ইন্টারনেটে নজরদারির অতি গোপন মার্কিন কর্মসূচির তথ্য ফাঁসকারী সিআইএ’র সাবেক গোয়েন্দা কর্মী এডওয়ার্ড স্নোডেন কিছুটা মুক্ত জীবন ফিরে ফেলেন। মস্কোর সেরেমাতিয়েভো বিমানবন্দরের ট্রানজিট জোনে ৩৮ দিন অবস্থানের পর গত ১ আগস্ট এই হুইসেল ব্লোয়ার বিমানবন্দর ত্যাগ করেন। একটি গাড়ি করে তাকে নেয়া হয় অঘোষিত স্থানে। স্নোডেনকে এক বছরের জন্য আশ্রয় দিয়েছে পুতিন সরকার। গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের এমন পলাতক আসামিকে আশ্রয় দিয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আরো টানাপোড়েনের মধ্যে ফেলে দিলেন কি-না, তা নিয়েই এখন চলছে নানা বিশ্লেষণ।
এরই মধ্যে স্নোডেনকে আশ্রয় দেয়ার ঘটনাকে চরম হতাশাজনক বলে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে হোয়াইট হাউস। রাশিয়ায় আগামী মাসে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নির্ধারিত বৈঠক আদৌ অনুষ্ঠিত হবে কি-না, সে ব্যাপারে নতুন করে ভাবছে মার্কিন প্রশাসন। সেপ্টেম্বরের শুরুতে সেন্ট পিটার্সবার্গে জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনের সাইডলাইনে দ্বিপাক্ষিক ঐ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবার কথা ছিলো। হোয়াইট হাউজ মুখপাত্র জে কার্নে বলেন, স্নোডেনকে রাশিয়া থেকে বহিষ্কার করার স্পষ্ট আইনানুগ অনুরোধ রক্ষা করেনি মস্কো। দেশটির এমন আচরণ মূল্যায়ন করা হচ্ছে, যার প্রভাব জি-২০ সম্মেলনে পড়তে পারে বলেও সতর্ক করেছে হোয়াইট হাউজ।
চরম স্পর্শকাতর গোয়েন্দা তথ্য ফাঁসকারী স্নোডেনকে আশ্রয় দেয়ায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে আমেরিকার রাজনৈতিক অঙ্গনেও। ডেমোক্র্যাট সিনেটর চাক স্কুমার রাশিয়ার আচরণকে পেছন থেকে ছুরিকাঘাত করার সাথে তুলনা করেছেন। জি-২০ সম্মেলন রাশিয়া থেকে অন্য কোথাও সরিয়ে নিতে প্রেসিডেন্ট ওবামার প্রতি প্রস্তাবও দিয়েছেন তিনি। ওবামার প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরও ক্ষুব্ধ। রিপাবলিকান দলীয় সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জন ম্যাক কেইন তার প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, রাশিয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেয়া উচিত।
তবে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বারবারই বলেছেন, স্নোডেনকে আশ্রয় দেয়ার ঘটনায় রুশ-মার্কিন সম্পর্কে কোন প্রভাব পড়বে না বা পড়া উচিত নয়। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, রুশ-মার্কিন সম্পর্ক আগে থেকেই খারাপ ছিলো। আর এখন সুনির্দিষ্টভাবে আরো খারাপের দিকে যাবে। বিভিন্ন ইস্যুতে এমনিতেই দেশ দু’টির মধ্যে মতানৈক্য ও বিবাদ রয়েছে। বিশেষ করে, সিরিয়া ইস্যুতে সাংঘর্ষিক দুই পক্ষকে সরাসরি মদদ দিচ্ছে দুই দেশ। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে মস্কো। অন্যদিকে, আসাদকে হটাতে বিদ্রোহীদের অস্ত্র ও অর্থসহ নানা ধরনের রসদ সরবরাহ করে যাচ্ছে ওয়াশিংটন।
এডওয়ার্ড স্নোডেনকে আশ্রয় দেয়ায় যুক্তরাষ্ট্র নারাজ হলেও রুশ গণমাধ্যমগুলো এতে বেশ খুশি। তাকে আশ্রয় দেবার পরদিন বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে তা শিরোনাম হয়। বিভিন্ন জরিপের তথ্য উল্লেখ করে তারা জানায়, রাশিয়ার অধিকাংশ মানুষই স্নোডেনকে আশ্রয় দেয়ার পক্ষে। কয়েকটি গণমাধ্যম জানিয়েছে, রাশিয়ায় স্নোডেন এখন চাকরির সাথে সাথে হয়তো বউও পেয়ে যাবেন। এরই মধ্যে রাশিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ভিকন্টাক্টের স্বত্ব্বাধিকারী পাভেল দুরভ স্নোডেনকে চাকরির অফার দিয়েছেন।
গত ২৩ জুন হংকং থেকে মস্কো পালিয়ে যান স্নোডেন। গোয়েন্দাগিরির অভিযোগে এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে মামলা করে এবং তার পাসপোর্ট বাতিল করে। ফলে লাতিন আমেরিকার অনেক দেশ আশ্রয় দিতে রাজি হলেও মস্কো ছেড়ে আর কোথাও যাবার বৈধ উপায় ছিল না স্নোডেনের। এমন অবস্থায় ১২ জুলাই রাশিয়ার কাছেই আশ্রয় প্রার্থনা করেন স্নোডেন। এর জবাবে খোদ রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জানান, আমেরিকার স্বার্থে আঘাত হানতে পারে এমন আর একটি তথ্যও ফাঁস না করার শর্তে তাকে আশ্রয় দেয়া যেতে পারে। স্নোডেনের আইনজীবী আনাতোলি কুচেরেনা জানান, ওবামা প্রশাসনের জন্য কলঙ্কজনক হয় এমন আর কোন তথ্য ফাঁস করবে বলে তাকে আশ্বাস দিয়েছেন স্নোডেন। আমেরিকার প্রবাসীদের মতোই তাকে মস্কোর একটি বাড়িতে আশ্রয় দেয়া হয়েছে। তবে স্নোডেনের জীবনের নিরাপত্তার স্বার্থে এলাকার নাম জানাননি তিনি। তবে বিমানবন্দর ছেড়ে যাবার পরপরই স্নোডেন এক বিবৃতিতে রাশিয়াকে সাধুবাদ জানান এবং বলেন, আইনের প্রতি খোদ যুক্তরাষ্ট্রই কোন শ্রদ্ধা দেখায় না।
জুনের শুরুতে স্নোডেন ওয়াশিংটন পোস্ট ও যুক্তরাজ্যের গার্ডিয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন গোয়েন্দা কর্মসূচির তথ্য ফাঁস করেন। এতে তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি (এনএসএ) মার্কিনীদেরই ফোন কল রেকর্ড করছে। প্রিজম নামের ঐ কর্মসূচির আওতায় বিশ্বের প্রধান প্রধান ইন্টারনেট ফার্মের সার্ভার হ্যাক করে তথ্য সংগ্রহ করছে যুক্তরাষ্ট্র। নিষ্কৃতি পাচ্ছে না দেশটির বন্ধু দেশগুলোও। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সার্ভারগুলোতেও গোয়েন্দা অভিযান চালানো হয়েছে। এছাড়া ব্রাজিল ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের সরকার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সার্ভার থেকেও ব্যাপকভাবে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। সর্বশেষ স্নোডেনের দেয়া যে তথ্য গার্ডিয়ান প্রকাশ করে তা হলো, ব্রিটেনের গোয়েন্দা কর্মসূচিতে নিরাপদ প্রবেশাধিকার চায় ওয়াশিংটন। এ জন্য ব্রিটেনের জিসিএইচকিউ গোয়েন্দা সংস্থাকে অন্তত পনেরো কোটি ডলার ঘুষ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার।
তবে ফাঁস হয়ে যাওয়া এ সব গোপন তথ্য এখন পর্যন্ত অস্বীকার করেনি আমেরিকা। এ কারণে দেশটির এমন কর্মসূচি ভাবিয়ে তুলেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশকে। গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের সাথে স্নায়ু যুদ্ধের সময়কার একটি চুক্তি বাতিল করেছে ইইউ সদস্য জার্মানি। স্নোডেনের দেয়া তথ্য ফাঁসের পর ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে গোটা জার্মানিতে। এরপর এক বিবৃতিতে জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী গুইডো ওয়েস্টারওয়েলে জানান, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার ব্যাপারে বিতর্ক ওঠায় এই উদ্যোগ নিতে বাধ্য হয়েছেন তারা। কমিউনিস্ট ও নাত্সী একনায়ক শাসনামলে প্রশাসনের গণনজরদারির বিষয়টি অতিষ্ঠ করে তুলেছিলো জার্মানদের। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার ব্যাপারে তাই তারা আগা-গোড়াই স্পর্শকাতর। এ অধিকার সুরক্ষায় শক্তিশালী আইনও রয়েছে তাদের। পশ্চিম জার্মানিতে মার্কিন, ব্রিটিশ ও ফরাসি সেনাঘাঁটি রয়েছে। সংশ্লিষ্ট চুক্তি অনুযায়ী ঐ তিন দেশ নিজেদের রক্ষায় গোয়েন্দা অভিযান পরিচালনার জন্য জার্মানিকে অনুরোধ করতে পারবে। কিন্তু চুক্তিটি বাতিল হওয়ায় এখন তা আর সম্ভব নয়। এর আগে জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা নজরদারির ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট ওবামার কাছে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তবে স্নোডেনকে আমেরিকার হাতে কেন সমর্পণ করা হলো না বা ওয়াশিংটনের ঐ অনুরোধ কেন রক্ষা করা হলো না, তা নিয়েই এখন জল্পনা কল্পনায় ব্যস্ত মার্কিন সংবাদ মাধ্যমগুলো। তারা বলছে, স্নোডেনের মতো একজন গুপ্তচরকে অনাকাঙ্ক্ষিত অতিথি হিসেবে পেয়ে মোটেই অবহেলা করবেন না সাবেক গোয়েন্দা প্রধান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। অচিরেই স্নোডেনের পেটের সব তথ্য বের করার চেষ্টা চালাবেন তিনি। আর সম্ভবত এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধ রক্ষা না করে তাকে কৌশলে নেয়া হয়েছে মস্কোর গোপন আস্তানায়।
