কোটা নয়, মেধাবীদের স্থান করে দিতে হবে
বর্তমান সময়ে কোটা নিয়ে চলছে নানা বিতর্ক। আমার মতে এর কারণ মূলত দুটি। প্রথমত, কোটার কষাঘাতে সাধারণ মেধাবীরা বঞ্চিত হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, এই কোটার অনাবশ্যকতা। এজন্য বর্তমানে কোটা পদ্ধতির পুনর্মূল্যায়ন ও পুনর্বিন্যাশ করা যেতে পারে। যেমন মুক্তিযোদ্ধা কোটার চাকরি প্রার্থীদের সংখ্যা এতই কম যে, প্রায় প্রতিটি চাকরিতে তাদের জন্য পদ শূন্যও থাকে। অর্থাত্ জনগোষ্ঠীকে মেধাবী করে তুলতে অবকাঠামোগত পরিবর্তন করতে হবে, সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে। অন্য দিকে কোটা পদ্ধতিও আবার একদিনে তিরোহিত হবে না। কেননা কোটা বাতিলের দাবিতে আজ যেমন আন্দোলন হচ্ছে, তা কার্যকর হলে পরের দিন তা বহালের জন্য আন্দোলন হবে। তাই কোটার হার কমিয়ে (১৫%-২০%) এ আনা যেতে পারে যার মধ্যে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ৭%-১০% উপজাতি ৫%। ও প্রতিবন্ধী ১-৩% থাকতে পারে। তা না হলে কোটার নামে অযোগ্য, কম মেধাবী ও ফাঁকিবাজদের সরকারি চাকরিতে নিয়োগ করা হলে জাতির উন্নতি তো হবেই না বরং জাতি নিপতিত হবে অন্ধকারে যেখানে দুর্নীতি, দায়িত্বহীনতা ও অপশাসন বিরাজমান।
মো. তৌহিদুল ইসলাম
মাস্টার্স, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা,
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
সরকারি চাকরিতে কোটার প্রয়োজন আছে
৩৪তম বিসিএস এর ফল প্রকাশের পর দেশে একটি ঝটিকা আন্দোলন হয়ে গেল। আন্দোলনটি হলো কোটা বিরোধীদের ও কোটাধারীদের। কোটা বিরোধীদের দাবি, কোটা নয়, মেধার ভিত্তিতে চাকরি, আর কোটাধারীদের দাবি ৫৬ ভাগ কোটা বহাল রাখা। ব্যাপারটা খুব স্পর্শকাতর। এই নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর বিপরীত অবস্থান বিষয়টা আরো ঘোলাটে করছে। দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানে ২৯ নং অনুষদের (৩) এর ক খ ও গ’তে যা বলা হয়েছে তা কোটাধারীদের পক্ষে স্বাস্থ্যগত। কিন্তু ২৯ অনুচ্ছেদ অন্তর্ভুক্ত ১৯৭২ সাল আজ থেকে প্রায় ৪২ বছর পূর্বে। ১৯৭২ সাল ও ২০১৩ সালের অর্থনীতি, রাজনীতি ও শিক্ষার পার্থক্য যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। ২০১৩ সালের অর্থনীতি সমীক্ষা অনুযায়ী শিক্ষার হার ৫৭.৯%। যার মধ্যে পুরুষ ৬১.১% ও নারী ৫৪.৮%। এই সামান্য পার্থক্যের কারণে নারীদের ১০% কোটা কতটা যুক্তিযুক্ত তা বোধগম্য নয়। মুক্তিযোদ্ধাদের ৩০% কোটা সবচেয়ে বড় চক্ষুশূল। হওয়ারই কথা। মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান স্বীকার করতে কোন দ্বিধা নেই। এর জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের সুযোগ-সুবিধা দ্বিগুণ করলে কারো চক্ষুশূল হওয়ার কথা নয়। কিন্তু এর মানে এই নয় যে তাদের তিন পুরুষ অর্থাত্ তাদের নাতি-নাতনিরা এই সুযোগ ভোগ করবে।
মিসা রহমান
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,
৪র্থ বর্ষ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
সরকারি চাকরিতে মেধার মূল্যায়ন করতে হবে
বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় সরকারি চাকরিতে কোটা। সংবিধানের দেয়া ছাড়পত্রের দোহাই দিয়ে ‘অনগ্রসর’ অংশকে চাকরি নামক সোনার হরিণ তুলে দেয়ার ব্যবস্থা অনেক আগে থেকেই এদেশে চালু রয়েছে। কিন্তু সেই অনগ্রসরদেরকে প্রকৃত অর্থে এই সুবিধা দিয়ে কোন লাভ হয়েছে কি না, কেউ ভেবে দেখেনি। এ দেশে শুধু সংবিধানে উল্লেখিত কোটা চালু নেই। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীদের ‘সুপারিশ’ চাকরির বাজারকে গরম করে রেখেছে। স্বাধীনতার বীর যোদ্ধাদের জন্য কোটা রয়েছে। তাদের সন্তান-সন্ততি সেই সুবিধা পেয়েছেন এতদিন। কিন্তু বিষয়টা আজ নাতি-নাতনিতে পৌঁছেছে। বিপত্তিটা এখানেই। আবার এই কোটা পদ্ধতির ব্যাপক ‘সদ্ব্যবহার’ করেছেন অনেক প্রভাবশালী। তবে কোটা পদ্ধতি বাতিল করাটা কিছুটা অন্যায়ই হবে। ভাবা উচিত তাদের কথাও যাদের বাড়ির অন্তত পাঁচ কি. মি.-এর মধ্যে কোন স্কুল, কলেজ নেই। বিদ্যুত্, পানির সুবিধা তো পায়ই না। এই সকল সুবিধাবঞ্চিত মানুষ হোঁচট খেয়ে খেয়ে সামনে আসেন। কোটা পদ্ধতি কিছুটা হলেও সাহায্য করবে তাদেরকে। যে অন্ধ মানুষটি সব বাধা অতিক্রম করে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পার হন, আমরা কী তাদের জন্য কোটা রাখবো না? তবে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, সেগুলোর যাতে সঠিক ব্যবহার হয়। খুব সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের ‘কোটাবিরোধী’ আন্দোলন সত্যিই যৌক্তিক এবং সময়োপযোগী। এ অবস্থায় সরকারের উচিত মেধাবীদের চাকরির নিশ্চয়তা দিতে, দুর্নীতি বন্ধ করা এবং কোটা পদ্ধতির সংস্কার ও সঠিক প্রয়োগ।
মো. মেহেদী হাসান সজল
বিজ্ঞান বিভাগ, ২য় বর্ষ,
নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজ, রাজশাহী
কোটার ভিত্তিতে নিয়োগ দিয়ে দক্ষ ও মেধাবী জনপ্রশাসন গড়ে তোলা সম্ভব নয়
কোটার একটি ঐতিহাসিক পটভূমি রয়েছে। কোটা ব্যবস্থা হঠাত্ করে প্রবর্তন করা হয়েছে তা কিন্তু নয়। তবে এখনকার মতো সব স্তরে বাস্তবতার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণভাবে বিশাল আকারের কোটা কখনই ছিল না। দেখা যাচ্ছে, যাদের জন্য বিশাল কোটা সংরক্ষণ করা হচ্ছে তাদের মধ্যে সে সংখ্যক পরীক্ষায় পাস করা প্রার্থীই পাওয়া যায় না। ফলে পদ থাকে শূন্য। বঞ্চিত হচ্ছেন যোগ্য প্রার্থী। আমি মনে করি, কোটা ব্যবস্থা থাকা উচিত। তবে বর্তমানে যে মেধার ভিত্তিতে চাকরি প্রাপ্তির সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে ৪৫ শতাংশে এই পরিমাণ আমাদের জন্য শুভ নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব সেটির সুফল-কুফল বিবেচনা করে নিয়মিত পুনর্বিন্যাস বা পর্যালোচনা করা। কোটার ভিত্তিতে নিয়োগ ৫৫ শতাংশ রাখার প্রয়োজন আছে কিনা এর সুফল-কুফল বিবেচনা করা সরকারের উচিত। আমি মনে করি, কোটার ভিত্তিতে নিয়োগ দিয়ে দক্ষ ও মেধাবী জনপ্রশাসন গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
মো. সামিউল হক
অনার্স ১ম বর্ষ, হিসাব বিজ্ঞান বিভাগ,
তেজগাঁও কলেজ, ঢাকা
