স্মরণ

বজলুর রহমান :অসীমগগনবিহারী

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০১৩, ২১:১২
তাঁর কাছে এলে পাওয়া যেত বৃক্ষের ছায়া, পুষ্পের ছোঁয়া, অপত্য স্নেহমাখা হাসির ঝিলিকে প্রাণ হতো চঞ্চল, কথার জাদুমালা নিবিষ্ট শ্রোতায় পরিণত করতো, জীবনের নানা বিষয়ে পাওয়া যেত সুপরামর্শ, বন্ধুর মতো বাড়িয়ে হাত পাড়ি দেয়া যেত সাঁকো কিংবা মিলত অভিভাবকত্বের সসীম স্নেহাবিষ্ট মুখ। ছিলেন তিনি আত্মার আত্মীয়, মনের আরাম, প্রাণের আনন্দ। আলোকের ঝর্ণাধারায় ধুইয়ে দিতে চাইতেন সব অন্ধকার, কুসংস্কার, আর অজ্ঞতা। সেই মানবের স্বপ্ন সাধনা ছিল সমাজ সংস্কার তথা দিনবদলের। সুদর্শন, সুশোভন বজলুর রহমানকে যতবারই দেখেছি ততবারই নতুন করে প্রাণ পেয়েছি। স্বপ্ন দেখার সিঁড়ি শুধু খোঁজা নয়, তা সত্যি করার নিরলস প্রয়াস রেখেছেন সান্নিধ্যজনের জন্যও। তাঁর সান্নিধ্য শুধু সুখ নয়, জ্ঞানের পরিধিও বাড়াতো। সব বিষয়ে ধারণা রাখা বুঝি একা সাংবাদিকের কাজ, তাই জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত—এমনটা নয়। আসলে ভেতরের তাগিদই তাঁকে নানা বৈচিত্র্যের ভেতর সমন্বয় সাধন করিয়েছে। শিশুদের জন্য সংগঠনও গড়েছেন যৌবনের উষ্ণীষ উড়িয়ে। রাজনীতিতেও ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। মুক্তিযুদ্ধেও অসীম সাহসিকতা দেখিয়েছেন। বের করেছেন পত্রিকা। সংগঠন করেছেন শান্তির জন্য। আড্ডা বা আলোচনায় নানা বিষয়েরা এসে জড়ো হতো। নির্বাক শ্রোতাদের মনোযোগ তাঁকে ঘিরে। বিশ্বপাঠশালার ছাত্রের মতো কত অজানাকে যে তুলে ধরতেন, কত অচেনাকে চিনিয়েছেন। অভিজ্ঞতালব্ধ জীবনের বাঁকে বাঁকে তাঁর নানা ঘটনার সারি। বৈঠকি মেজাজেও সব জানা যেত। শিক্ষকসুলভতায় নয়, বন্ধুবত্সলতায় রেখেছেন নৈকট্যে, উদ্দীপ্ত করেছেন সৃষ্টিশীলতায় নিমগ্ন হতে। বয়স কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি বলেই সান্নিধ্যে, নৈকট্যে যাবার ক্ষেত্রে সংকোচ বা জড়তা এসে ধরা দিত না। বন্ধুর মতো, স্বজনের মতো দ্রবীভূত করে দিতেন তরুণ, অতি তরুণকেও। তারুণ্যের আবেগকে কখনো দমাতে চাননি। বরং তাদের সান্নিধ্য পেতে কখনো বেগ পেতে হতো না। ব্যক্তি জীবনের সমস্যা অকপটে বলা যেত, মিলে যেত সমাধানও। সকল বর্ণ, ধর্ম, মত, পেশার মানুষের সঙ্গেই মিশেছেন অবলীলায়। মুক্ত বুদ্ধির মানুষ বলেই মানুষ পেত মর্যাদা তাঁর কাছে। মনুষ্যত্বকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। বলতেনও, সম্পূর্ণ মানুষ হতে পারার মধ্যে রয়েছে জীবনের সার্থকতা। কর্মের মধ্যে যে মানুষের মুক্তি নিহিত আছে, সেই উপলব্ধিটুকুও তাঁরই সহজাত। নির্ভীক সাংবাদিক বজলুর রহমান, আমাদের প্রাণাধিক বজলু ভাই, অমরত্বের সাধনা করেননি। কিন্তু তাঁর জীবনকর্ম তাঁকে অমরত্বের পথেই নিয়ে গেছে। সময়ের সাহসী এই সন্তানের সান্নিধ্য প্রাপ্তি সাধারণ এই আমার জীবনে এক পরম পাওয়া। বিদগ্ধতায় নিজেকে আড়াল না করার এই অগ্রজ বন্ধু বজলু ভাইয়ের স্মৃতি সততই সুখের। কিন্ু্ত তার অনুপস্থিতি বড় বেশি বেদনার, বিষাদের। এমনই মানুষ তিনি, সান্নিধ্য যাঁর কখনো পরিণত হয়নি বিষাদময়, অভিমানের বা ভারবাহী। বরং ব্যস্ত মানবের সান্নিধ্যের সময়টুকু কেড়ে নেয়াও কম দুষ্কর ছিল না। তাঁর সান্নিধ্য, নৈকট্য এক গৌরবময় অধ্যায়, জীবনের পরমতম প্রাপ্তি। অভিভূত করে রেখেছিলেন যতদিন ছিলাম কাছে এবং দূরে। ইতিহাসের এই পরম পুরুষ সমকালে যেভাবেই মূল্যায়িত হোক না কেন, ভাবীকাল তাঁকে আরো মহিমান্বিত করবেই। বাস্তবতায় এক আদর্শবান, নির্লোভ, নির্মোহ, নিরহংকার মানব ছিলেন বজলুর রহমান। একুশের প্রথম কবিতার কবি প্রয়াত মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী বজলুর রহমানের জীবন ও কর্মের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেছিলেন :“বজলুর রহমান নিজে একজন দক্ষ সংগঠক হওয়ার কারণে খেলাঘরকে প্রগতিশীল ধারায় নির্মাণ করেছেন। এই খেলাঘর বহুদিন যাবত্ নানা কর্মকাণ্ড, অনুষ্ঠান, আন্দোলন, মিছিলের মাধ্যমে হাজার হাজার দেশপ্রেমিক নাগরিকের জন্ম দিয়েছে।” বাঙালির জীবনযাপনের যে আবহ, বজলুর রহমান তাতেও ছিলেন একনিষ্ঠ। অতি নাগরিকতা তাঁকে টানেনি বলেই চিরায়ত বাংলার রূপটুকু ধরে রাখতে চেয়েছেন সব সময়। গ্রামীণ জীবন সমাজ ও মানুষের প্রতি মমত্ববোধের তীব্রতা ধরা পড়তো তাঁর সম্পাদিত পত্রিকায়। সব মতামতকেই গুরুত্ব দিতেন। নিজস্ব মতামত কখনো চাপিয়ে দিতেন না। তবে তাঁর যুক্তি এমন পর্যায়ে এসে দাড়াঁতো যে, তাঁর মতামতটিই হতো সঠিক। আধুনিক রুচিবান বিশুদ্ধ মানবের প্রতিকৃতি মিলতো বুঝি তাঁরই মাঝে। অকুতোভয় বজলুর রহমান অপত্য স্নেহ আর ভালোবাসায় সিক্ত করে গেছেন স্বজন, অনুরাগী, গুণমুগ্ধদের। ফুলের প্রতি ছিল তাঁর তীব্র টান। দেশ-বিদেশে ভ্রমণের সঙ্গী হিসেবে দেখেছি যেখানেই যেতেন সেখানকার গাছপালা, ফুল, ফসল সম্পর্কে খোঁজ নিতে; “পুষ্প বনে পুষ্প নাহি, আছে অন্তরে।” কানাডার অটোয়ায় টিউলিপ উত্সবের বর্ণনা করেছিলাম বজলু ভাইয়ের কাছে। কর্মসূত্রে আমি তখন সেখানে। এক সেমিনারে অংশ নিতে এসেছিলেন। তাঁর সার্বক্ষণিক সঙ্গী থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল। আধুনিকতায় এবং বাঙালিয়ানায় সমৃদ্ধ মানুষটি আমাদের অন্তরাত্মায় গভীরভাবে ঠাঁই করে নিয়েছেন। সীমার মাঝে অসীম হয়ে বজলুর রহমান বেঁচে থাকবেন তাঁর শ্রম ও কর্মের ফসলে। আগামী দিনগুলোতে তাঁকে আরো বেশি মনে পড়বে। আরো বেশি অনুভূত হবে শূন্যতা। নিত্যদিনের জীবনে বজলুর রহমান থাকবেন আমাদের পাথেয় হয়েই। লেখক:কবি, প্রাবন্ধিক [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন