অবশেষে পৃথক রাজ্য হচ্ছে তেলেঙ্গানা

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০১৩, ২১:৩৫
আটান্ন বছরের লড়াইয়ের অবসান। জন্ম হতে চলেছে তেলেঙ্গানার। ১৯৫৬ সাল থেকে পৃথক তেলেঙ্গানার জন্য আন্দোলন চলছে। অনশনে, আত্মঘাতে, সংঘর্ষে মৃত্যু হয়েছে একের পর এক আন্দোলনকারীর। বিগত আটান্ন বছরে অনেকবার আশ্বাস, প্রতিশ্রুতি, ঘোষণা, রাজ্য পুনর্গঠন কমিটির সুপারিশ ইত্যাদি হয়েছে। কিন্তু তেলেঙ্গানা হয়নি। অবশেষে ভারতীয় রাজনীতির একমাত্র চালিকাশক্তি যা, সেই রাজনীতি তথা ভোটই যে সত্যিই বড় ফ্যাক্টর তা আবার প্রমাণ করে কংগ্রেস গত ৩০ জুলাই নতুন চাল দিল আগামী নির্বাচনে একটি বড়-সড় বিপর্যয়ের সম্ভাবনা বাঁচাতে। তেলেঙ্গানা যদি ঘোষণা না করা হতো তাহলে এবার অন্ধ্র প্রদেশের যা অবস্থা তার জেরে কংগ্রেস ওই রাজ্যে নগণ্য আসনও লাভ করত কিনা তা নিয়ে ঘোর সংশয় রয়েছে। তাই একমাত্র ভরসা ছিল এই ঘোষণা। কমিটির বৈঠকের পর কংগ্রেস সাধারণ সম্পাদক দিগ্বিজয় সিং জানান, হায়দারাবাদ হবে আপাতত তেলেঙ্গানা ও অন্ধ্র প্রদেশের যৌথ রাজধানী। এই ব্যবস্থা চলবে দশ বছরের জন্য। তার মধ্যেই অন্ধ্র প্রদেশের সীমান্ত এলাকায় একটি জেলা চিহ্নিত করে সেখানে তাদের নতুন রাজধানী স্থাপন করা হবে। তার মানে হায়দারাবাদ তেলেঙ্গানার রাজধানীই হতে চলেছে। যদিও দশ বছর পর কী পরিস্থিতি হবে তা এখনই আগাম বলার অর্থ হয় না। কারণ তেলেঙ্গানা ছাড়া বাকি অন্ধ ্রপ্রদেশের মানুষ তেলেঙ্গানার গঠনই চাইছিলেন না। তারা আগামীদিনে হায়দারাবাদকে হাতছাড়া হতে আদৌ দেবেন কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় থেকে যাচ্ছে। তবে আপাতত কংগ্রেসের এই সিদ্ধান্তে সবচে’ বড় যে লাভ কংগ্রেস পেতে চলেছে তা হলো তেলেঙ্গানা এলাকার সতেরটি লোকসভা ভোটে তেলেঙ্গানা রাষ্ট্রীয় সমিতির সঙ্গে জোট গড়ে সেগুলোতে একচ্ছত্র অধিকার কায়েম করা। কারণ এভাবে বহু প্রতীক্ষিত তেলেঙ্গানা পাওয়ার পর কংগ্রেসকে যে ওই এলাকার দশটি জেলা ঢেলে সমর্থন করবে তা নিয়ে সন্দেহ নেই এবং আগামীতে তেলেঙ্গানা রাষ্ট্রীয় সমিতির প্রধানকে চন্দ্রশেখর রাও যদি মুখ্যমন্ত্রী হতে চান তাহলে তাকে কংগ্রেসের সঙ্গেই গাঁটছড়া বাঁধতে হবে। এদিকে তেলেঙ্গানার ঘোষণা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আরো কয়েকটি রাজ্যের দাবিতে আন্দোলন দানা বাঁধে। উত্তর প্রদেশ ভেঙ্গে হরিত্ প্রদেশ, মহারাষ্ট্রে বিদর্ভ, আসামে বোরোল্যান্ড, পশ্চিমবঙ্গে গোর্খাল্যান্ডের দাবি ইতিমধ্যেই জোরদার হতে শুরু করেছে। আজ ৫ আগস্ট থেকে শুরু হচ্ছে সংসদের বাদল অধিবেশন। বিশেষজ্ঞদের মতে রাজ্যভাগের জন্য আইন পাস করতে হবে সংসদে। তবে সংবিধান-সংশোধনী বিল পেশের প্রয়োজন নেই। ফলে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতারও প্রয়োজন নেই। প্রধান বিরোধী দল বিজেপি বরাবরই রাজ্যভাগের পক্ষে। সেক্ষেত্রে সংসদে গরিষ্ঠতায় সমস্যা না হওয়ারই কথা। সংসদে বিলটি পাস হলে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর নতুন রাজ্যের স্বীকৃতি মিলবে। সবকিছু ঠিকঠাক মত চললে আগামী জানুয়ারি নাগাদ রাজ্যভাগের সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। প্রস্তাবিত তেলেঙ্গানার দশটি জেলা মূলত হায়দারাবাদেও নিজামের সাবেক রাজন্য এলাকা। এখানকার বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন কোটি; রয়েছে ১১৯টি বিধানসভা আসন। ১৯৫৬ সালে রাজ্য পুনর্গঠন আইন অনুযায়ী তেলেঙ্গানা অন্ধ্র এলাকায় যুক্ত হয়ে গঠিত হয়েছিল অন্ধ্র প্রদেশ। তেলেঙ্গানায় এখন হায়দারাবাদের সঙ্গে রয়েছে আদিলাবাদ, খাম্মাম, করিমনগর, মেহবুবনগর, মেডাক, নালগোন্ডা, নিজামাবাদ, রঙ্গারেড্ডি ও ওয়ারাঙ্গল জেলা। রায়ালসীমার দুই জেলা কুর্নুল ও অনন্তপুরকে নতুন রাজ্যে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে। বর্তমান অন্ধ্র প্রদেশের রায়ালসীমা ও উপকূলীয় অঞ্চলের লোকজন তাদের রাজ্য থেকে তেলেঙ্গানাকে আলাদা করার ঘোর-বিরোধী। বর্তমান ইউপিএ সরকারের মেয়াদে তেলেঙ্গানা বিতর্ক জোরদার হয় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পি. চিদাম্বরমের একটি মন্তব্যে। ২০০৯ সালের ৯ ডিসেম্বর তিনি বলেছিলেন, তেলেঙ্গানা গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এরপরই রায়ালসীমা ও উপকূলীয় এলাকায় বিক্ষোভ তীব্র হতে থাকে। একপর্যায়ে এ ইস্যুতে পিছিয়ে এসেছিল কংগ্রেস। এবারের অবস্থা সুবিধার মনে হচ্ছে না। গত শুক্রবার পর্যন্ত অন্ধ্র সরকারের অন্তত সাতজন মন্ত্রী ও ৫০ জন এমএলএ তাদের রাজ্য ভাঙার প্রতিবাদে পদত্যাগপত্র জমা দেন। তেলেঙ্গানা ঘোষণার পরেরদিনই ১৫ জন মন্ত্রী একত্রে মুখ্যমন্ত্রী এন.কিরন কুমার রেড্ডির সঙ্গে দেখা করে পদত্যাগের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু তার পরামর্শে সেই সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল। এদিকে রায়ালসীমা ও উপকূলীয় এলাকা থেকে নির্বাচিত (এমপি) হয়ে আসা চারজন ইউনিয়ন মন্ত্রী দিগ্বিজয় সিংয়ের সঙ্গে পদত্যাগের ইচ্ছা পোষণ করেছেন। কিন্তু কংগ্রেস সাধারণ সম্পাদক এ ইস্যুতে তাদেরকে কঠোর না হওয়ার অনুরোধ জানান। পশ্চিমবঙ্গে গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে দার্জিলিং পাহাড় এরই মধ্যে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার নেতা বিমল গুরুং জিটি এ প্রধানের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন পৃথক গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘটের ডাক দেয়া হয়েছে। রাজ্য ভাগের প্রতিবাদে ধর্মঘট চলছে অন্ধ্র প্রদেশের কিছু অংশেও। এর আগে ২০০০ সালে একমাসেই তিনটি পৃথক রাজ্যের জন্ম হয়েছিলো। মধ্যপ্রদেশের পূর্বাঞ্চল নিয়ে ছত্তিশগড় (১ নভেম্বর ২০০০), উত্তর প্রদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি অঞ্চল নিয়ে উত্তরাঞ্চল (৯ ডিসেম্বর ২০০৯, পরবর্তীতে নামকরণ হয় উত্তরাখণ্ড) এবং বিহারের দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলো নিয়ে সৃষ্টি হয় ঝাড়খণ্ড (১৫ ডিসেম্বর ২০০০)।