বাংলাদেশের রাজনীতির নেতৃত্বে নতুন প্রজন্মের আগমনী বার্তা পাওয়া যাইতেছে। সরকারি দলের একজন তরুণ ও প্রতিশ্রুতিবান নেতা সমপ্রতি একটি বিস্ফোরক ও ম্যাজিক মন্তব্য দ্বারা এবং সর্বশেষ পীরগঞ্জের (রংপুর) জনসভার মাধ্যমে রাজনীতির লাইমলাইটে চলিয়া আসিয়াছেন। অন্যদিকে বিরোধী দলীয় নেত্রীর স্নেহধন্য পুত্রও লন্ডনে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ ও দিক-নিদের্শনামূলক বক্তৃতার মাধ্যমে আগে হইতেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রহিয়াছেন। এই তরুণ নেতাদ্বয়ের মধ্যে একজনের জন্ম পাকিস্তান আমলে এবং অন্যজনের ১৯৭১ সালের রক্তাক্ত ও বন্দীশিবির বাংলাদেশে। চড়াই-উত্রাইয়ের মধ্য দিয়া বাড়িয়া উঠা এই দুই তরুণের জন্য আজ নেতৃত্বের ক্ষেত্র প্রস্তুত হইতেছে। যদিও তাহারা কেহই রাজনীতিতে নূতন মুখ নহেন। একজন স্বীয় দলের প্রাথমিক সদস্যপদ লাভ করেন ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। অন্যজনের রাজনীতিতে অভিষেক হয় ১৯৯৩ সালে। বর্তমানে তিনি নিজ দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে (সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান) সমাসীনও বটে।
রাজনীতিতে এই নূতন প্রজন্মের শুভাগমন ও সক্রিয় ভূমিকা পালনকে আমরা সর্বান্তঃকরণে স্বাগত জানাই এবং ইহাকে স্বাভাবিক ও ইতিবাচক হিসাবেই দেখিতে চাই। যাহারা ইহাকে শুধু পরিবারতন্ত্র হিসাবে দেখিতে চান ও সমালোচনা করেন, আমরা তাহাদের সহিত একমত পোষণ করি না। বস্তুত সারা দুনিয়ায় রাজনীতিতে ও গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় বিভিন্ন পরিবারের প্রভাব ও তাহার বাস্তবতা আজ অনস্বীকার্য। ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারের ( যাহা পুঁজিবাদী ও ধর্মীয় অর্থনীতিতে স্বীকৃত) কারণেও রাজনীতিতে কোন পরিবারের এরূপ প্রভাব-প্রতিপত্তি ও সেই পরিবারের নূতন প্রজন্মের রাজনীতিতে আগমনের ঘটনা দেখা দিতেই পারে। শুধু বাংলাদেশেই নহে, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র এমনকি সমাজতান্ত্রিক উত্তর কোরিয়ায়ও আছে। যেমন—কেনেডি, বুশ, আল গোর, গান্ধী, ভুট্টো পরিবার প্রভৃতি। বাংলাদেশে এরূপ শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক পরিবারের বাহিরেও নূতন প্রজন্মের নেতৃত্বের ধারা প্রবহমান এবং সেসব তরুণ নেতারাও অনেক সম্ভাবনাময়।
বাংলাদেশের সাবেক ও বর্তমান রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রী-এমপিদের হাত ধরিয়া তাহাদের সন্তানরা রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করিয়াছেন ও করিতেছেন। সাংবিধানিক কারণে পার্লামেন্টের আসন খালি হইলে কিংবা কাহারও মৃত্যু হইলে সেসব শূন্য আসনে তাহাদের ছেলেমেয়েরা মনোনয়ন নিয়া বিপুল ভোটে পাস করিতেছেন। গণতান্ত্রিক অভ্যুত্থানের পর নব্বই দশক হইতে এই প্রবণতা অধিক হারে চলিয়া আসিতেছে। ইহাছাড়া সাধারণ পরিবার ও তৃণমূল পর্যায় হইতেও অনেক তরুণ নেতৃত্ব আসিতেছে যাহা এক কথায় আশাব্যঞ্জক। ফলে যাহারা বলিতেছেন আমাদের তরুণরা কেবলই ফেসবুক-টুইটার নির্ভর ও রাজনীতিবিমুখ, তাহারা শতভাগ সত্য কথা বলিতেছেন না।
রাজনীতিতে এই নূতন প্রজন্মের নেতৃত্বের বিকাশকে আমরা প্রকৃতির ন্যায় স্বাভাবিক ঘটনা বলিয়াই মনে করি। বাবা-মায়ের বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাহাদের স্থলাভিষিক্ত হইয়া তরুণদেরই হাল ধরিতে হয়। ইহাই দুনিয়ার নিয়ম। ইহা শুধু রাজনীতির ক্ষেত্রেই নয়, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, ধর্ম, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি সর্বক্ষেত্রেই সমভাবে প্রযোজ্য। রাজনীতির মূল কথা হইল জনসমর্থন ও জনসেবা। এই দুই গুণের অধিকারীরাই শেষপর্যন্ত রাজনীতিতে টিকিয়া থাকিবেন। তরুণ প্রজন্মের যেসব নেতার ব্যাপারে এখন আলাপ-আলোচনা চলিতেছে তাহাদের অনেকেই উন্নত দেশে লেখাপড়া করিয়াছেন এবং সেখানকার গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি সম্পর্কে সজাগ ও সচেতন। এখানেই আমরা আশাবাদী। তাহাছাড়া আমাদের ভোটারদের ৪০ শতাংশই তরুণ। সুতরাং রাজনীতিতে আরও বেশি তরুণ কণ্ঠ উচ্চকিত হইবে ইহাও না মানিয়া উপায় নাই।
