রানা প্লাজা ভবন ধসের পর দেশে-বিদেশে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প ও এই শিল্পের সহিত সংশ্লিষ্ট মালিকদের সম্পর্কে অত্যন্ত নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়। যাহার প্রেক্ষাপটে বিদেশি ক্রেতাদের কাহারো কাহারো বাংলাদেশ হইতে পোশাক ক্রয়ের ব্যাপারে অনীহার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা বাতিল করিয়া দেয়। এতদ্সত্ত্বেও বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের চাহিদা কমার পরিবর্তে বরং বাড়িয়া যাওয়ার খবর বাহির হইয়া আসিতেছে। তাহার মানে এই নহে যে, কর্মপরিবেশের উন্নতি না ঘটাইয়া আমাদের শিল্প টিকিয়া থাকিতে পারিবে। দীর্ঘমেয়াদে এই শিল্পকে টিকিয়া থাকিতে হইলে অবশ্যই শ্রমিক ও মালিকদের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে। শ্রমিকের অবস্থার উন্নতি ঘটাইতে হইবে। অন্যথায়, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে বারংবার সরবরাহ বিঘ্নিত হইলে কম দাম সত্ত্বেও ক্রেতারা এই দেশের বিকল্প খুঁজিয়া নিবে। এখন প্রশ্ন হইল, কর্মপরিবেশের উন্নতি ঘটাইতে যে অর্থ ব্যয় করিতে হইবে তাহা বহন করিবে কে—সরকার, ক্রেতা না বিক্রেতা?
পোশাক শিল্পের সাথে সরাসরি সংশ্লিষ্ট পক্ষ ক্রেতা বা বিক্রেতাকেই বহন করিতে হইবে এই খরচ। সরকার কেবল কর্মপরিবেশ উন্নতির নীতি প্রণয়ন করিয়া তাহা মানিতে বাধ্য করিতে পারে পোশাক মালিকদের। তবে বাজার অর্থনীতির নিয়মে এই ব্যয় সর্বাগ্রে পোশাক মালিকদের উপর আসিলে তাহা দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে ক্রেতাদের উপর পড়িবে। এইরকমটি ঘটিবে যদি মালিকদের সবাই কিংবা বেশিরভাগ কর্মপরিবেশের উন্নতি ঘটায় তবেই। যদি সবার খরচ বাড়িয়া যায় তবে তাহা ক্রেতার উপর চলিয়া যাইবে দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে। যদি অনেকেই কর্মপরিবেশের উন্নতি না ঘটায় তবে তাহাদের পোশাকের দাম তুলনামূলক কম থাকায় ক্রেতারা তাহাদের দিকে ছুটিবে। আর কর্মপরিবেশের উন্নতি ঘটাইতে গিয়া অন্যরা মুনাফার অংশবিশেষ খোয়াইবে। প্রকারান্তরে তাহারাও কর্মপরিবেশের জন্য ব্যয় করিতে চাহিবে না। তাহার মানে সরকার যদি শক্ত হাতে সবাইকে কর্মপরিবেশের উন্নতি ঘটাইতে বাধ্য করে তবে তাহা খরচ বৃদ্ধি তথা দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে বিদেশি ক্রেতা কিংবা ভোক্তার উপর বর্তাইবে। কেহ কেহ আশংকা প্রকাশ করিতেই পারেন। কিন্তু এই অতিরিক্ত আশংকা অমূলক এইজন্য যে, আমাদের প্রতিযোগী দেশের খরচ আমাদের তুলনায় অনেকটাই বেশি। তাই কর্মপরিবেশের উন্নতির খরচ যোগ হইলে বৈশ্বিক বাজারে আমাদের মাইর খাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
অন্যদিকে, ইহাও আমরা মনে করিতে পারি যে, বিদেশি ক্রেতা ইচ্ছা করিলেই বাংলাদেশ ত্যাগ করিতে পারিবে না যতদিন পর্যন্ত আমাদের দেশে শ্রম ও পোশাকের দাম কম থাকিবে এবং নির্বিঘ্ন সরবরাহ বজায় থাকিবে। কারণ বিদেশি ক্রেতারা নিজ দেশের বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকিয়া থাকিবার জন্য যেখানে সস্তা সেখানে আসিবেই, যতক্ষণ না সবাই মিলিয়া একত্রে বাংলাদেশ ত্যাগ করে।
