ক্ষমতার রাজনীতির সাথে সন্ত্রাস অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে। এর অনুঘটক হয়ে উপস্থিত থাকছে বা প্রণোদনা দিচ্ছে অর্থনৈতিক দুর্নীতি, দখলদারিত্ব আর রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক পদ-পদবির লোভ। এটি আওয়ামী লীগ, বিএনপি উভয় দলের মধ্যে অতীতেও ছিল, বর্তমানেও দাপটে আছে। দল রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকলে দাপট বেশি থাকে। উন্মত্ততা মাত্রা ছাড়ায় আর বিরোধী দলে থাকলে কিছুটা সমঝে চলে। এই দুই দলই পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় থেকে স্ব স্ব দলের সন্ত্রাসীদের পারফর্মেন্স সার্থকভাবে তুলে ধরতে পেরেছে। দলগুলোর নেতা-নেত্রীরা এসব সন্ত্রাসী পুষে মোটেও বিব্রত হন না। বরঞ্চ রাজনীতির এসব পেশিশক্তিকে সংরক্ষণ করেন।
বক্তৃতা-বিবৃতির ভাষা যা-ই থাক, অস্বীকার করার উপায় নেই যে, দেশের মানুষ এখন বড় অসহায় অবস্থায় দিনাতিপাত করছে। কি বিরোধী, কি সরকারি—সকল রাজনীতিজীবীদের শ্বদন্ত এখন আর লুকো-ছাপা নেই। মানুষের চোখে তা দৃশ্যমান বলেই তাদের অসহায়ত্ব এত বেশি। কোথায় যাবেন তারা, কাকে ভরসা করবেন। আর্তি-আর্জি জানাবেন কোথায়? নিজ ভূমে যেন পরবাসী সবাই। স্বাধীন দেশে বাস করেও যেন পরাধীন। বিরোধী রাজনীতিকরা কারণে-অকারণে হরতালের চাবুক কষছেন বিপন্ন মানুষের পিঠে। সরকারযন্ত্রের চোখে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে খুন-ছিনতাই-রাহাজানি চলছে তো চলছেই। বড় আমলা আর আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকারী বাহিনী থেকে শুরু আর টেলিফোন, ওয়াসা, বিদ্যুত্, গ্যাসের ক্ষুদ্র কর্মী পর্যন্ত সুযোগমতো জিম্মি করছে সাধারণ মানুষকে।
এ দেশের স্বার্থবাদী বিরোধী রাজনীতিকগণ বরাবরই সরকারকে দুর্বল করার জন্য নৈরাজ্য উসকে দিতে ভূমিকা রাখেন। ফলে রাজনৈতিক দুরভিসন্ধির ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সরকারকেও গ্রহণ করতে হয় নানা রাজনৈতিক কৌশল। এ ব্যাপারে সরকারকে সহযোগিতা করার জন্য ভূমিকা রাখতে পারে সরকারি দল। সরকারি দলের ইতিবাচক ভূমিকার জন্যই গণবিচ্ছিন্ন হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পায় সরকার। প্রাজ্ঞ রাজনীতিকদের পরামর্শে সরকারযন্ত্রের নিষ্ক্রিয়তা ও দুর্বলতাগুলো অপসৃত হতে পারে। সরকারি দলের রাজনীতিকদের সতর্ক দৃষ্টি ও মনিটরিংয়ের কারণে সতর্ক হয়ে যেতে পারে দুর্নীতিপরায়ণ আমলাতন্ত্র বা আইন-শৃঙ্খলার রক্ষকরা। চাঁদাবাজি-সন্ত্রাসী তত্পরতায় সরকারযন্ত্র যখন সমালোচিত হতে থাকে তখন সরকারি দলের কর্মীদেরই ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা এই সমস্ত নৈরাজ্য প্রতিহত করে সরকারকে কালিমার হাত থেকে বাঁচাতে।
কিন্তু এসব চরম বাস্তব যুক্তি হলেও আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে সব যেন স্বপ্নবিলাস। বরাবরই আমাদের দেশে সরকারি দলের ভূমিকা ছিল এবং আছে। বিএনপি, আওয়ামী লীগ, ছাত্রদল, ছাত্রলীগ বা এরশাদ বাহিনী যে যখন ক্ষমতায় থেকেছে নিজ সরকারকে জনপ্রিয় করায় কোনো ভূমিকা রাখেনি। বরং যাবতীয় অন্যায়ের চালিকাশক্তি, প্রেরণা প্রদানকারী হিসাবেই চিহ্নিত হয়েছে। তাই সরকারি দল যখন সরকারি শক্তিকে পুঁজি করে অনাচারে লিপ্ত থাকে তখন সরকারযন্ত্রের যাবতীয় বক্তব্য ফাঁকা বুলি হিসাবেই চিহ্নিত হয়।
আওয়ামী লীগ সরকার তার কার্যকালের সাড়ে চার বছর অতিক্রম করেছে। আরেকটি জাতীয় নির্বাচনের মুখোমুখি হবার প্রস্তুতিও গ্রহণ করেছে তারা। আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থেকে বিরোধী দলের আসনে বসে বিএনপি ও জাতীয় পার্টি সরকারের প্রধান সমালোচকের ভূমিকায় অধিষ্ঠিত ছিল। তখনকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিশীল অবস্থা আওয়ামী লীগের রাজনীতিকদের ব্যথিত করেছে। সামরিক ছাউনি থেকে জন্ম নেয়া দলগুলো দেশের স্বার্থ সংরক্ষণ করবে না, জনগণের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হবে, সন্ত্রাসকে লালন করবে—এসব কথা তাই তখন আওয়ামী লীগ নেতাদের মুখ থেকে অহর্নিশি বেরুত। এসব কথার ভিতর যে কিছুটা যুক্তি রয়েছে তা সাধারণ মানুষও অস্বীকার করে না। এ কারণে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে দেশের মানুষ প্রত্যাশা করতেই পারে যে, সুদূর অতীত থেকে ঐতিহ্য ধারণ করে বেড়ে ওঠা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত একটি দল ক্ষমতায় এসে নিশ্চয়ই জনগণের কথা ভাববে কিংবা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে জনগণকে নিরাপত্তা দেয়ার ব্যাপারে নিরপেক্ষভাবে চেষ্টা করবে এবং এ বিষয়ে বক্তৃতার মঞ্চে যা বলছে তা অন্তরের বিশ্বাস ও ইচ্ছা থেকে বলছে—এটি যদি জনগণের প্রত্যাশা হয়ে থাকে তবে বোধ হয় অন্যায় প্রত্যাশা হবে না।
কিন্তু বাস্তবে এক বুক হতাশা নিয়ে মানুষ কি দেখছে? সরকারের গালভরা বুলি ফুটো বেলুনের মতো চুপসে যাচ্ছে। বর্তমান সরকারের আমলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পদে রদবদল হয়েছে। কিন্তু অবস্থার কি কোন পরিবর্তন হয়েছে? প্রতিদিনের পত্রিকার পাতায় যে হারে ছিনতাই, খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজির খবর বেরুচ্ছে আর ভুক্তভোগী মানুষ প্রতিদিন প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাকের ডগায় সন্ত্রাসের যে হিংস্র মূর্তি প্রত্যক্ষ করছে তাতে কারো আশ্বাসের ওপর তারা বিশ্বাস রাখতে পারছে না।
দলীয় সন্ত্রাসের সংবাদ এখন আর নতুন কিছু নয়। কেউ আর বিস্মিত কিংবা হতবাক হন না এবং ভবিষ্যতে হবেনও না। সবাই স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিতে অভ্যস্ত যে, বাংলাদেশি স্টাইলে আধুনিক রাজনীতির দীক্ষায় সরকারি ও ‘বেসরকারি’ দলগুলো ক্যাডার নামের সন্ত্রাসীদের প্রকাশ্যেই পেলে- পুষে রাখে। আবার নেতা-নেত্রী দম্ভ করে বক্তৃতা-বিবৃতিতে বলেন, ‘সন্ত্রাসী যেই হোক তাকে ক্ষমা করা হবে না’। সন্ত্রাসী লালনে সরকারি দলগুলোর সুবিধা বরাবরই বেশি। কারণ এক্ষেত্রে ক্যাডারদের শক্তি-সামর্থ্য ও ক্ষমতা বেশি থাকে। প্রথমত রাজনীতি ও ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত গডফাদারদের ছাতা থাকে তাদের মাথার ওপর আর নেতৃত্বের বক্তৃতার ভাষা যাই থাক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমীহ তারা বরাবরই পেয়ে থাকে।
ক্যাডার সন্ত্রাসীদের ছাড়া প্রায় অচল এখন রাজনীতির সোল এজেন্টরা। কারণ প্রতিপক্ষকে ঠেকাতে চাই ক্যাডার। নির্মাণ কাজের ঠিকাদারি করায়ত্ত করতে চাই ক্যাডার। জমি দখলের জন্য চাই ক্যাডার। এভাবে এমন ধারার সকল ‘চাই’কে বাস্তবায়িত করার জন্য চাই ক্যাডার। ক্যাডার পোষণের জন্য নগদ মণিকাঞ্চন তো নেতা-নেত্রীর বা দলের পকেট থেকে যেতে পারে না। বরঞ্চ ওদের খাই মিটিয়ে নিজেদের কিছু বাড়তি আয় হলে ক্ষতি কি! তাই চাঁদাবাজির লাইসেন্সও দেয়া হয় ওদের হাতে। ফলে রাজনৈতিক দলের নাম পরিচয় দিয়ে হরদম এসব অনাচারের খবর বেরোয় পত্রিকায়, বলা হয় নির্লজ্জের চোখের পর্দা থাকে না। তবুও অন্তস্থ একটি পর্দা বোধ হয় থাকে, তাই একেবারে জাজ্বল্যমান সত্য সর্বসম্মুখে প্রকাশিত হয়ে পড়লে অস্বীকার করার মতো মানসিক শক্তি তখন আর থাকে না। ফলে দেশজুড়ে ছাত্রদল-ছাত্রলীগ বা যুবদল-যুবলীগের ক্যাডারদের উন্মত্ততা ও অনাচারের খবর যখন বেরোয় তখন খুব কম সময়ই মূল দলগুলো থেকে প্রতিবাদ আসে। আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়, তবুও কিভাবে আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো মাথা উঁচু করে কথা বলে আবার ভোটারদের দরজায় আসার জন্য প্রস্তুতি নেয় তা বড়ই বিস্ময়ের ব্যাপার!
কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় হচ্ছে আমাদের বড় রাজনৈতিক দলগুলো দলীয় সন্ত্রাস কমিয়ে আনার জন্য কখনো উত্সাহী থাকে না। ক্ষমতার শক্তি এদের অনেক বেশি দাপুটে করে দেয়। দল সরকার গঠন করলে বিএনপির ছাত্রদল, আওয়ামী লীগের ছাত্রলীগ, এরশাদের নতুন বাংলা ছাত্র সমাজ সন্ত্রাস প্রদর্শনে কার চেয়ে কম গেছে কে! অতি সমপ্রতি পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত মেয়ররা নির্বাচিত হলে বিএনপির ভেতর একটি বিশ্বাস তৈরি হয়েছে যে, আগামী নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হবে এবং সরকার গঠন করবে। এটুকু সম্ভাবনাতেই নড়েচড়ে উঠলো দলীয় সন্ত্রাসীরা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের ক্যাডাররা মোটরসাইকেল মহড়া দিতে গিয়ে পুলিশি বাধার মুখে পড়ে। চট্টগ্রামে দলীয় কোন্দলে ছাত্রদল, যুবদলের কর্মীরা নিজ অফিস ভাংচুর করে। সামনের সারিতে চলে আসার জন্য দলীয় সন্ত্রাসীরা এখন অব্যাহতভাবে এমন মহড়া দিতেই থাকবে।
ছাত্রলীগ, যুবলীগের সন্ত্রাসীরা তো সরকারি সুবিধায় বিগত সাড়ে চার বছর ধরে অব্যাহতভাবে সন্ত্রাস চালিয়েই যাচ্ছে। দল থেকে তেমন কোনো শাসনের মুখে পড়তে হয়েছে বলে জানা যায় না। সংগঠনগুলোর ভেতরে অর্থ আর ক্ষমতার হাতছানি এবং এসবের মোহ এত বেশি যে, আন্তঃকলহ মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এই তো গেল সপ্তাহে অভিন্ন ধারাবাহিকতায় যুবলীগ নেতা মিল্কী নিহত হলেন সতীর্থদের বুলেটে। সরকার বা সরকারি দলের নানা অঙ্গ-প্রতঙ্গ এসব অপকর্মের সাথে জড়িয়ে থাকে বলে অভিযুক্ত খুনি তারেকদের জবানবন্দি নেয়ার সুযোগ দেয়া হয় না। র্যাবের তথাকথিত ক্রসফায়ারে মারা যেতে হয়।
বারবার প্রমাণিত হয়েছে, এসব অনাচার শেষ পর্যন্ত দলের জন্য সুফল বয়ে আনে না। বুমেরাং হয়ে ফিরে আসে। সাধারণ মানুষের জীবন তো অতিষ্ঠ হয়ই। ২০০১-এ আওয়ামী লীগের নির্বাচনে পরাজয়ের পেছনে প্রধান দায় দেয়া হয়েছিল দলীয় সন্ত্রাসকে প্রশ্রয় দেয়া। সন্ত্রাসী গডফাদারদের আশ্রয়ে রাখা। গত নির্বাচনে বিএনপির ভূমিধস পরাজয়ের পেছনে অন্যতম ক্ষত ছিল দলীয় সন্ত্রাস। এবার নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের জন্য বড় অস্বস্তি হবে দলের পক্ষপুটে বেড়ে ওঠা সন্ত্রাস। তাই আমাদের রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীদের কাছে অনুরোধ, আপনারা বাস্তবতার উঠোনে নেমে আসুন। দলীয় সন্ত্রাসীদের লাগাম টেনে ধরুন।
লেখক :অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
