ভূমধ্যসাগর তীরবর্তী একটা ছোট ভূখণ্ড। সাগরবেষ্টিত প্রায় দশ হাজার কিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপটিতে ১০ লাখের বেশি লোকের বসবাস। চার দশক ধরে এই ভূখণ্ডটি মানুষ জাতি ও পরিচয় হিসেবে বিভক্ত। এতো দীর্ঘ সময়েও বিভক্তির রেখা তুলে দেয়া যাচ্ছে না। জাতিসংঘ, ইউরোপ ও পশ্চিম এশীয়দের নানা প্রচেষ্টা ও উদ্যোগ সত্ত্বেও সম্ভব হচ্ছে না খণ্ডিত দু’টি দেশ বা সীমানাকে একত্রিত করা। সাগরবেষ্টিত এই দ্বীপরাষ্ট্র দু’টি বা টুকরো দুটোর নাম সাইপ্রাস। একটি তুর্কী সাইপ্রাস ও অপরটি গ্রীক সাইপ্রাস।
সেই ১৯৭৪ সাল থেকেই চেষ্টা চলছে একত্রিত সাইপ্রাস প্রতিষ্ঠার। গণভোট, কখনো কখনো জাতিসংঘের উদ্যোগ বা দু’পক্ষের নেতৃত্বের আলোচনা কোন কিছুতেই ফলপ্রসূ কিছু আসছে না। অথচ প্রাকৃতিক সম্পদ, সমুদ্র আর দক্ষ জনগোষ্ঠীতে সমৃদ্ধ দুই সাইপ্রাসের ঐক্য চান রাজনীতিবিদ, মানুষসহ সবাই। ভৌগোলিক কারণেও বিভক্ত সাইপ্রাসের যৌক্তিকতা খুঁজে পান না কেউ। তুরস্ক নিয়ন্ত্রিত উত্তর সাইপ্রাসের প্রেসিডেন্ট ড. দরবিস ইরোগলু সম্প্রতি একদল বিদেশি সাংবাদিককে জানান, ৪০ বছর ধরে আমরা প্রচেষ্টা চালাচ্ছি দুই সাইপ্রাস একত্রীকরণের। সেই আশা ও প্রত্যাশা নিয়ে আমরা এখনো এগিয়ে যাচ্ছি। কেবল তুরস্ক নিয়ন্ত্রিত উত্তর সাইপ্রাসের প্রেসিডেন্টই নয়, পার্লামেন্টের স্পিকার, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সবাই দুই সাইপ্রাসের একত্রীকরণের লক্ষ্যে প্রত্যাশার কথা জানান। একই প্রত্যাশা ৪০ বছর লালন করছেন সাইপ্রাসবাসী। তারা বহির্বিশ্বের আরোপিত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবরোধ তুলে দেয়ার দাবি জানান।
সাইপ্রাস ভূখণ্ড থেকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশ বিদায় নেয় ১৯৬৩ সালে। তখন উত্তর ও দক্ষিণ সাইপ্রাস একটি স্বকল্প ও স্বাধীন দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়। এই লক্ষ্যে দুই অংশের নেতৃবৃন্দ আলোচনা শুরু করেন। দীর্ঘ আলোচনা ও মতবিনিময়ের মধ্যে নানা টানাপোড়েনও চলে। প্রায় দশ বছর পর ১৯৭৪ সালে ঘটে সাইপ্রাসের ইতিহাসে সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা। দক্ষিণ সাইপ্রাস থেকে সেনা অভিযান চালানো হয় উত্তর সাইপ্রাস। তুরস্ক এগিয়ে আসে উত্তর সাইপ্রাসের পক্ষে। সেনা ক্যু বানচাল করে দেয় তুরস্কের সামরিক বাহিনী। তারা উত্তর সাইপ্রাসকে দক্ষিণ সাইপ্রাসের আক্রমণ থেকে রক্ষা করেন ১৯৭৪ সালের ২০ জুলাই। সেই থেকে এই দিনটি উত্তর সাইপ্রাসের শান্তি ও স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। সাথে সাথে একমাত্র তুরস্ক উত্তর সাইপ্রাস নামক ছোট দ্বীপ দেশটিতে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক দিক দিয়ে সব ধরনের সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।
দুই সাইপ্রাসের মধ্যে সেই তিক্ততা আর টানাপোড়েন এখনো চলছে। সেইসঙ্গে সারাবিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন উত্তর সাইপ্রাস নিজস্ব উদ্যোগে পরিচালিত হয়ে আসছে। অন্যদিকে দক্ষিণ সাইপ্রাস যা গ্রীক সাইপ্রাস হিসেবে বহুল পরিচিত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্যপদ লাভ করে। তারা রিপাবলিক অব সাইপ্রাস হিসেবে নিজেদের পরিচালিত করছে। অন্যদিকে ১৯৮৩ সালে উত্তর সাইপ্রাস নিজেদের স্বতন্ত্র দেশ হিসেবে ঘোষণা দেয়। তুরস্ক ছাড়া কেউ তাদের স্বীকৃতি দেয়নি। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন উত্তর সাইপ্রাস।
দুই সাইপ্রাসের একত্রীকরণের জন্য পৃথকভাবে গণভোট করা হয় দুই দেশে। পৃথকভাবে পরিচালিত গণভোটে উত্তর সাইপ্রাসের অধিকাংশ মানুষ একত্রীকরণের পক্ষে মত দেন। অন্যদিকে দক্ষিণ সাইপ্রাসের জনগণ একত্রীকরণের বিরুদ্ধে মত দেয়। দুই সাইপ্রাস একত্রীকরণের পথে দক্ষিণ সাইপ্রাসের জনগণের নেতিবাচক অবস্থানও একটি বড় বাধা। তার উপর রয়েছে ধর্ম, ভাষা ও কৃষ্টির বৈপরীত্য। এসবের পরও ভৌগোলিক অবস্থান আর আঞ্চলিক সহায়তার স্বার্থে দুই সাইপ্রাসের একত্রীকরণ জরুরি। কারণ উত্তর সাইপ্রাস বলা যায় একতরফাভাবে বিচ্ছিন্ন রয়েছে পুরো বিশ্ব থেকে। বিমান যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছুই উত্তর সাইপ্রাসকে করতে হয় তুরস্কের মধ্যদিয়ে। এমনকি তুরস্ক হয়ে উত্তর-সাইপ্রাসে কোন বিদেশি গেলে তাদের সীমান্ত দিয়ে দক্ষিণ সাইপ্রাসে ঢোকার অনুমতি দেয়া হয় না। ভ্রমণকারীদের ইমিগ্রেশন থেকে বলা হয়, অবৈধপথে তারা এ অঞ্চলে ঢুকেছে।
সার্বিক পরিস্থিতিতে দুই সাইপ্রাসের একত্রীকরণের পথ রুদ্ধ হয়নি। কয়েক বছর আগে জাতিসংঘ মহাসচিব নতুন করে একত্রীকরণের উদ্যোগ নেন। সেই থেকে নতুন আলোচনা শুরু করে দুই সাইপ্রাস। আগামী অক্টোবরের আগে দুই অংশের প্রেসিডেন্ট মনোনীত প্রতিনিধির মাধ্যমে আলোচনায় বসবে। সবার প্রত্যাশা চার দশকের প্রতীক্ষার অবসান ঘটবে এবার।
