তিস্তা নদীর পানি বন্টন চুক্তি সমকালীন রাজনীতির অন্যতম একটি অনুষঙ্গ। তিস্তা চুক্তি এই হচ্ছে বলে আশার বাণী শুনানো হলেও কার্যত চুক্তিটি এখনও ঝুলে আছে। তবে সহসাই হবে এ প্রত্যাশা সাধারণ মানুষের মাঝে বিরাজ করছে। নদ-নদীর পানি নিয়ে দীর্ঘদিন যাবত্ বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠ গরম হয়ে আছে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের চেহারাটাকে বদলে দেয়া হয়েছে। বদলে দেয়া এই চেহারা কতটা বিধ্বস্ত তা নদীগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যায়। বাংলাদেশের প্রধান প্রধান নদী যেমন—বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ, ব্রহ্মপুত্রের জীবনীশক্তিকে ধ্বংস করে পরিবেশকে করেছে বিপর্যস্ত। দেশের বিভিন্ন জেলাগুলোর পানির প্রয়োজন মেটাবার একমাত্র অবলম্বন নদীগুলোকে ধ্বংস করে যারা ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করেছে তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে পারেনি রাষ্ট্রপক্ষ। কেবল পানি চুক্তি নিয়ে রাজনীতির মাঠকেই গরম করে চলেছে প্রতিনিয়ত। নদী দখল নিয়ে মাটি ভরাট করে নির্মাণ করা হচ্ছে বিভিন্ন স্থাপনা। গড়ে তোলা হচ্ছে কলকারখানা বিধি-বহির্ভূতভাবে। পরিবেশগত সীমা লংঘন করে যারা বিত্তবৈভবের মালিক হচ্ছে তারা বরাবরই থেকেছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। কেবল বাংলাদেশ নয় সাড়া বিশ্বেরই একই অবস্থা। অনিয়ন্ত্রিত ভোগ বিলাসিতা ও প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহারে গোটা বিশ্বই যেন আজ বিবর্ণ। অবশ্য ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিক থেকে পশ্চিমা বিশ্ব তাদের সীমারেখায় প্রকৃতিরক্ষার কিছু সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করে আসছে। কিন্তু বাংলাদেশের এই উদ্যোগের বালাই নেই। আমাদের দেশে ক্রমাগত জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে পরিবেশের উপর সীমাহীন চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। স্বার্থান্বেষীরা এই চাপকে পুঁজি করে ক্রমাগতভাবে নদী-নালা ও জলাশয়কে ধ্বংস করেই চলেছে। এদিকে শিল্পোন্নত দেশগুলো যে পরিমাণ দূষিত গ্যাস নির্গত করছে সেই সাথে শিল্পবর্জ্য ছড়িয়ে দিচ্ছে এ পরিমাণ দূষণভার সহ্য করার ক্ষমতা পৃথিবীর নেই। পৃথিবীকে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়ার কাজটি মানুষই করছে। তা সারা বিশ্বের নেতৃত্বই উপলব্ধি করছে। সে জন্যেই জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম গড়ে তোলার লক্ষ্যে মাঝে-মধ্যে অনুষ্ঠিত হচ্ছে জলবায়ু সম্মেলন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, আমাদের বাংলাদেশেও একশ্রেণির লুটেরা গড়ে উঠেছে যারা জলবায়ু পরিবর্তনে প্রত্যক্ষভাবে অনেকাংশেই দায়ী। স্বার্থান্বেষী, ধনী এক শ্রেণির মানুষের কাছে পরিবেশ হচ্ছে মুনাফা অর্জনের অন্যতম হাতিয়ার। তারা নদীর জলকে নিজ শিল্পের বর্জ্য দিয়ে দূষিত করছে, মাটিকে পাথরে পরিণত করছে মাটির তলায় যেসব প্রাকৃতিক সম্পদ লুকিয়ে আছে তা লুটে নিচ্ছে দেদারছে। অরণ্য বনানী কেটে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। তৃষ্ণার পানীয় জলকে করছে বিষাক্ত। তারা মুকুটহীন সম্রাট হয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে প্রশাসনের নাকের ডগায়। পাহাড় কাটা, মাটিতে রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করে কৃষিকাজের স্বাভাবিক গতিকে দিচ্ছে থামিয়ে। অন্যদিকে সরকারি পরিবেশবাদীরা নগর উন্নয়নের দোহাই দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা স্থাপত্যের বিরুদ্ধে নিচ্ছে না কোন ব্যবস্থা।
নদীর পানি দূষণমুক্ত করার কোন পরিকল্পনা না থাকায় কৃষি কাজের বিকল্প কৃত্রিম পন্থা ভূমির উর্বরতাকে নষ্ট করে দিচ্ছে। যে জন্য কৃষি জমির গুণগত মান বজায় থাকছে না। চাষিরা দিন দিন রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। সারের অপরিকল্পিত ও অতি ব্যবহারে মাটির উত্পাদন ক্ষমতা কমে গেলেও কৃত্রিমভাবে অধিক ফলনে প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এ থেকে উত্তরণের পথ বেড় করতে কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সরকারি আমলাতান্ত্রিক প্রশাসন দিয়ে জনগণের কোন কল্যাণ হয় না তা বহুবার প্রমাণিত হয়েছে।
একদিকে নদী ধ্বংস করা হচ্ছে, অন্যদিকে অবৈধভাবে বন উজাড় করা হচ্ছে। নদী ও বন এ দুটিই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অপরিহার্য। আমরা মাঝে-মধ্যে বাংলাদেশের খ্যাতিমান পরিবেশবিদ ও নদী তথা পানি বিশেষজ্ঞদের বক্তৃতা টেলিভিশনে শুনে থাকি। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, নদী ধ্বংসের নেপথ্যের কারণগুলো সম্পর্কে তারা কিছুই বলেন না। মোটা টাকার এসব বক্তৃতাজীবীর দ্বারা মৌলিক সমস্যার কী কোন সমাধান হয়েছে? এই সমস্যা সমাধানের জন্য সাধারণ মানুষকেই এগিয়ে আসতে হবে।
পরিবেশ শুধু ভৌত বিষয় নয়, এটি একটি আত্মিক বিষয়ও। পরিবেশ বাঁচিয়ে রাখার নৈতিক দায়িত্ব সকলের। জীবন-জীবিকার স্বার্থেই পরিবেশ সংরক্ষণ প্রয়োজন। ভারত, চীন, জাপান, মালয়েশিয়ার শহরগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখুন যেন গাছের গয়না পরে অনিন্দ্য সুন্দর সাজে সেজে আছে। জাপানের রাজধানী টোকিও শহরের মাঝ দিয়ে কৃত্রিমভাবে নদী তৈরি করে রেখেছে। ঐসব দেশের ছোট-বড় নদীগুলোর নাব্যতা রক্ষার সার্বক্ষণিক নজরদারি রয়েছে। এক সময় আমাদের ঢাকা শহরও বৃক্ষ আচ্ছাদিত শহর ছিল। এখন ঢাকা রুক্ষ নগরীতে পরিণত হয়েছে। শিল্প মালিকরা গাছ কেটে এবং নদী ভরাট করে সরকারি সম্পত্তি দখলে নিয়ে শিল্প-কারখানা গড়ে তুলছে। শিল্পের বর্জ্যে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে। শিল্প- কারখানা গড়ে তুলতে হলে যে বিধি অনুসরণ করতে হয়, তা তারা করে না। শিল্পের বর্জ্য সংরক্ষণ ট্রিটমেন্ট প্লান ছাড়াই শিল্প গড়ে উঠার ফলে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। নদীর পানি দূষণকারীরা হত্যাকাণ্ডের মতোই বড় ধরনের অপরাধ করলেও কোন শাস্তি হচ্ছে না। সরকারি আমলাদের ম্যানেজ করে এরা অপরাধ করেই চলছে। এইসব অপরাধীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা না হলে পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যাবে। ধ্বংস হবে মানবসভ্যতা। আমাদের বাঁচার তাগিদেই এই পরিবেশ ও নদী ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।
লেখক: পরিবেশবিদ
