আলোকপাত

আল কুদস দিবস :প্রাসঙ্গিক ভাবনা

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০১৩, ২১:৩৬
ইসলাম পবিত্র ও শান্তির ধর্ম। ইসলামের প্রথম কিবলা মসজিদুল আকসা। মক্কা মুআয্যামাহ ও মদিনা মুনাওয়ারার পরে তৃতীয় পবিত্র স্থান। বুখারি ও মুসলিম শরীফের হাদিসে হযরত রাসূলে করীম (সা.) মক্কার মসজিদুল হারাম, মদীনার মসজিদুন্নবী ও বায়তুল মুকাদ্দাস মসজিদের উদ্দেশ্যে সফরকে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যা অন্য কোন মসজিদ সম্পর্কে করেননি। ইবনে মাজাহ শরীফে হযরত আনাস থেকে বর্ণিত রাসূল সা. বলেছেন, ঘরে নামাজ পড়লে ১ গুণ, মসজিদে ২৫ গুণ, মসজিদে নববী ও আকসায় ৫০ হাজার গুণ, মসজিদে হারামে ১ লক্ষ গুণ সওয়াব পাওয়া যায়। দীর্ঘ ১৭ মাস বায়তুল মুকাদ্দাস ছিল ইসলামের প্রথম কিবলা। বায়তুল মুকাদ্দাস দুনিয়ার অসংখ্য ভূখণ্ডের মতো কোন সাধারণ ভূখণ্ড নয়। এ পবিত্র ঘর থেকেই খাতামুন্নাবীয়ীন হযরত মুহাম্মাদ (সা.) মিরাজে গমন করেছিলেন। এটি জিহাদের চারণভূমিও বটে। বায়তুল মুকাদ্দাস মসজিদ এবং তার আশেপাশের এলাকা বহু নবীর স্মৃতি বিজড়িত। এই পবিত্র নাম শুধু একটি স্থানের সাথে জড়িত নয়; বরং সকল মুসলমানের ঈমান ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ‘কুদস’ শব্দের অর্থ পবিত্র। মসজিদে আকসাকে কুদস বলা হয়। মসজিদে আকসা মানে দূরবর্তী মসজিদ; এর অন্য নাম হচ্ছে বাইতুল মাকদিস, মসজিদে ইলিয়া, সালাম, উরুসালেম, ইয়াবুস। হিব্রু শব্দ ‘বেথহামমিকদাস’ থেকে মাকদিস, যার মূল শব্দ কুদস। মুসলমানদের কাছে জেরুজালেম শহর ‘আল কুদস’। আর জেরুজালেম শব্দটি রোমান ব্যবহূত কেনানি শব্দ ‘ইউরোসালেম’থেকে। ঈসায়ী সাল ৩ হাজার বছর আগে আরব ইয়াবুসি গোত্রের প্রথম শাসক মালিক সাদেক-এর উপাধি ছিল সালেম (শান্তিপ্রিয়)-তার নামানুসারে ইউরোসালেম-পরে জেরুজালেম। জেরুসালেম ৩৪ ডিগ্রী অক্ষাংশ ও ৩১.৫২ ডিগ্রী দ্রাঘিমাংশের উত্তরে একটি পাহাড়ি (মোরিয়া, যাইতুন, সাহইউন, যাইতা, গাওল, সামউইল নবীর পাহাড়) এলাকায় অবস্থিত। ফিলিস্তিন বা প্যালেস্টাইন এশিয়ার পশ্চিম অঞ্চলে ভূমধ্যসাগরের পূর্ব পাড়ে অবস্থিত। এর পূর্বে জর্ডান,পশ্চিমে মিসরের সিনাই মরুভূমি ও ভূমধ্যসাগর, উত্তরে সিরিয়ার গোলান হাইট, বেকা উপত্যকা ও লেবানন এবং দক্ষিণে আকাবা উপসাগর ও সৌদি আরবের উত্তর পশ্চিম সীমান্ত। হযরত ইবরাহীম (আ.) কাবাঘর নির্মাণের ৪০ বছর পর হযরত ইয়াকুব (আ.) জেরুজালেমে আল-আকসা মসজিদ নির্মাণ করেন। অতঃপর হযরত সুলায়মান (আ.) এই পবিত্র মসজিদের পুনঃনির্মাণ করেন। ৬৩৮ ঈসায়ী সালে দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা.)-এর খিলাফতকালে পুরো বাইতুল মুকাদ্দাস এলাকা মুসলমানদের অধীনে আসে। ১০৯৬ সালে খ্রিস্টান ক্রুসেডারগণ সমগ্র সিরিয়া ও ফিলিস্তিন দখল করে নেয়ার পর বাইতুল মুকাদ্দাস মসজিদের ব্যাপক পরিবর্তন করে একে গির্জায় পরিণত করে। এরপর ১১৮৭ সালে মুসলিম বীর সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবী জেরুজালেম শহর মুসলমানদের অধিকারে নিয়ে আসেন। সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবীর হাতে পরাজিত হওয়ার পর খ্রিস্ট শক্তি পিছু হটলেও ইহুদি চক্র বায়তুল মুকাদ্দাসের প্রতি লোলুপ দৃষ্টি রাখে। তারা ফিলিস্তিন থেকে শুরু করে সুদূর মদীনা পর্যন্ত সারা মুসলিম এলাকা নিয়ে বৃহত্তর ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্র করে। মুসলমানদের প্রথম কিবলা উদ্ধারের জন্য মুসলিম উম্মাহকে জাগিয়ে তোলার লক্ষ্যে ১৯৭৯ সালে রমজানের শেষ শুক্রবারকে ‘বিশ্ব কুদস দিবস’ বলে ঘোষণা করা হয়। সেই থেকে প্রতি বছর পালিত হচ্ছে এই ‘আল কুদস দিবস’। ২০১৩ সালের জুলাই মাসেও, এই পবিত্র রমজানেও ইসরাইলিদের হাত থেকে মুক্তি পায়নি ফিলিস্তিনের শান্তিকামী রোজাদার ভাই-বোনেরা। আরবদের চরম ব্যর্থতা ও দুর্বলতার মুখে ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধের মাধ্যমেও আল কুদস উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ফিলিস্তিনের নির্যাতিত জনগণ দীর্ঘদিন ধরে তাদের আবাসভূমি ও আল-কুদ্স (বায়তুল মুকাদ্দাস) উদ্ধারের জন্য রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বিদ্যমান সমস্যার সমাধানকল্পে সমস্ত রকমের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের ও সংকীর্ণ মাযহাবী ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে উঠে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর উচিত ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপের মাধ্যমে সমগ্র ফিলিস্তিন ভূখণ্ড জুড়ে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। তাই আজ পবিত্র জুমাতুন বিদার নামাজ শেষে বিশ্ব মুসলিম এবং মজলুম ফিলিস্তিনী ভাইদের জন্য মহান আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করুন তিনি যেন পবিত্র আল-কুদ্সসহ ফিলিস্তিনবাসীকে যায়নবাদীদের হাত থেকে মুক্তি দেন। লেখক :সহকারী অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন