ণয়ে জোন-২-এর ভূমিকম্প সহাংক জোন-১-এর দ্বিগুণ এবং জোন-৩-এর ভূমিকম্প সহাংক জোন-১-এর প্রায় তিনগুণ ধরা হয়। কোডে দালানের শ্রেণি ও অবস্থান অনুযায়ী লোড নিরূপণ, দালান ডিজাইনের পদ্ধতি ও স্ট্যান্ডার্ডসমূহ নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্মাণ কাজ চলাকালে জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। যে কোন অবহেলার কারণে ঘটতে পারে ছোটখাট অথবা বড় কোন দুর্ঘটনা। বাংলাদেশের নির্মাণ শিল্প ব্যাপকভিত্তিক শ্রমনির্ভর বিধায় এসব দুর্ঘটনার ফলে সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির সাথে মানুষের হতাহত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। নির্মাণকালে সম্পদ এবং জনসাধারণ ও কর্মরত শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের দায়িত্বসমূহ কোডে অন্তর্ভুক্ত আছে। এছাড়া নিরাপদ ও বিজ্ঞানসম্মতভাবে দালান ভেঙে ফেলার উপায়সমূহ বিধৃত করা হয়েছে। দালান ব্যবহার উপযোগী করার জন্য বিভিন্ন ধরনের সার্ভিস যথা-বৈদ্যুতিক, যান্ত্রিক, এক্যুস্টিকস, স্যানিটারী, পানি, গ্যাস ইত্যাদি দরকার হয়। কোড এসব সার্ভিস স্থাপনে ন্যূনতম স্ট্যান্ডার্ড নির্ধারণ করেছে। এয়ারকন্ডিশনিং, হিটিং ও ভেন্টিলেশন, লিফট, এসকেলেটর ও মুভিংওয়াক, প্লাম্বিং ও স্যানিটেশন ইত্যাদির খুঁটিনাটি কোডে উল্লেখিত আছে। প্রযুক্তি সদা গতিশীল। এটি প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল ও অগ্রসরমান, যা বিল্ডিং কোডের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। প্রযুক্তি উন্নয়নের সাথে সাথে সময়ের চাহিদা মেটাতে কোড আপডেটিং ও সংশোধনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পেশাজীবীদের লাগাতার পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশমালা সংগ্রহ এবং পরীক্ষাপূর্বক কোডের পরবর্তী সংস্করণে অন্তর্ভুক্তির জন্য হাউজ বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের আওতায় একটি সেল কাজ করে যাচ্ছে। অসংখ্য টেবিল, গ্রাফ ও চিত্রে সমৃদ্ধ এই কোড বাংলাদেশের নির্মাণ শিল্পে বিরাজমান বিশৃংখলা রোধে পুরোপুরি সক্ষম। নির্মাণ শিল্পে বিনিয়োগকৃত অর্থের অপচয় হ্রাস, দালানের স্থায়িত্ব ও ব্যবহার উপযোগিতা বৃদ্ধি, ভবন ধস, অগ্নিকাণ্ড, ভূমিকম্প ইত্যাদি দুর্যোগ মোকাবিলাসহ সার্বিকভাবে জনকল্যাণে এর গুরুত্ব অপরিসীম। এজন্য এটিকে আইনে পরিণত করে সরকারের একটি প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় এর বাস্তবায়ন আশু প্রয়োজন। কোড প্রয়োগকারী প্রশাসনিক কাঠামোর বিন্যাস ও বিল্ডিং অফিসিয়ালদের ক্ষমতা এবং কর্তব্য সম্পর্কে বিল্ডিং কোডেই ধারণা দেয়া আছে। উপযুক্ত প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় দালান নির্মাণে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডের প্রয়োগ নিশ্চিতকরণ করা এখন সময়ের দাবি। জাতীয় প্রয়োজনে এ দাবি উপেক্ষা করার জো নেই। লেখক :তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, যশোর গণপূর্ত সার্কেল ও চেয়ারম্যান, আইইবি, যশোর কেন্দ্র

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন