[ রা জ নী তি ]

ইদানিং সভা-সমিতি ও টক শো

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০১৩, ২১:৩৬
জনগণ সেই লোকদের পছন্দ করে না যারা ‘গাঁয় মানে না আপনি মোড়ল’ গোছের। স্যুটেড-বুটেড বা ধোপদুরস্ত পোশাকে আবৃত হয়ে যারা চোস্ত ইংরেজি-বাংরেজি আওড়ান তারা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হন না। তাই টিভির পর্দায় যখন এরা নীতির কথা বলেন, আদর্শের বান বইয়ে দেন তখন জনতা মুখ টিপে হাসে। হাসে এ জন্য যে, ঐ অতি উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিরা তাদেরকে মূর্খ ভাবছে, অর্ধশিক্ষিত ভাবছে, যা কিনা কোন অবস্থাতেই তারা নয়। যে রিকশা চালক বা কৃষক-শ্রমিককে এরা অবজ্ঞাসূচক দৃষ্টিতে দেখে তাদেরকেই আবার স্বার্থোদ্ধারের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহারের জন্য টক শোতে কত না কথার ফুলঝুরি বর্ষণ করে এরা! রাজনীতি নিয়ে চায়ের কাপে ঝড় তুলতে যারা ওস্তাদ তাদের অনেককে আজকাল আবার সভা-সমিতি সেমিনার ও রাত্রিকালীন টিভি টক শোগুলোতে বেশ বড় ধরনের সাইমুম টর্নেডো বা সুনামী ঘটানোর চেষ্টায় প্রাণপাত করতে দেখা যাচ্ছে। দেশ-জাতি ও রাষ্ট্র নিয়ে এদের ‘দুর্ভাবনার’ শেষ নেই, তাই দেশ-জাতি উদ্ধারে প্রায় রাতেই টকশোতে এরা এমন সব নোস্খা বাতলে চলেন যার সঙ্গে গণতন্ত্রের কোন মিল খুঁজে পাওয়া ভার। অথচ, গণতন্ত্র ‘প্রতিষ্ঠার’ নামেই এরা এসব অবলীলায় করে চলেছেন। বাংলাদেশের রাজনীতি যে ধারায় চলছে তাতে অনেকেরই উষ্মা থাকা অস্বাভাবিক নয়। এ নিয়ে মতপার্থক্য থাকা এবং যার যার মত প্রকাশের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকাটাই গণতন্ত্র বিকাশের সহায়ক। যদিও গণতন্ত্র বলতে শুধু বাক বা মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে বোঝায় না। গণতন্ত্র হচ্ছে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর ও ব্যক্তি স্বাধীনতা ও তার অধিকারসমূহের নিশ্চয়তা। কিন্তু মত প্রকাশের স্বাধীনতার সুযোগকে কেউ যদি যাকে যা ইচ্ছা তাই বলার স্বাধীনতা মনে করেন তবেতো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মন-মানস এবং মতলব বা উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক! আমরা সভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও টিভি, টক শোগুলিতে কিছু কিছু বুদ্ধিজীবী বা ‘থিং ট্যাংকদের’কে দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি যে ধরনের অশালীন বিষোদ্গার করতে দেখি তাতে প্রমাদ না গুণে পারা যায় কী। যারা গণতন্ত্র বিষয়ে ঐসব টক শোতে জাতিকে সবক দেবার চেষ্টা এবং ঔদ্ধত্বপূর্ণভাবে হাতে তুড়ি মেরে টেবিল চাপড়ে নেতৃত্বকে বিদায় করেন তারা যে কত অজ্ঞ তা তিনি বা তার পার্শ্বচরেরা জানেন না। তাছাড়াও তাদের অনেকেরই ব্যক্তিগত জীবনে কিংবা পারিবারিক বা সামাজিক জীবনাচরণে গণতন্ত্রের সামান্যতম সাক্ষাত্ মেলে না। কিন্তু তদসত্ত্বেও দেশের মানুষকে গণতন্ত্র কি ও কেন বিষয়ে স্যোত্সাহে এবং উচ্চকণ্ঠে তারা নসিহত্ করেই চলেছেন। সুসজ্জিত ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ড্রয়িং রুমে কিংবা টিভি ক্যামেরার সামনে বসে এদেশের হতদরিদ্র খেটেখাওয়া মানুষের রাজনৈতিক চেতনা নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা এক ধরনের হীনতারই পরিচায়ক বৈ নয়! অবিশ্যি নিজেদের এই হীনতা বা দীনতা সম্পর্কে তারা সজ্ঞানে একেবারেই উদাসীন থাকেন। এই হীনমন্যতা আসলে তাদের মতলব হাসিলের ক্ষেত্রে ব্যর্থতাজনিত হীনমন্যতা। তারা ব্যক্তির মধ্যে গণতন্ত্র খুঁজে বেড়ান তাই রাজনৈতিক দলের প্রধানদের উপর তাদের এক ধরনের বিদ্বেষ পোষণ করতে দেখা যায়। গণতন্ত্র যে ব্যক্তি নয়, একটি সিস্টেম, এ কথা তারা বেমালুম যান নিছক ব্যক্তিগত দ্বেষ-বিদ্বেষ ক্ষোভ-বিক্ষোভের কারণে। অনেকে যখন বলেন যে রাজনীতি হচ্ছে শিক্ষিত মানুষের বিষয় তখন তাতে দ্বিমত করার কিছু থাকে না। কিন্তু এই শিক্ষিত মানুষ বলতে যদি কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ ডিগ্রিধারী কোট-টাই পরা ব্যক্তিদেরকে বোঝায় তাহলে দ্বিমত না করে পারা যায় না নিশ্চয়ই! রাজনীতি সর্বোতভাবেই মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়। রাজনীতির কারণে দেশের মুটে-মজুর থেকে শুরু করে সকল শ্রেণীর মানুষের জীবনই নিত্য আলোড়িত হয়। ফলে সকল ব্যক্তিই (তা-সে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌহদ্দী পেরুক চা-ই নাই পেরুক) রাজনীতি বিষয়ে নিজস্ব বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষাপটে একটি ধারণায় উপনীত হয়। এ জন্য তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী লাভ করতে হয় না। রাষ্ট্রিক ও সামাজিক জীবনের সমস্যা-সংকট কিংবা এক্ষেত্রে করণীয় বিষয়ে নিজের জনসম্পৃক্তিলব্ধ অভিজ্ঞান জনমানুষের হয়ে কাজে লাগানোর ব্যাপারে যিনি যতো বেশি পারঙ্গম তিনি ততো সার্থক রাজনীতিক। সত্য বটে, রাজনীতিতে খ্যাতিমান ব্যারিস্টার-উকিল, শিক্ষক-চিকিত্সক-সাংবাদিক সকলেরই নেতৃত্বদানের অধিকার আছে। কিন্তু নেতৃত্ব আর পেশাগত যোগ্যতা কখনই এক জিনিস যে নয় এ বিষয়টি যারা খেয়াল রাখেন না তারাই এলোমেলো কথা বলেন। রাজনীতি সম্পূর্ণভাবেই হচ্ছে জনসম্পৃক্তির বিষয়। জনগণের ভাষা বোঝা এবং তাদের ভাষায় কথা বলার বিষয়। জনগণের আকুতি, চওয়া-পাওয়া অনুধাবন এবং তা বাস্তবায়নে নিঃশ্বার্থভাবে কাজ করার মধ্যেই রাজনীতিকের সার্থকতা। সুতরাং, কেবল স্যুট-টাই পরা তথাকথিত শিক্ষিত মানুষ রাজনীতিতে সফলতার মুখ দেখতে পারে না। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, শেরে বাংলা ফজলুল হক, শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রত্যেকেই এই বাংলায় আইন বিশারদ ছিলেন এবং রাজনীতিতে এরা সকলেই সাফল্যের চূড়ায় উপনীত হতে পেরেছিলেন শুধু পেশাগত শ্রেষ্ঠত্বের কারণে নয় বরং গণমানুষের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে নিজেদেরকে সম্পূর্ণভাবে একাত্ম করতে পেরেছিলেন বলে। তাদের সময়ে আরও কত উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিই তো রাজনীতিতে এসেছিলেন, কই তাদের কারও নামতো দেশবাসী আজ ভুলেও উচ্চারণ করে না। রাজনীতিতে কুটচাল প্রয়োগ এবং হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থের অপচেষ্টা যারা করেছেন তাদের সিংহভাগই দেখা যাবে এই উচ্চশিক্ষিত শ্রেণীর মানুষ। কেননা, তথাকথিত ঐ শিক্ষার বদৌলতে কুটচালের সূক্ষ্ম ব্যাপারগুলি এদের কাছে সহজ হয়ে ওঠে, ফলে তা প্রয়োগের মাধ্যমে আত্মস্বার্থোদ্ধার সহজতর হয় তাদের পক্ষে। অন্যদিকে, যারা মাটির কাছাকাছি থাকেন, অর্থাত্ সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকেন তারা আপাত দৃষ্টিতে কিংবা ঐ টকশোর বক্তাদের চোখে মূর্খ, অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত বলে প্রতিভাত হতে পারেন বটে, কিন্তু সার্বিক মূল্যায়নে দেখা যাবে যে, তারাই স্বশিক্ষিত এবং জনগণের কাছের মানুষ হিসেবে বরণীয় ও স্মরণীয় হয়ে থাকেন। এ ক্ষেত্রে জনসম্পৃক্তির মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাদের যে নৈকট্য লাভ ঘটে তা তাকে সার্থক রাজনীতিকে পরিণত করে বৈকি! কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী ব্যক্তিরাই যদি যোগ্য রাজনীতিক বলে বিবেচিত হতেন তাহলে তো নির্বাচনে জয়লাভ করাটা এদের জন্য নস্যি হওয়া উচিত! কিন্তু বাস্তবে আমরা একেবারেই অখ্যাত ও স্বল্পশিক্ষিত ব্যক্তির কাছে পেশাগত জীবনে লব্ধপ্রতিষ্ঠিত উচ্চশিক্ষিত ও খ্যাতিমান ব্যক্তিদের ‘দুর্ভাগ্যজনক’ পরাজয় বরণ করতে দেখি। রাজনীতি যেহেতু গণমানুষের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় সেহেতু কেবল তাদের জীবন-ঘনিষ্ঠজনেরাই এ ক্ষেত্রে খ্যাতির চূড়ায় পৌঁছে যান অনায়াসে। যারা রাজনীতিকে ক্ষমতা দখলের বিষয় মনে করেন তারাই কেবল নানা ছলচাতুরী আর কুট-কৌশল প্রয়োগের জন্য সদা সচেষ্ট থাকেন। রাজনীতি অসলে ক্ষমতা লাভের উপায়। অর্থাত্, জনসেবা ও দেশসেবার মাধ্যমে জনগণকে সন্তুষ্ট করতে পারলে ক্ষমতা আপসে আপ ধরা দেয়। মোদ্দাকথা, জনগণ যদি কাউকে তাদের নিজের লোক মনে না করে তাহলে তিনি যত শিক্ষিতই হউন না কেন তাতে কখনই চিড়ে ভিজবে না, অর্থাত্ তিনি জনগণের নেতা হতে পারবেন না। চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র করে জনগণের কাঁধে সিন্দাবাদের বুড়োর মতো কিছুকাল চেপে বসে থাকতে সক্ষম হলেও আখেরে তিনি পরিত্যক্ত হবেনই। আমাদের সুদীর্ঘকালের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন নজির আছে ভূরি ভূরি। পরের কল্যাণে রাজনীতি যারা করেন তারা মহান হয়ে ওঠেন আর স্বার্থের রাজনীতি রাজনীতিকের জীবনে আনে জগত্ জোড়া ধিক্কার। কথায় বলে, রাজনীতিককে হতে হবে জনগণের লোক (A politician has to be a people’s man)। জনগণের সমর্থন পেতে হলে দেশি-বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর ডিগ্রি কখনই যথেষ্ট বলে বিবেচিত হয়নি, হবেও না। অনেক ক্ষেত্রে প্রথম দফায় ঐ ডিগ্রির চমক জনমানুষকে ক্ষণিক বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হলেও, অনেক ক্ষেত্রে দ্বিতীয় দফায় কিন্তু তিনি অপাংক্তেয় হিসেবে চিহ্নিত হতে বাধ্য। you can fool all the people some of the time, and some of the people all the time, but you cannot fool all the people all the time. কিছু সময়ের জন্য মানুষকে বোকা বানানো গেলেও সব সময়ের জন্য তাদেরকে বোকা বানিয়ে রাখা যায় না। এই মনীষী বাক্য সকল দেশেই প্রমাণিত সত্য। এই নসিহতকারীরা দেশের প্রধানমন্ত্রীর কতবার ক্ষমতায় থাকা উচিত-অনুচিত সে সব বিষয়েও অতি বিজ্ঞের মতো মত দিচ্ছেন, জ্ঞানও দিচ্ছেন। সংসদীয় গণতন্ত্রে এ বিষয়টি দলের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করে। এ জন্য কোন সাংবিধানিক বাধ্যবাধ্যকতা আরোপের কোন অবকাশ নেই। অথচ ঐ বিজ্ঞ ব্যক্তিরা দুইবারের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না এমন সাংবিধানিক বিধানের জন্যও ওকালতি করছেন। জনগণ যে প্রধানমন্ত্রীকেও প্রত্যাখ্যান করতে পারে সে খেয়াল বোধকরি এই ব্যক্তিদের নেই। ইন্দিরা গান্ধীর ন্যায় দৃঢ়চেতা প্রধানমন্ত্রী কিন্তু জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন। সুতরাং, কোন নেতা বা নেত্রীর বলদর্পী আচরণ, জনগণের প্রতি অবজ্ঞা ইত্যাদির খেসারত তাকে দিতে হয় জনগণেরই অসন্তোষ সৃষ্টি করার কারণে। এইসব তথাকথিত বুদ্ধিজীবীর বুদ্ধিবৃত্তিক এই জাতীয় দেউলিয়াত্ব প্রকারান্তরে তাদের কথাবার্তায় প্রতিফলিত। সুযোগ সন্ধানী এবং সস্তা জনপ্রিয়তা লাভের এই হীন কৌশলকে এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক পতিতাবৃত্তির সঙ্গেই তুলনা করা চলে, বলেছিলেন এই বাংলারই এক বাঘা রাজনীতিক আবুল হাশেম। Surrendering to vulgar thinking for cheap popularity and opportunist leadership is intellectual prostitution. এরা কখনই জনগণের মুখোমুখি হয় না, জনগণের মনের কথা বোঝে না, নাড়ীর স্পন্দন অনুভব করে না অথচ জনগণের ব্যাপারে কথার তুবড়ী ছুঁড়তে থাকে সুযোগ পেলেই। এই জনসম্পৃক্তিহীন লোকেরা নির্বাচনে প্রার্থী হলেই বুঝতে পারবেন যে, জনগণ আসলে এদেরকে কোন চোখে দেখে! এরা নিজেদেরকে বিদ্যাবুদ্ধির জাহাজ মনে করলেও ভবী কিন্তু তাতে ভোলে না! সুবিধাবাদী মনোবৃত্তিতে আচ্ছন্ন এইসব ব্যক্তি স্বীয় স্বার্থ চরিতার্থ করতে ‘মাস্তানতন্ত্র জিন্দাবাদ’ বলতেও পিছপা হয় না। তাছাড়া, অন্য নানান প্রকার অপরাধ কর্মেও এদের অনেকেই পারদর্শিতা প্রদর্শন করেন নির্লজ্জভাবে। এরা জীবনে কখনোই জনগণের মুখোমুখি হন না এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণের সদিচ্ছা-সাহস দেখান না অথচ বড় বড় কথা বলেন আর ভুলে যান যে, যাদের বিরুদ্ধে তারা বিষোদ্গার করছেন তারা কোন ভুঁইফোঁড় নন, বরং জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি। নিশিথে টিভি পর্দায় এদের যেসব বক্তব্য শোনা যায় তাতে এক ধরনের মতলবী মানসিকতাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জনগণের জন্য কুম্ভীরাশ্রু বর্ষণের মাধ্যমে স্বার্থ সিদ্ধির এই কৌশল লোক ঠকানোর জন্য বেশ লাগসই। জনগণের সঙ্গে মেলামেশাবিহীন জীবন যে শিক্ষার ঘাটতিপূর্ণ এক জীবন তা এরা বুঝেও বোঝে না। কেবল পুঁথিগত বিদ্যাকে উপজীব্য করে যারা সমাজে উপদেশ খয়রাত করে বেড়ায় তাদের সে উপদেশ ফাঁকিতে ভরা হতে বাধ্য। যে শিক্ষা বাস্তবের জমিনে দাঁড়িয়ে অর্জিত হয় না সে শিক্ষা অন্তঃসারশূন্য। শিক্ষায়তনলব্ধ শিক্ষার গরীমায় এরা যারা নিজেদের জ্ঞানী-গুণী ঠাওরায় তারা আহাম্মকের স্বর্গেরই বাসিন্দা। কেননা ওই প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যা শুধু অহংকার ও অহমিকা তৈরি করে মাত্র! এর সঙ্গে যদি মানুষের সম্পৃক্তি এবং নিজের দেশের সংস্কৃতি ঐতিহ্য সভ্যতা ভুগোল অর্থনীতি সাহিত্য-শিল্পের সাথে নাড়ীর যোগসূত্র প্রতিষ্ঠিত না হয় তাহলে তা মূল্যহীন হতে বাধ্য। ব্যক্তিজীবনে বিত্ত-বৈভবের অধিকারী হওয়া সম্ভব হলেও মানুষের কাছে তারা অপরিজ্ঞাত ও অপাংক্তেয় হতে বাধ্য। রাজনীতিকদের মধ্যে একশ্রেণীর মানুষ আছেন যারা স্বশিক্ষিত। এই শিক্ষা লাভ ঘটে জনগণের সঙ্গে নিখাদ-নিবিড় সখ্য থেকে। এরা মানুষের হয়ে কাজ করেন তাই তারা প্রাত:স্মরণীয়। আবার দেশ ও সমাজের সকল ক্ষেত্রে শৃঙ্খলাপূর্ণ কাজ নিশ্চিত করতে প্রয়োজন পড়ে দক্ষ ব্যবস্থাপকের। এই শ্রেণীর লোকেরা কাজের মানুষ হিসেবে চিহ্নিত। কোন সরকারের আমলে টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী কিংবা অন্য কোন গুরুত্বপূর্ণ আসনে এরা নিয়োগ পেলে এদের কর্মদক্ষতায় এবং সুদক্ষ ব্যবস্থাপনায় নির্বিঘ্নে কাজ এগিয়ে যায়। রাজনীতির ক্ষেত্রে এমন লোকদের অনাদর নেই। জনগণ সেই লোকেদের পছন্দ করে না যারা ‘গাঁয় মানে না আপনি মোড়ল’ গোছের। স্যুটেড-বুটেড বা ধোপদুরস্ত পোশাকে আবৃত হয়ে যারা চোস্ত ইংরেজি-বাংরেজি আওড়ান তারা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হন না। তাই টিভির পর্দায় যখন এরা নীতির কথা বলেন, আদর্শের বান বইয়ে দেন তখন জনতা মুখ টিপে হাসে। হাসে এ জন্য যে, ঐ অতি উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিরা তাদেরকে মূর্খ ভাবছে, অর্ধশিক্ষিত ভাবছে, যা কিনা কোন অবস্থাতেই তারা নয়। যে রিকশা চালক বা কৃষক-শ্রমিককে এরা অবজ্ঞাসূচক দৃষ্টিতে দেখে তাদেরকেই আবার স্বার্থোদ্ধারের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহারের জন্য টক শোতে কত না কথার ফুলঝুরি বর্ষণ করে এরা! একটি আধাসামন্তবাদী সমাজের প্রতিভূ হিসেবে এইসব শিক্ষিত ব্যক্তি জনগণের সঙ্গে যে সকল বুজরুকি করেন, এদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে যেভাবে হেয় করার প্রয়াস পান তাতে এদের হীনমন্যতারই প্রকটভাবে প্রকাশ পায়। আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের অর্জন কোন অংশেই কম নয়। রাষ্ট্রে যে দুর্বৃত্তায়ন চলেছে তার জন্য শুধু রাজনীতিকরাই দায়ী নয়, এ জন্য সবাই আমরা কমবেশি দায়ী-এ সত্যটিকে বুক চিতিয়ে বলার সাহস যতদিন এই বুদ্ধিজীবীদের বুকে সঞ্চারিত না হবে ততদিন এরা জনগণের কাছে অপাংক্তেয়ই থেকে যাবেন। লেখক : সাংবাদিক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন