স্বাধীনতার পর চার দশকেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হইয়াছে কিন্তু সুস্থ ধারার বোধবুদ্ধি ও নীতি-আদর্শের চর্চার অভাবে দেশের শাসক গোষ্ঠীর মধ্যে যেমন একপ্রকার প্রভুত্ব করিবার মানসিকতা কাজ করিতেছে, অন্যদিকে তেমনি আবার শাসিতদের মধ্যেও পরাধীনতার মানসিকতা বিদ্যমান রহিয়াছে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির ক্ষেত্রে এই কথা প্রদীপ্ত সূর্যের ন্যায় সত্য। একটি স্বাধীন দেশ ও একটি পরাধীন দেশের মধ্যে যে দুস্তর ব্যবধান রহিয়াছে উহা এই দুই শিবিরের কেহই অনুধাবন করিতে পারিতেছে না। ফলে ভৌগোলিকভাবে দেশ স্বাধীন হইলেও রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা অনেকাংশেই সুদূরপরাহত হইয়াই থাকিতেছে।
স্বাধীনতার অর্থ কী? স্বাধীনতার অর্থ হইতেছে দেশের গণমানুষের সার্বিক মুক্তি। ব্যক্তির যাবতীয় বাক ও মানবাধিকারের প্রতিষ্ঠা, তাহার মৌলিক অধিকারসমূহের প্রতিষ্ঠা। আর কেবল তখনই সে নিজেকে একটি স্বাধীন দেশের নাগরিকের পরিচয় দিতে পারে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করিতে না পারিলে ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা গড়িয়া তুলিতে না পারিলে স্বাধীন দেশেও নৈরাজ্যের পদধ্বনি শোনা যাইবে বৈকী! রাষ্ট্র যদি কেবল মুখচেনা ব্যক্তিদের নিরাপত্তা দেয় আর আমজনতার নিরাপত্তার বিষয়টিকে উপেক্ষা করিয়া চলে তাহা হইলে সেই রাষ্ট্র স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিদার থাকিতে পারে না নিশ্চয়ই। যেকোন উন্নত এবং সভ্য দেশেও খুনখারাবি, লুণ্ঠন, ধর্ষণ নিয়মিত ঘটে, কিন্তু সেসব দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত থাকায় জনগণ মানসিকভাবে অনেক স্বস্তিতে বসবাস করিতে পারে। অপরাধ করিয়া পার পাইয়া যাওয়া সেখানে সহজ নহে। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বে অপরাধীরা শাসকদের আদর্শপুষ্ট হইয়া অবলীলায় অপরাধ করিয়া চলে। আইন এক্ষেত্রে তাহাদের কেশাগ্রও স্পর্শ করিতে পারে না।
একটি দেশে সমস্যা-সংকট থাকিবেই। কোন পরিবার ও সমাজও সংকট ও সমস্যামুক্ত নহে। কিন্তু সুনিপুণ দক্ষতার সহিত ঐ সংকটের মোকাবিলা এবং উহার সমাধান করার মধ্যেই একটি সরকারের সার্থকতা ও সাফল্য নির্ভর করে। দক্ষ ব্যবস্থাপনার কোন বিকল্প নাই। সফল শাসক মানেই দক্ষ ব্যবস্থাপনা। তৃতীয় বিশ্বের শাসকেরা এবং শাসিতরা স্বাধীনতা ও পরাধীনতার মধ্যে পার্থক্য বুঝিতেই পারে না। ফলে স্বাধীন হইয়াও তাহারা একপ্রকার পরাধীন ও পরাভূত মানসিকতায় আচ্ছন্ন হইয়া দেশ চালায়। গরীব দেশগুলির হতদরিদ্র মানুষদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়িয়া তোলার শক্তি ও সামর্থ্য থাকে খুবই কম। তাই নানান ছলচাতুরীতে তাহাদের ভুলাইয়া শাসকরা নিশ্চিন্ত মনে কুশাসন ও শোষণ চালাইয়া যায়।
স্বাধীনতা অর্জনের পর সেখানে সরকারগুলির দায়িত্ব ছিল শাসিতদেরকে বোঝানো যে, তাহাদের এখন পরাধীনতার বা পাবশ্যতার মানসিকতা ঝাড়িয়া ফেলিতে হইবে এবং নিজেদের যাবতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সচেতন থাকিতে ও নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে উহাকে দৃঢ়মূল করিতে হইবে। সম্পদের ন্যায্য ও সুষম বণ্টন, আইনের শাসনের প্রতিষ্ঠা, জনকল্যাণাভিসারী পরিকল্পনা গ্রহণ এবং উহা বাস্তবায়নে দক্ষ ব্যবস্থাপনা গড়িয়া তোলার ব্যাপারে মনোনিবেশ করিতে পারিলে দেশের ও দেশের মানুষের আয় উন্নতি বরকত ঠেকাইয়া রাখা যাইবে না। এই সারসত্যটিকে হূদয়ে ধারণ, উহা অনুশীলন এবং সেই মোতাবেক দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হইয়া শাসকেরা যদি কাজ না করেন তাহা হইলে সেই ‘থোড় বড়ি খাড়া খাড়া বড়ি থোড়’ অবস্থাই আমাদেরকে চক্ষু মুদিয়া মানিয়া লইতে হইবে, যেমনটা আমরা মানিয়া লইয়াছিলাম পরাধীন যুগে।
